আজ সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ ইং, ০৪ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আজ ডা. হাসেম চত্বরে ফোয়ারা উদ্বোধন ।। নান্দনিকতায় পাল্টে যাচ্ছে জামালখান

Published on 20 October 2016 | 6: 25 am

নান্দনিকতার ছোঁয়ায় পাল্টে যাচ্ছে ২১ নং জামাল খান ওয়ার্ড। তারই ধারাবাহিকতায় আজ সন্ধ্যা ছ’টায় জামালখান চত্বরে (ডা. এম হাসেম চত্বর) উদ্বোধন হতে যাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারার। চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রথম মুসলিম ডাক্তার এম হাসেমের নামে কয়েক বছর আগে সিটি কর্পোরেশন চত্বরটির নামকরণ করেছিল তার নামেই। মোড়ের গাছ এবং ফলক অক্ষত রেখেই গোল চত্বরটি একেবারে নতুনভাবে সেজেছে। ইতোমধ্যে টাইলস বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। নতুন আঙ্গিকে চত্বরটিতে থাকছে লাইটিং, মিউজিক সিস্টেম, নান্দনিক বাগান। পানির বিভিন্ন আঙ্গিকের ফ্লু হবে। পানির ফ্লু’র সাথে মিলিয়ে চলবে মিউজিক। জামালখান ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন এ প্রসঙ্গে আজাদীকে জানান, সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত একটা পর্যন্ত ফোয়ারাটি চালু থাকবে। আজ সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও স্থানীয় সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু ফোয়ারার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অতিথি থাকবেন। গতকাল আজাদীর সাথে আলাপচারিতায় কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন জানালেন, জামাল খান চত্বরে ফোয়ারাটি নান্দনিকতার সূচনা মাত্র। ২০১৭ সালের মধ্যে জামালখান এলাকা একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি জানালেন তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা। তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে আমি এলাকাবাসীর কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে ‘হেলদি সিটি’ নামটা কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমরা কাজে পরিণত করবো তা। সাথে একটু করে পুরো এলাকার পরিবর্তন ঘটাবো, যেখানে প্রকৃতি আর সংস্কৃতির মিলন ঘটবে। তিনি বলেন, আমি এখনো পর্যন্ত আমার জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ড কাউন্সিলরের চেয়ারে বসিনি। আমার প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে ২০১৭ সালে। তারপরই আমি চেয়ারে বসবো। তিনি আরো বলেন, জামালখানকে বদলে দিতে আমার দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর পুরোটাই আমি সংগ্রহ করছি বিভিন্ন কর্পোরেট হাউজ থেকে। সিটি কর্পোরেশন থেকে অনুমোদন নিচ্ছি মাত্র। কর্পোরেট হাউজগুলোও আমার ডাকে সাড়া দিয়েছে; সাথে মাননীয় মেয়র ও এলাকাবাসীর উৎসাহ ও সহযোগিতা তো আছেই। তিনি বলেন, সাফল্য পাওয়ার পূর্ব শর্ত সদিচ্ছা। সেটা যদি থাকে, তবে কোন না কোন ভাবেই আপনি সফলকাম হবেন। পরিবর্তনের প্রয়োজনে ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয় তার োগান। তাঁর এখনকার োগান “বাংলাদেশ দেখবে জামাল খান”।

কাউন্সিলর সুমনের উদ্যোগ ও আন্তরিকতার প্রশংসা করে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী বলেন, অবশ্যই তার উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। তবে শুধু জামালখানকে সুন্দর পরিচ্ছন্ন করে চট্টগ্রামের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হবে না। বরং চট্টগ্রামের প্রত্যেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর এই রোল মডেল অনুসরণ করে নিজ নিজ এলাকাকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর করার উদ্যোগ নিতে পারেন। তবেই চট্টগ্রাম তার হৃত গৌরব ফিরে পাবে।

বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জামালখান চত্বরে ফোয়ারার ভিতরে চারপাশে থাকছে বৈচিত্র্যপূর্ণ গাছগাছালি। রাস্তার পাশের দেয়ালে টেরাকোটায় শোভা পাবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্য। শুধু জামাল খান চত্বরই নয়, পুরো জামালখান ওয়ার্ডকে দৃষ্টিনন্দন করতে নেয়া হয়েছে পরিকল্পিত পরিকল্পনা।

এজি চার্চ থেকে পিডিবি কোয়ার্টার পর্যন্ত প্রায় ৩০০ ফুটের গার্ডেনিং হবে। চত্বরটির পশ্চিম দিকে তৈরি করা হবে বিশ্বমানের ২০ জন যাত্রী ধারণ ক্ষমতার ছাউনি। এতে থাকবে এলইডি টিভি, বুকস্টল, টিস্টল, ওয়াইফাই সিস্টেম, এটিএম বুথ, পুরুষমহিলার পৃথক পাবলিক টয়লেট সুবিধা। আগামী পরু যাত্রী ছাউনি স্থাপনের কাজ শুরু হবে। ফুটপাত দখল করে আছে ভাসমান হকাররা। সেখানে কোন হকার থাকবে না। কোন রেলিংও দেয়া হচ্ছে না। রেলিংয়ের পরিবর্তে ৩০০ ফুট এলাকা জুড়ে ১৫ ফুট পর পর ফুলের ঝুড়ি বসানো হচ্ছে। এই ১৫ ফুট তিনটি দড়ি বাঁধা হবে, যার মাঝখানের দড়িটি লাল ও দু’দিকের দড়ি হবে সবুজ। ৫ ফুট করে জায়গা পথচারী পারাপারের জন্য খোলা থাকছে। পিডিবি কলোনি এলাকায় নালার উপর ্যাব বসিয়ে বাগান করা হবে। খাস্তগীর স্কুলের সামনে স্টিলের তৈরি একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। এটি অর্থায়ন করবে কর্পোরেশন। ব্রিজটি স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি করা হলেও ঢেকে দেয়া হবে সবুজে।

একটা সময় যে সড়কের পাশ দিয়ে দুর্গন্ধে নাকে রুমাল চেপে যেতে হতো, আজ সেখানে ফুলের বাগান। নগরীর জামাল খান কুসুম কুমারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনে সড়কের পাশে নালার ময়লা আবর্জনার গন্ধে নাকে রুমাল চেপে যাতায়াত করতে হতো সাধারণ মানুষের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা রিকশার কারণে লেগে থাকত জটলা। এলাকাটি এখন ঝকঝকে। সেখানে লাগানো হয়েছে বাহারি ফুলের গাছ। একই ভাবে হেমসেন লেনের ব্যাংক কলোনির মোড়ে প্রতিদিন ফেলা হতো ময়লা আবর্জনা। মোড়ের কোণাটি রূপ নিয়েছিলো ডাস্টবিনে। গন্ধে পথচারীদের চলাচল করা ছিল দায়। গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ডাস্টবিনে ভরা জায়গাটিতে শোভা পাচ্ছে সবুজ ফুলের গাছ। নানান ফুল গাছে সাজানো হয়েছে চেরাগী মোড় থেকে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে আইল্যান্ডে।

কাউন্সিলর জানালেন, পুরো ওয়ার্ডে ৩০ ফুট পর পর ৩৫০টি ময়লা ফেলার কন্টেনার বসানো হয়েছে। প্রথম প্রথম মানুষ ময়লার এ কন্টেনার ব্যবহার না করলেও এখন সবাই ব্যবহার করছে। এরপর আমরা প্রতিটি ঘরে ময়লা ফেলার কন্টেনার দিচ্ছি। আগামী সপ্তাহ থেকে ডোর টু ডোর ময়লা সংগ্রহ করা হবে। আগামী জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে জামালখান ওয়ার্ড ৮০ ভাগ পরিচ্ছন্ন হবে বলে আমি আশা করছি।

চট্টগ্রামে ইসলাম ধর্ম প্রচারক হিসাবে প্রথম সুফি সাধক বলা হয় হযরত বদর শাহকে। প্রচলিত আছে বদরশাহ পীর প্রথম চেরাগ জ্বালিয়ে ছিলেন এ চেরাগী মোড়ে। যে পাহাড়ের ওপর তিনি চেরাগ জ্বালিয়ে ছিলেন পরবর্তীতে তার নামকরণ করা হয় চেরাগী পাহাড়। বদর পীরের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে একটি স্মৃতি স্মারক। অযত্ন আর অবহেলায় থাকা স্মারকটিতে লেগেছে সংস্কারের ছোঁয়া। পোস্টার আর লিফলেট লাগানোর স্থান হিসাবে ব্যবহার করা হতো স্মারকটির দেয়াল। রঙিন বাতির আলোয় সাজানো স্মারকের দেয়ালে লাগানো হয়েছে নানা ধরনের ফুলের গাছ। ভরে গেছে সবুজে। একই ভাবে রাস্তার পাশের দেয়ালগুলোতে শিল্পীদের তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হবে ৫২, ৭১, ৬৯, কোথাও আদি থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস, কোথাও চট্টগ্রামের নদী ও পাহাড়গুলোর বর্ণনা।

ইতিমধ্যে জামালখান ওয়ার্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। ক্যামেরার মনিটর বসানো হয়েছে ওয়ার্ড অফিসেযাতে আমি নিজে তদারকি করতে পারি। কৃষ্ণকুমারি স্কুলে ফিঙ্গার প্রিন্ট মেশিন বসানো হয়েছে। যেখানে প্রতিটি ছাত্রী তাদের আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে স্কুলে প্রবেশ করে। আর আঙ্গুলের ছাপ দেয়ার সাথে সাথে অভিভাবকদের মুঠোফোনে একটি এসএমএস পৌঁছে যায়। এতে অভিভাবকরা ঘরে বসেই জানতে পারছে তাদের সন্তান নিরাপদে স্কুলে পৌঁছেছে।

গত বছর থেকে জামাল খান ওয়ার্ডের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও হেলদি ওয়ার্ডের গৌরব ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেন কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন। আগামী বছরের জুলাই মাসের মধ্যে জামালখান ওয়ার্ডকে মডেল ওয়ার্ড হিসাবে রূপ দেয়া হবে। আগামী এক বছর পর বাইরের মানুষ জামালখান ওয়ার্ডের সৌন্দর্য দেখতে আসবে এমনটি ধারণা করছেন কাউন্সিল সুমন। ‘বাংলাদেশ দেখবে জামালখান’ কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনের এ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে কেমন হবে এই এলাকার চিত্র? এটুকুই বলা যায়, একদিন ঠিকই চট্টগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে জামালখান ও এই এলাকার মানুষের সৌন্দর্যপ্রিয়তা আর রুচিবোধ প্রশংসিত হবে।

 


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন