আজ বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ ইং, ০৬ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ঝগড়া বিবাদ মীমাংসার ফজিলত

Published on 23 September 2016 | 4: 48 am

ঝগড়া-বিবাদ সম্পর্কে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফে সূরা হুজরাতের ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মুমিনদের দুটি দল যদি নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়ে বসে, তখন তোমরা উভয়ের মধ্যে ফয়সালা করে দেবে, অতপর তাদের একদল যদি অন্য দলের ওপর অত্যাচার করে, তাহলে যে দলটি অত্যাচার করছে তার বিরুদ্ধেই লড়াই করবে- যতক্ষণ পর্যন্ত সে দলটি আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে না আসে। যদি দলটি ফিরে আসে তখন তোমরা দুটো দলের মধ্যে ন্যায় ও ইনসাফের সাথে ফায়সালা করে দেবে এবং তোমরা ন্যায়বিচার করবে; নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক ‘ন্যায় বিচারকদের ভালোবাসেন।’
পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সর্বত্রই বিবাদ অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। দুনিয়াতে মানুষের বসবাসের শুরুতে হাবিলকে হত্যার মাধ্যমে কাবিল বিবাদের সূচনা করে। এর আগেও আল্লাহ যখন আদম সৃষ্টির ইচ্ছা ফেরেশতাদের কাছে প্রকাশ করেছিলেন তখন ফেরেশতারা প্রভুর কাছে অভিযোগ করেছিলেন মানুষ দুনিয়ার জমিনে পরস্পর খুন-রাহাজানি করবে। ঝগড়া-বিবাদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারকে কেন্দ্র করে কখনো ফায়দা লোটার জন্য, কখনো নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সৃষ্টি হয়ে থাকে। ঝগড়া-বিবাদ ভাই-ভাইয়ে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, চাচা-ভাতিজার মধ্যে, এক গোত্র অন্য গোত্রের মধ্যে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে নিম্ন পদবির চাকরিজীবীর সাথে, পরস্পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের মধ্যে, পরস্পর ছাত্র সংগঠনের, এক গ্রামের সাথে অন্য গ্রামের, আত্মীয়ের সাথে আত্মীয়ের হয়ে থাকে। সূরা মায়েদার ৬৪ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘আল্লাহ ফ্যাসাদকারীকে ভালোবাসেন না’। বর্তমানে প্রায়ই দেখা যায় সামান্য একটু পারস্পরিক বিবাদকে কেন্দ্র করে আমাদের পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। কেউ একসাথে থাকতে চায় না। একটু-আধটু হতে না হতে বাবা-মা থেকে ছেলেরা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পৃথক হয়ে যাচ্ছে। মা-বাবার কথা দূরে থাক নাম পর্যন্ত অনেক সন্তান শুনতে পারে না। সামান্য বিষয় নিয়ে প্রতিবেশীরা কেউ কারো সাথে কথা বলে না। বড় ভাইয়ের সাথে ছোট ভাই কথা বলে না। সূরা আল ইমরানের ১০১-১০২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে যথাযথ ভয় করো আর মুসলমান হওয়া ছাড়া কখনো মৃত্যুবরণ করো না। আর তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’
ঝগড়া-বিবাদ সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। পারস্পরিক বিবাদকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, খুন, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, অপহরণ, হানাহানি, রাহাজানি, দখল-বেদখলের ঘটনা ঘটে। এর ফলে সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা অস্থির হয়ে পড়ে। আল্লাহ সুবহানতায়ালা আমাদের বিবাদ সৃষ্টি না করে বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার জন্য হুকুম করেছেন। ইনসাফের সাথে বিবাদ মীমাংসাকারীদের আল্লাহ ভালোবাসেন। আমরা অনেক সময় বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার সময় একটু-আধটু এদিক-সেদিক করে ফেলি। আল্লাহ আমাদের সমতার ভিত্তিতে ইনসাফের সাথে বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার জন্য বলেছেন। সূরা মায়েদার ৪২ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘আল্লাহ ন্যায়নিষ্ঠদের ভালোবাসেন’।
ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার ফজিলত সম্পর্কে সূরা হুজরাতের ১০ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘মুমিনরা তো (একে অপরের) ভাই-বেরাদার, অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও, আল্লাহ পাককে ভয় করো। আশা করা যায় তোমাদের ওপর দয়া ও অনুগ্রহ করা হবে।’ যারা ন্যায়বিচার করবে বিবাদ মিটিয়ে দেবেন, আল্লাহ তাদের ওপর দয়া করবেন। যারা আল্লাহর দয়া পাওয়ার জন্য মনোনীত হবেন তারাই প্রকৃত ভাগ্যবান। আমরা যদি আল্লাহর দয়া পাওয়ার আশা করি তাহলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের বিবাদগুলো মিটিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে চেষ্টা করতে হবে। আমরা যদি প্রত্যেকের অবস্থান থেকে ছোটখাটো বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি তাহলে পরিবার, সমাজ সবই সুন্দর হবে। আমরা আল্লাহর দয়া পাব।
আজকাল প্রায়ই ছোটখাটো বিরোধ নিয়ে তালাকের মতো তুচ্ছ ঘটনা অহরহ ঘটছে। ভাই ভাইকে খুন করে ফেলছে। আমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসি তাহলে বিবাদ মেটানোর ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সুযোগ থাকার পরও যদি আমরা বিবাদ না মিটিয়ে আরো উসকে দেই তাহলে আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে অপছন্দনীয় হয়ে যাবো। আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় হলে জাহান্নাম আমাদের জন্য অবধারিত। বিবাদ অনেক সময় সন্দেহ থেকে সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে সূরা ইউনূসের ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, তাদের বেশির ভাগ ব্যক্তিই নিজের আন্দাজ অনুমানের অনুসরণ করে, আর সত্যের পরিবর্তে আন্দাজ অনুমান তো কোনো কাজে আসে না।
আবু দাউদ শরীফে হজরত মেকদাদ ইবনে আসওয়াদ রা: থেকে বর্ণিত হজরত রাসূল সা: এরশাদ করেন, ‘ভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যাকে ফেতনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। ভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যে ফেতনা থেকে দূরে রয়েছে এবং ভাগ্যবান সে ব্যক্তিও, যে এতে পতিত হয়ে ধৈর্যাবলন্বন করেছে। তার জন্য ধন্যবাদ।’ ওই হাদিস পর্যালোচনা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যারা নিজেকে ফেতনা, ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে রাখবে এবং অন্যকে ফেতনা-বিবাদ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত করবে। তারাই ভাগ্যবান। যারা বিবাদ সৃষ্টি থেকে দূরে থাকবে। তারা জান্নাতের কাছে অবস্থান করবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে। সূরা মায়েদার ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কল্যাণমূলক ও খোদাভীরুতার কাজে পরস্পর সহযোগী হও, মন্দ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে পরস্পর সহযোগী হয়ো না।’


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন