আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



জবানবন্দিতে বহু তথ্যই গোপন করেছে বদরুল

Published on 09 October 2016 | 2: 59 am

সিলেটে কলেজ ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছে চতুর ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলম।

এসব তথ্য গোপন করে সে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা চালিয়েছে। এতে মামলার তদন্ত ও ন্যায় বিচার বিঘ্নিত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আইনবিদ অ্যাডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ঘটনার কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জবানবন্দিতে গোপন করে থাকলে পুনরায় সম্পুরক জবানবন্দি নেয়া যেতে পারে। না হলে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হওয়ার শংকা থেকে যায়।

হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্ত শুরু করেছে শাহপরান থানা পুলিশ। আসামী বদরুলের নাম-ঠিকানা যাচাই করছে পুলিশ। এছাড়া ওসমানী হাসপাতাল ও স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে খাদিজার চিকিৎসাপত্র দেয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে।

খাদিজাকে উদ্ধারকারী যুবক ইমরান ও জুনেদকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে স্বাক্ষ্য নিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হারুন উর রশিদ। তিনি যুগান্তরকে জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট দেয়ার কাজ চলছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আটক ও গ্রেফতারের পর সাংবাদিক, পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কাছে বদরুল যে বক্তব্য দিয়েছিল তার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই মিল নেই ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দির।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগে বলে গেলেও ১৬৪ ধারার সময় তা গোপন করে সে। বদরুলের একটি অডিও রেকর্ড ও জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

অডিওর বক্তব্য অনুযায়ী, খাদিজাকে হত্যার পরিকল্পনা ও পূর্ব প্রস্তুতি ছিল বদরুলের। এ লক্ষ্যেই আম্বরখানা থেকে ২৫০ টাকা দিয়ে চাপাতি কিনে। কিন্তু ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে হত্যার উদ্দেশ্যে এবং ২৫০ টাকা দিয়ে চাপাতি কেনার বিষয়টি আড়াল করে বদরুল।

২০১২ সালে খাদিজাকে উত্যক্ত করতে গিয়ে গ্রামবাসীর গণপিটুনির শিকার হওয়ার বিষয়টি ঘুণাক্ষরেও উল্লেখ করেনি। অথচ ওই ঘটনাকে ব্যবহার করে জামায়াত-শিবিরের হামলা দেখিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে সে। বাগিয়ে নেয় ছাত্রলীগের পদ-পদবি। কিন্তু আদালতের কাছে সে উল্টো দাবি করে, খাদিজার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল।

ছাত্রলীগের পদে থাকার তথ্যও আদালতকে জানায়নি সে। ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ২০০৯-২০১০ সালের ঘটনা থেকে বর্ণনা শুরু করে বদরুল। এরপর সোজা চলে আসে ২০১৬ সালে।

বদরুল খাদিজাকে উত্যক্ত করার বিষয়টি এড়িয়ে গেছে পুরো জবানবন্দিতে। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে বার বার সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে খাদিজার সঙ্গে ‘প্রেম’ ছিল তার।

গ্রেফতারের পর দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় খাদিজার সঙ্গে যুগল ছবি, সেলফি, অডিও-ভিডিও বদরুলের রয়েছে কি-না তা প্রাথমিকভাবে যাচাই করে দেখা হয়। বদরুল তখন এ সংক্রান্ত কোনো প্রমাণই উপস্থাপন করতে পারেনি পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কাছে।

খাদিজার স্বজনরা বলছেন, প্রেম নয়, সেই সময়ের স্কুলপড়ুয়া কিশোরী খাদিজাকে উত্যক্ত করত বদরুল। নানাভাবে ফুসলিয়ে না পেরে  হুমকি দিয়ে চেষ্টা করেছিল প্রেমে বাধ্য করতে।

সর্বশেষ সোমবার পরীক্ষার সময় পানীয় পাঠায় বদরুল। কিন্তু তা পান করেনি খাদিজা, এমনকি স্পর্শও করেনি। স্বজনদের দাবি, বদরুল নিজেকে রক্ষায় খাদিজাকে প্রেমিকা দাবি করছে। তারা প্রশ্ন করেন, চাপাতির এমন কোপ কি প্রেমের পরিচয় দেয়?

অডিওতে বদরুল নিজেকে ছাত্রলীগের নেতা, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক পরিচয় বার বার দিয়েছেন। তবে ১৬৪ ধারার সময় বিষয়টি উল্লেখই করেনি। শুধু তাই নয়, বদরুলের ব্যাপারে খোদ তার পরিবার, তার স্কুল, তার বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার সংগঠনের নেতাকর্মীরাও এখনো অনেক অন্ধকারে রয়েছেন।

কারণ মিথ্যাচার, সাজানো কাহিনীর মাধ্যমে সত্য গোপনে সে পটু। বুধবার সিলেটের অতিরিক্ত মহানগর মুখ্য হাকিম উম্মে সরাবন তহুরা জবানবন্দী নেন বদরুল আলমের।

ছাত্রলীগ নেতা হওয়ার নেপথ্যে:

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের মুনিরজ্ঞাতি গ্রামের নিম্ন আয়ের পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে বদরুল দ্বিতীয়। ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী সে। টানাপোড়েনের সংসারে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার পাশাপাশি এসএসসি ও এইচএসসিতেও ভালো ফল করে সে। ভর্তি হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ছাত্রলীগের মিছিল-সমাবেশে মাঝে মাঝে যোগ দিতো।

২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি খাদিজাকে উত্যক্ত করতে গেলে গ্রামবাসী তাকে গণপিটুনি দেয়। কিন্তু বদরুল সবাইকে জানায়, জামায়াত-শিবির তার উপর হামলা চালিয়েছে। পরে সিলেটের জালালাবাদ থানায় স্থানীয় শিবির কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করে বদরুল।

আর এরপর থেকে বনে যায় ছাত্রলীগ নেতা। তাকে অনুসারী হিসেবে কাছে টেনে নেন শাবি ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থ। চলতি বছরের ৮ মে ছাত্রলীগের কমিটিতে বদরুলকে এক নম্বর সহ-সম্পাদক করা হয়। অথচ ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাতকের আয়াজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে চাকরি নেয় বদরুল।

ওই গণপিটুনির পর বদরুল তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারের সহানুভুতিও পায়। বদরুলকে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায় চিকিৎসা করানো হয়। তখন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ছাপা হয় ‘শিবিরের হামলায় রঙিন স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে বদরুলের’, ‘পঙ্গু হতে চলেছেন বদরুল’ ইত্যাদি শিরোনামে নানা প্রতিবেদন।

এমনকি মিথ্যাচার ও অভিনয়ে শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবালকেও বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয় বদরুল। কলম ধরেন তিনি। লিখেন, ‘মেধাবী বদরুল আর হাঁটতে পারবে না?’।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন