আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



মিল মালিকদের কারসাজিতে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী

Published on 20 October 2016 | 6: 15 am

নগরীর নাসিরাবাদ উইম্যান কলেজ মোড়ের ‘মনোরমা স্টোরে’ এক নম্বর নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকা কেজি। এখান থেকে একশ’ গজ পশ্চিমে খুলশী আবাসিক এলাকার এক নম্বর সড়কের মুখে ‘সদাই’ নামের দোকানে নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। এটি গতকালের দর। মাত্র একশ’ গজের মধ্যে একই চালের দাম প্রতি কেজিতে ছয় টাকার ব্যবধান ধরা পড়েছে। আর পাহাড়তলী পাইকারী বাজারে গতকাল এক নম্বর নাজিরশাইল চাল বিক্রি হয়েছে ৫১ টাকা কেজি। পাইকারী বাজারের সাথে খুচরা বাজারের ব্যাপক ফারাক। এক দোকানের সাথে পাশের দোকানের দামের এই হেরফেরে সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে চালের বাজার নিয়ে নানা কারসাজি চলছে নগরীতে। হঠাৎ করে অস্থির হয়ে উঠা চালের বাজার নিয়ে সাধারণ ভোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ক্যাবের পক্ষ থেকে চালের বাজার দর নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়।

দেশে হঠাৎ করেই অস্থির হয়ে উঠেছে চালের বাজার। গত বেশ কয়েকদিন ধরে চালের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রকারভেদে প্রতি কেজি চালের দাম ১০ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা বাড়েনি এমন চাল নেই। পাইকারী বাজারে চালের এই দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে খুচরা পর্যায়ে চালের অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পাইকারী বাজারের সাথে খুচরা বাজারের এবং এক দোকানের সাথে অপর দোকানের চালের দামে কোন সমন্বয় নেই। নজরদারির অভাবে চালের দাম নিয়ে ভয়াবহ রকমের অস্থিরতা বিরাজ করছে বলেও ভোক্তা সাধারণ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চাক্তাই ও পাহাড়তলী পাইকারী বাজারে সবচেয়ে ভালো মানের নাজিরশাইল চাল বিক্রি হয়েছে ৫১ টাকা কেজি। পাইকারী বাজারের এই দর আধা কিলোমিটার দূরের দোকানেই মানা হচ্ছে না। গতকাল নগরীর মোমিন রোড এলাকায় বিভিন্ন দোকানে ৫৫ থেকে ৫৭ টাকা দরে চাল বিক্রি করতে দেখা গেছে। বিষয়টিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে ভোক্তারা বলেছেন, প্রতি কেজি চালে দুই টাকা ব্যবসা করলেও অনেক। কিন্তু এক কেজি চালে নয়/দশ টাকা ব্যবসা করাকে কোন বিচারে ব্যবসা বলা যায় না বলেও সাধারণ ভোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

দেশে চালের কোন সংকট না থাকলেও নানা কারসাজিতে দাম বাড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে মিল মালিকরা নানা পন্থায় চালের বাজার অস্থির করে তোলার চেষ্টা করছেন। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে পাইকারী বাজারে দাম বাড়ে। আর খুচরা বাজারে এসে তা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে।

গতকাল একাধিক পাইকারী ব্যবসায়ী আলাপকালে বলেছেন, ধানের সরবরাহ কমে গেছে। এতে করে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না। কিন্তু খুচরা বাজারে চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করে পাইকারী ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাজার মনিটরিং করে এই দর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শুধুমাত্র মনিটরিং না থাকায় যার যেভাবে ইচ্ছে দাম বাড়াচ্ছে বলেও ব্যবসায়ীরা মন্তব্য করেছেন।

বাজারে ৪০ টাকার নিচে কোন চাল নেই বলে উল্লেখ করে কয়েকজন ব্যবসায়ী গতকাল জানান, গরিবের চাল নামে পরিচিত মোটা চালের কেজি ৪০ টাকা। একটু ভালো মানের চালের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা। চালের দাম এত অস্বাভাবিক পর্যায়ে বেড়ে যাওয়ার কোন কারণ নেই বলে উল্লেখ করে পাইকারী বাজারের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, উত্তর বঙ্গের মিলগুলোতে প্রচুর ধান মজুদ রয়েছে। অথচ মিল মালিকরা চাল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। মিল মালিকরা কার্যত একটি সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন বলেও পাইকারী ব্যবসায়ীরা জানান। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, দেশে এ বছর ২৪ হাজার মেট্রিক টন চাল বাড়তি উৎপাদন হয়েছে। সরকারের গুদামে মজুদ আছে সাড়ে ৭ লাখ মেট্রিক টন চাল। পাইপ লাইনে আছে আরও দেড় লাখ মেট্রিক টন চাল। ৯ লাখ মেট্রিক টন চালের এই মজুদের পাশাপাশি আগামী ডিসেম্বর মাসে আমন ধান উঠবে। সুখবর হচ্ছেএ বছর আমনেরও বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে দেশে খাদ্য নিয়ে কোন ধরনের সংকটের আশংকা একেবারেই নেই।

তবুও দাম কেন বাড়ছে এই প্রশ্নের জবাবে পাইকারী ব্যবসায়ীরা বলেছেন, মিল মালিকরা কারসাজি করে বাজার অস্থিতিশীল করছে। বাড়তি মুনাফা হাতানোর জন্য গুটিকয়েক মিল মালিক পুরো সেক্টরকে জিম্মি করে ফেলার চেষ্টা করছে বলেও তারা উল্লেখ করেন। সরকারকে গতকাল পর্যন্ত নানা অজুহাতে বেশ কয়েক বার সময় বাড়িয়েও তারা পুরোপুরি চাল সরবরাহ করেননি। সরকারকে মিল মালিকদের ৬ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন চাল দেয়ার কথা থাকলেও তারা দিয়েছেন মাত্র ৪ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। তাদের কাছে পাওনা রয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। বাকি চাল সরবরাহের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত মিল মালিকদের সময় দিয়েছে। যে সব মিল মালিক ওই সময়ের মধ্যে চাল দিতে ব্যর্থ হবেন, তাদের আগামী ৫ বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। সরকারের এই কড়া অবস্থান চালের বাজারে প্রভাব ফেলবে বলেও ব্যবসায়ীরা মন্তব্য করেছেন।

পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম নিজামউদ্দিন গতকাল আলাপকালে বলেছেন, চালের বাজার কিছুটা কমবে বলে মনে হচ্ছে। আজ থেকে পরিস্থিতি ভালোর দিকে। বিভিন্ন চালের দাম নিম্নমুখী বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ক্যাবের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন গতকাল আলাপকালে বলেন, দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। কেবল চালের দাম নয়। সবজিসহ সব জিনিসেরই দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বাজার মনিটরিং এর উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, একমাত্র নজরদারিই এই অবস্থার অবসান ঘটাতে পারে।

 


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন