আজ বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ ইং, ০৬ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষ ।। আন্দরকিল্লায় ককটেল বিস্ফোরণ, ফাঁকা গুলি, ভাঙচুর আহত ১৫

Published on 19 October 2016 | 3: 05 am

বাইশ ঘণ্টার ব্যবধানে আবারও সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ। গত রাত সাড়ে আটটা থেকে প্রায় সাড়ে নয়টা পর্যন্ত নগরীর আন্দরকিল্লায় কেন্দ্র্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক সাইফুল আলম লিমন ও নগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ওয়াহিদ রাসেলের অনুসারীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষে জড়িত দুই পক্ষই সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী। সংঘর্ষ চলাকালে তিনি নগর ভবনেই ছিলেন। দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলাকালে ফাঁকা গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এসময় সিএনজি টেক্সি, প্রাইভেট কারসহ কমপক্ষে ২০টি যানবাহন ভাঙচুর এবং বেশ কয়েকটি দোকানপাটেও ভাঙচুর চালায় সংঘর্ষে জড়িতরা। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কমপক্ষে ১৫ জন আহত আহত হন।

সংঘর্ষ চলাকালে নজির আহমদ সড়ক, মোমিন রোডে ব্যবসায়ী ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এসময় ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন। ঘটনার সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দৈনিক পূর্বদেশের ফটো সাংবাদিক হায়দার আলীকে লাঞ্ছিত করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি দাবি করেন, ছাত্রলীগ কর্মীরা তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়।

সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থল থেকে কোতোয়ালী থানা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১১ জনকে আটক করে। এর আগে একই স্থানে গত সোমবার রাত দশটার দিকেও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসীম উদ্দিন গত রাত সোয়া এগারোটায় দৈনিক আজাদীকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১১ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসি। এদের মধ্যে অনেক পথচারী এবং ব্যবসায়ী আছেন। যাচাই বাছাই শেষে যারা দোষী নয় তাদের ছেড়ে দেব। যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব। প্রকৃত ঘটনা কী ছিল? এমন প্রশ্নের উত্তরে জসীম উদ্দিন বলেন, সুনির্দিষ্ট কারণ বলা যাবে না। একদল লাঠিসোটা নিয়ে মিছিল করছিল। টহল পুলিশ দেখে তারা পালাতে চেষ্টা করে। তখন আমরা ১১ জনকে আটক করে নিয়ে আসি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিছিলকারীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল এবং কিরিচ ছিল। এটা কতটুকু সত্য? এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলা মুশকিল। তবে লাঠিসোটা ও কিরিচ থাকতে পারে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গত রাত পৌনে এগারোটায় মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, কারা এসব করেছে আমি জানি না। ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা যে হোক না কেন, তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমি পুলিশকে বলে দিয়েছি।

ঘটনার কারণ : যুবলীগ নেতা ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের দীর্ঘদিনের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিল শশী চক্রবর্তী। গত সোমবার রাতে এই শশীকে নিয়ে মেয়রের কাছে যান বাবরের প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পদক সাইফুল আলম লিমন। লিমন আবার আ জ ম নাছিরের অনুসারী। প্রতিপক্ষ গ্রুপের কর্মী শশীকে দলে নিয়ে আসায় এর প্রতিবাদ করেন নগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ওয়াহিদ রাসেল ও তার অনুসারীরা। সোমবার রাতে রাসেলের অনুসারীরা শশীকে মারধর করে। এই নিয়ে লিমন গ্রুপের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

আগের রাতের ঘটনার জের ধরে গত রাতে শশী চক্রবর্তী ও লিমনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ আন্দরকিল্লা নজির আহমদ সড়কে জড়ো হয়ে মিছিল করে। এসময় সেখানে পূর্ব থেকে অবস্থানরত ওয়াহিদ রাসেল গ্রুপের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন ওয়াহিদ রাসেল। এই নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এসময় আইন কলেজ ছাত্রলীগের আরো দুটি গ্রুপও যোগ দেয় ঘটনাস্থলে। আইন কলেজ ছাত্রলীগের গ্রুপ দুটির একটি ওয়াহিদ রাসেল এবং অন্যটি লিমনের অনুসারী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষে জড়িতরা প্রকাশ্যে ফাঁকা গুলি ছোড়ে, ককটেল বিস্ফোরণ করে। এসময় অনেকের হাতে ছিল লাঠিসোটা ও কিরিচ। সংঘর্ষ চলাকালে ট্রাক ও মোটর সাইকেলে করেও অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে যোগ দেন। সাধারণ মানুষ ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে সরে পড়ে। ফাঁকা গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ, দোকানপাট ও গাড়ি ভাঙচুর চালায় সংঘর্ষে জড়িতরা।

এক গ্রুপের নেতৃত্ব দেয়া নগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ওয়াহিদ রাসেল বলেন, সিআরবি কেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এমন লোকের নেতৃত্বে বেশ কিছু ছেলে এসে আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ওরা যখন গুলি করতে করতে মেয়রের বাসার সামনে চলে আসে তখন আমরা প্রতিরোধ করি। ওরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এ হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। যারা হামলা করেছে তারা বহিরাগত।

হামলার নেতৃত্বে কারা ছিলেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, লিমন এবং শশী চক্রবর্তীও ঘটনাস্থলে ছিল। এরা বস্তির ছেলে এনে দোকানপাটে ভাঙচুর করেছে। বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুর করেছে। দোকানদারদের জিম্মি করে ক্যাশ লুটে নিয়েছে।

প্রতিপক্ষের হামলায় কেউ আহত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ওয়াহিদ রাসেল বলেন, সৈকত দাশ, সামির সাদিক এবং শহীদুল্লাহ নামে ছাত্রলীগের তিনজন বেশি আহত হন। এর বাইরে আরো কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন।

ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দেয়া সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল আলম লিমন বলেন, গতকালও আমার নাম বলা হয়েছিল, আবার আজকেও। অথচ এসবের সাথে আমি নেই। হ্যাঁ, গতকাল নাছির ভাইয়ের বাসায় একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। তবে তা তো সিনিয়রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, জুনিয়র পর্যন্ত গড়ায়নি। আসলে এটা ল’ কলেজের এবং এলাকাভিত্তিক ঝামেলা। ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ওয়াহিদ রাসেল এবং ল’ কলেজের বাপ্পীর ঝামেলা। বাপ্পী আমাদের মেইনটেইন করে। আজ (গত রাতে) কারা নাকি বাপ্পীর বাসার সামনে গুলি করেছে।

শশী চক্রবর্তীকে নিয়ে মেয়রের বাসায় যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন মেয়র হিসেবে নাছির ভাই যে কাউকে ডাকতে পারেন। সে আমিও হতে পারি, আবার বাবর বা বাচ্চু ভাইয়েরা হতে পারেন।

এদিকে দৈনিক পূর্বদেশের ফটো সাংবাদিক হায়দার আলী দৈনিক আজাদীকে বলেন, আন্দরকিল্লা থেকে একটি গ্রুপ মিছিল নিয়ে আসছিল। এসময় আমি পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ছবি তুলছিলাম। এক পর্যায়ে তারা আমাকে ঘিরে ফেলে। পরিচয় দেয়ার পরেও মারধর করে। হামলাকারীরা আমার হাতে থাকা মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।

হামলার প্রতিবাদ : বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের কার্যনিবাহী সদস্য দৈনিক পূর্বদেশের ফটো সাংবাদিক হায়দার আলীর ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। তারা ঘটনার তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

 


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন