আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



হৃদরোগে আক্রান্ত অর্ধেকের বয়স ৪০ এর নিচে

Published on 29 September 2016 | 3: 08 am

রাজধানীর শের-ই-বাংলা নগরের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে রয়েছে ৪১৪টি শয্যা। প্রতিটি শয্যায় চলছে হৃদরোগে আক্রান্ত বিভিন্ন রোগীর চিকিৎসা। সেখানে সদ্য জন্মলাভ করা শিশু যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছেন ৯০ ঊর্ধ্ব প্রবীণ নারী। হাসপাতালে অপেক্ষমাণ রয়েছেন আরো কয়েক হাজার রোগী।

হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য দেশের একমাত্র সরকারি হাসপাতালের পঞ্চাশ শতাংশ রোগীই ৪০ বছরের নীচে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক (আর.পি) ডা. পীযুষ বিশ্বাস জানালেন এসব তথ্য।তিনি বলেন, ‘হৃদরোগের শিকার সাধারণত বয়স্করাই যে হচ্ছে এটি সত্য নয়। শিশু ও নারীরাও হৃদরোগের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। অল্প বয়সে পুরুষরাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।’

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব হার্ট দিবস। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০০টি দেশ গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালন করছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘পাওয়ার ইয়র লাইভ’। খাবারে কিছু পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পাশাপাশি মদপান ও ধূমপান বন্ধ করতে পারলেই আপনি হয়ে উঠবেন আরো শক্তিশালী।

বাংলাদেশ ২০০০ সাল থেকে দিবসটি জাতীয়ভাবে পালন করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করেছে।

জানা গেছে, বিশ্বের এক নম্বর হন্তারক রোগ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে হৃদরোগকে। প্রতিবছর প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষ মারা যাচ্ছে এই রোগে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শুধু পুরুষ নয়, শিশু এবং নারীরাই অধিকতর হৃদরোগের ঝুঁকির ভেতরে অবস্থান করছে। আর সে কারণেই বারবার শিশু ও নারীর ওপর বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার কথা বলা হয়।

শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং ধূমপানমুক্ত পরিবেশ ছাড়া একজন ব্যক্তির পক্ষে হৃদরোগের ব্যাপারে ঝুঁকিমুক্ত থাকা কঠিন। তাই সকলে মিলেই সুস্থ হার্টবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ সচল রাখার জন্য শিশুর সুস্থ হার্টের দিকে আমাদের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, তাই হার্ট সুরক্ষার আন্দোলন ও তৎপরতার বাইরে নারীকে রাখা হলে সেটা হবে ঠিক হবে না।’

মানসিক উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, আবেগের আগ্রাসন, কাজের বাড়তি চাপ, জীবনযাপনের চাপ প্রভৃতি অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ক্রমাগত মানবজীবনে আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যাওয়া, কাজকর্মে তাড়াহুড়া, আধুনিক জীবনযাত্রায় নিত্যদিনের দুর্ভাবনা সরাসরি মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়া ঘটায় বা প্রভাব ফেলে। জীবনের দৌড়ে যদি গতি বাড়ানো কাজ করে মন, তবে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বাড়ে মনে। আজকের মানুষ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। স্বাভাবিকভাবেই এর জন্য তাকে চড়া দামও গুণতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন অসংক্রামক রোগে।

জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক জানান, আউটডোরে চার শতাধিক রোগীর জায়গায় হাজার জনকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। আউটডোরে এখন বেশির ভাগ রোগীকে ওষুধ দিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে এখানে ৯৯ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। ২১৫ জন মেডিকেল অফিসার রয়েছেন। ৯৯৭ জন কর্মচারী রয়েছেন। কিন্তু এতো সংখ্যক রোগীর চিকিৎসায় মান রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেল বেড না পাওয়ায় অনেক রোগীকেই মাটিতে বিছানা পেতে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই তাদের চিকিৎসা চলছে। চাঁদপুর থেকে এসেছেন আমেনা বেগম হোসেন (৫২)। তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। বেড না পাওয়ায় মাটিতে পাতা বিছানাতেই চিকিৎসা চলছে তার।

আমেনা বেগম হোসেনের আত্মীয় অভিযোগ করলেন, এখানে বেড বিক্রি হয়। গার্ডরা টাকা নেয়। আমি এক গার্ডকে কিছু টাকা দিয়ে রেখেছি। এখনও বেড পাইনি। এখানের চিকিৎসা খরচ ক্লিনিকের চেয়ে কম। তবে বেড পাওয়া একটু মুশকিল।

মিরপুর থেকে হার্টে ছিদ্র নিয়ে হাসপাতালে এসেছে সুমন রহমান। তার বাবা একজন সিএনজি অটোরিকশা চালক। জানালেন, জন্মের পর থেকেই সুমনের হার্টে ছিদ্র থাকায় স্কুলে পাঠাতে পারিনি। সামর্থ্য কম। এখানে এসেছি চিকিৎসা নিতে। কিন্তু বেড পাইনি। তাই মেঝেতে বেড নিয়েছি গার্ডকে ২০০ টাকা দিয়ে।

গাজীপুর থেকে আব্দুল হাকিম তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন এ হাসপাতালে। বললেন, স্থানীয় সরকারি হাসাপাতাল থেকে এখানে আসতে বলেছে। ২ দিন ধরে মেঝেতে পরে রয়েছে আমার স্ত্রী। কোনো ডাক্তার বা পরীক্ষার খবর নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জেনেভায় প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান রিপোর্টে বলেছে, হৃদরোগ ও রক্তনালীর রোগ এবং ক্যান্সারের অসংক্রামক রোগ মানবজাতির স্বাস্থ্যহানির জন্য প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তা আরো তীব্রতর হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল ২০০৮ সালে বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ অসংক্রামক রোগের কারণে মারা গেছে। এ সংখ্যা একই বছরে বিশ্বে মৃত্যুর মোট সংখ্যার প্রায় ৬৩ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, মানুষের গড়পড়তা আয়ু একটানা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠ জনসংখ্যা স্থায়ীভাবে বাড়ছে। ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের কারণেও মৃত্যুবরণকারী লোকসংখ্যা আরো বাড়বে। অনুমান অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুবরণকারী লোকসংখ্যা ৫ কোটি ৫০ লাখ হবে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন