আজ সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ ইং, ০৪ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



স্মৃতি তে চন্দন দা ও জয়দেব দা

Published on 16 October 2016 | 6: 28 pm

:: শেখ আলমগীর শাহনেওয়াজ সাগর ::
সন্দ্বীপ টাউনে যারা থাকতেন বা যারা আসা যাওয়া করতেন অথবা সরকারী হাজী এ বি কলেজে যারা পড়েছেন তারা কি চিনতে পেরেছেন এই মানুষ দুজন কে ?
সন্দ্বীপের সাংকৃতিক অঙ্গনের অত্যন্ত দুজন পরিচিত ও জনপ্রিয় মানুষ চন্দন কুমার শীল ও জয়দেব দাশ ।
চন্দন দা ছিলেন সংগীত শিল্পী ও জয়দেব দা ছিলেন
জনপ্রিয় একজন তবলাবাদক ।
দুজনেই আজ পরলোকগত ।
চন্দন দা মুলত টাউনের সেলুন ব্যাবসায়ী হলে ও ছিলেন একজন সংস্কৃতি কর্মী ।
অসাধারন গানের গলা ।
জীবনমুখী গান বেশী গাইতেন তিনি ।

“তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে ”
“পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব
মাগো বল কবে শীতল হবো ?
এ ধরনের জীবন মুখী গানগুলি এখনও শুনলে
দাদার স্মৃতি গুলো ভেসে উঠে ।

আব্দুল জব্বারের সেই গানটি ,
“আমি তো বন্ধু মাতাল নয় ” এই গানটি খুব সুন্দর করে গাইতেন ।
আমিও যেহেতু তখন গান গাইতাম , তাই সে সময়ে ওনার সাথে আমার খুব খুব ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল ।
সারা সন্দ্বীপে দুজনে কত স্টেজ প্রোগরাম করেছি সে সময় !
সবি এখন স্মৃতি ।
প্রথম প্রথম তিনি গাইতেন আর আমি হারমেনিয়াম বাজাতাম
সাথে জয়দেব দার অসাধারন তবলার সুর ।
একসময় নিজ দক্ষতায় তিনি নিজেই হারমেনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন তখনকার সব জনপ্রিয় গানগুলি ।
৯০ এর দশকে আমি চট্টগাম স্থায়ী ভাবে চলে আসার পর আর দেখা হয়নি ওনার সাথে ।
শুনেছিলাম তিনি সন্দ্বীপ রেডক্রস এ অপারেটর হিসাবে চাকুরী করেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ।
সারা জীবন মানুষের জন্য , বিনোদনের জন্য গান গাইলেও নিজের জীবনের জন্য কিছুই করে যেতে পারেন নি ।
২০১৪ সালের এই দিনে হঠাৎ স্ট্রোক করে চলে যান
না ফেরার দেশে ।
তার অকাল প্রয়ানে সন্দ্বীপ হারিয়েছিল নিবেদিত প্রান এক সাংস্কৃতিক কর্মী কে ।
শুনেছি তার অসহায় পরিবার আর্থিক দৈন্যতায় খুবী মানবেতর জীবন যাপন করছে ।
সে সময় তার সুন্দর সেলুন টি ছিল টাউনের সব নামী দামী মানুষের আড্ডার যায়গা , যারা আজ সমাজে , দেশে বিদেশে সু প্রতিষ্ঠিত ।
জানিনা এই লেখা ওনাদের চোখে পরবে কিনা ?

আর জয়দেব দা !
দশ আংগুলে তবলার ভেলকি যারা দেখেছেন
তারা কি ভুলতে পারবেন তাকে ?
আমি যখন মুজিব পরদেশীর সেই অসম্ভব জনপ্রিয় গান গুলি গাইতাম তখন জয়দেবদার তবলা ছিল অপরিহার্য । একবার এক অনুষ্ঠানে আমি জয়দেব দার সাথে এক নাগারে ১৭ টি গান গিয়েছিলাম ।
গভীর রাতে মানুষ আমাদের স্টেজ থেকে নামতেই দিচ্ছিল না ।
পেশায় জলদাস হলেও বহু গুনের অধিকারী ছিলেন
প্রিয় জয়দেব দা ।
তার বাঁশীর সুর !
আহা ! এখনও যেন কানে বাজে ।
কলা ভবনে আমাদের যে কোন অনুষ্ঠানে জয়দেব দার
একটা একক বাঁশীর পরিবেশনা থাকতো ।
কত শত শত মানুষ তার বাশী শুনে তাৎক্ষনিক পুরষ্কার দিয়েছেন তা লিখে শেষ করা যাবেনা ।
তার বেহালার সুর শুনে মানুষের চোখ ছল ছল করতো ।
আর ঢোলের বাজনার কথা নাই বা বললাম ।
এই দ্বীপে বসে একটা মানুষের এতগুলো গুন কিভাবে রপ্ত করেছিলেন তা আজও অজানা ।
জয়দেব দার আরও দুই ভাই পরিমল ও (আরেকজনের নাম মনে আসছেনা ) ভাল ঢোল ও দোতরা বাজাতেন । পরিমলের দোতারার সুরে নিজ কন্ঠে সেই গান ” মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি
বানাইয়াছেন কোন মেস্তরি “এই গানটির কথা টাউন বাসী মনে হয় আজও ভুলে নাই ।

সেই জয়দেব দা ও গত বছর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ।
শুনেছি লিভার জনিত সমস্যায় ভুগে প্রায় বিনা চিকিৎসায় চলে গেলেন না ফেরার দেশে ।
তার অসহায় পরিবার ও আর্থিক সমস্যায় ধুকে ধুকে
মরছে ।

প্রিয় জয়দেব দা ও চন্দন দা ,
তোমরা চলে গেলেও তোমাদের শত শত স্মৃতি গুলো বেঁচে থাকবে আমাদের মাঝে ।

সন্দ্বীপের এই দুজন প্রয়াত শিল্পীর অসহায় পরিবারের জন্য অবশ্যই আমাদের সবার কিছু করা উচিত ।
আমার বিশ্বাস ,
আমরা অকৃজ্ঞ নয় ,
আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ এগিয়ে আসবেই আসবে ।

সর্বশেষে কবির সেই দুটি চয়ন,

” নয়নে তোমাদের দেখিতে পাইনা
রয়েছো নয়নে নয়নে ”

লেখক : পেশায় ব্যাবসায়ী ও সোনালী সন্দ্বীপের নিয়মিত লেখক


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন