আজ বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ ইং, ০৬ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ঈমানের দাওয়াত

Published on 21 September 2016 | 4: 31 am

দ্বীন ও ইসলামের বুনিয়াদ এই বাস্তবতা মেনে নেওয়ার উপর নির্ভরশীল যে, আমাদের ও গোটা বিশ্বজগতের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। তিনি আপন শক্তি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে সমস্ত কিছু সুনিপুণভাবে পরিচালনা করছেন। যে ব্যক্তি এ কথা মানে না, বিশ্বাস করে না তার নিকট দ্বীন ও ধর্মের বাণী মূর্খ্য লোকের প্রলাপসদৃশ।

মূল কথা হলো খোদা তাআলার বড়ত্ব ও ক্ষমতাই হলো দ্বীনের প্রধান বিষয়। দ্বীনের দাওয়াত প্রদান ও ধর্মের কোন বিষয়ের আলোচনা কেবল ঐ ব্যক্তির সাথেই করা যায় যে উপরোক্ত কথাকে দীল থেকে বিশ্বাস করে।

খোদা তাআলার বড়ত্বের জ্ঞান ও সত্ত্বার পরিচয় মানুষের নিকট আপন সত্ত্বার পরিচয়ের মতোই সহজ স্বাভাবিক। একথাকে বোঝানের জন্য বড় দালীলিক আলোচনার প্রয়োজন নেই। এজন্য দুনিয়ার মানবজাতি বরাবরই একথাকে বিশ্বাস করে আসছে। এমনকি ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতার এ-যুগেও অধিকাংশ মানুষ খোদায়ে পাকের বড়ত্বকে স্বীকার ও বিশ্বাস করে। ফলে দেখা যায়, আল কোরআন তার দাওয়াতী আলোচনার ক্ষেত্রে এই বিষয় তথা খোদা তাআলার পরিচয়ের বিষয়ে দীর্ঘ ও ব্যাপক আলোচনা করেনি। তবুও কোরআন আল্লাহ তাআলার পরিচয় সম্পর্কে দলীল ও প্রমাণের মাধ্যমে যতটুকু আলোচনা করেছে, তা প্রত্যেক ব্যক্তির দীলে ঈমান ও একীন পয়দা করবে, যদি না তার বিবেক বিকল হয়ে যায় ও অনুভূতি শক্তি বিলুপ্ত হয়ে যায়। যে আপন বুদ্ধি বিবেককে অজ্ঞতা ও অন্ধত্বের শীকলে বেঁধে রেখেছে সে তাওহীদ ও একত্ববাদের উজ্জ্বল দলীল প্রমাণ মেনে নিতে অক্ষম।

এ সংক্রান্ত আলোচনার পূর্বে একটি বিষয় মনে রাখা চাই যে, আল কোরআন আল্লাহার পরিচয় দান ও ঈমানের দাওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে তর্কশাস্ত্রীয় পদ্ধতি অবলম্বন করেনি। যে পদ্ধতির কারণে ব্যক্তির জ্ঞান যুুক্তি তর্কের সামনে মাথা নত করে ঠিকই কিন্তু সেই ব্যক্তির দীল ও দেমাগ সেই বিষয়কে এতমেনান ও প্রশান্ত চিত্তে কবুল করে না। কোরআন এমন মানতেকী জটিলতা গ্রহণ করেনি যাতে মানব হৃদয়ে একীন স্থায়ীভাবে বসে না।

বরং কোরআনের বর্ণনারীতি অত্যন্ত চমৎকার ও সাবলীল ভাষায় মানবজাতির নিকট আপিল করছে যে, তুমি যে বিরাট অন্তহীন সৃষ্টিজগত দেখছো- যার একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ তুমি- সেই জীব ও জগত নিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তা ফিকির করো, তুমি নিজেই হাকীকত উপলব্ধি করতে পারবে। কোরআনে কারিম তোমার সম্মুখে যেসব দলীল ও নিদর্শন উপস্থাপন করছে সে সবের দিকে দিব্যদৃষ্টিতে তাকাও, গভীরভাবে ভাবো, দীল দিয়ে পড়ার চেষ্টা করো, তবে এসবই তোমার দীলে ঈমান ও একীনের শীতল পরশ বুলিয়ে দিবে। তোমার হৃদয়ে আপনা আপনিই পরম সৃষ্টিকর্তার প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস পয়দা হবে।

উপরোক্ত কথাগুলো সামনে রেখে আসুন আমরা কিছু আয়াত তেলোয়াত করি। মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,- “নিঃসন্ধেহে আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি, রাত ও দিনের পরিবর্তন, মানুষের উপকারী মালামাল বহনকারী সমুদ্রে চলমান নৌযান, মহান আল্লাহ যে বৃষ্টি আসমান থেকে বর্ষণ করে নির্জীব যমীনকে সজীব করেন এবং সেখানে বিচরণ করান প্রাণীকুলকে, বাতাসের গতি বদলানো, আসমান-যমীনের মাঝে ভাসমান মেঘমালা- এসবের মাঝে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শন ও আয়াত।    (সুরা বাকারা)

এই আয়াতে কোরআন মাজিদ আসমান যমীনের সৃষ্টি, দিন ও রাতের পরিবর্তনের নির্ধারিত নিয়ম, সমুদ্রে জাহাজ ও নৌকার চলাচল, বৃষ্টি ও তার ফলাফল, বাতাসের দিক পরিবর্তন এবং আকাশ ও যমীনের মাঝে বিচরণশীল মেঘমালার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে, মানব জাতিকে বলছে এসব নিয়ে সামান্য ভাবো। যদি তুমি জাগ্রত বিবেক ও স্বচ্ছ বোধ নিয়ে ভাবো তাহলে দেখবে যে, এসব বস্তু তোমাকে স্পষ্ট ভাষায় বলছে যে, দেখো এত বিরাট জগত ও সৃষ্টিকূল আপনা হতেই সৃষ্টি হয়নি। বরং একজন অসীম প্রজ্ঞাবান ও সর্বময় ক্ষমতার মালিকই সব সৃষ্টি করেছেন।

সুরা আনআমে এরশাদ হচ্ছে-

“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলাই বীজ ও আঁটিকে বিদীর্ণ করে গাছ বের করেন। তিনি মৃত থেকে জীবিতকে ও জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। তিনিই আল্লাহ, তবে তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছো!”

এই আয়াতে আল কোরআন বলছে, তোমরা দেখতে পাও যে একটি বীজ বা ফলের আঁটি জমিতে রোপন করা হয়, এসবের কোন অনুভূতি শক্তি ও ইচ্ছা নেই। নেই ইচ্ছেমতো চলার শক্তি। কারণ এগুলো সম্পূর্ণ নিষ্প্রাণ। কিন্তু কিছুদিন পরই দেখতে পাও যে, যমীনে রোপিত শস্যবীজ ও ফলের আঁটি কোন এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় চীর্ণ হচ্ছে। এবং তা থেকে উদ্গত হচ্ছে কোমল কিশলয়। এরপর এই নরম পাতা বিদীর্ণ করছে তার উপরের মাটির স্তর। এরপর মাটির উপর বিকশিত হয় সবুজ শ্যামল গাছ। হে মানব জাতি! একটু মনপ্রাণ দিয়ে ভেবে দেখো তো, মাটির ভেতরে অবস্থিত ঐ নিষ্প্রাণ বীজকে কে ফাড়ল! কেই বা উদ্গত করলো ঐ নরম কোমল পাতা। এরপর কোন শক্তিবলে সুতার মতো কোমল ঐ লতা শক্ত যমীন ফুড়ে বের হলো! তোমার বিবেক বুদ্ধি কি একথা বলে যে, এরকমভাবে একটি গাছ আপন শক্তিবলেই হয়ে গেল!!

কখনোই নয়। তোমার বিবেক সুস্থ থাকলে, তোমার জ্ঞান-বুদ্ধি সচল থাকলে অবশ্যই বলবে যে, একজন বড় প্রজ্ঞাবান ও ক্ষমতাবান সত্ত্বাই এসব করেন। তিনিই হলেন মহান রব আল্লাহ।

তাঁর অসীম কুদরাত ও ক্ষমতার প্রকাশ শুধু প্রাণহীন বীজ বা আঁটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আয়াতটির ভাষ্য একথার দাবী করে। মহান আল্লাহ আরো অসংখ্য নিষ্প্রাণ বস্তু থেকে প্রাণী বের করেন, এবং  প্রাণী থেকে প্রাণহীন বস্তু পয়দা করেন। যেমন তিনি নিষ্প্রাণ ডিম থেকে প্রাণ সম্পন্ন জানোয়ার বের করেন। আবার প্রাণওয়ালা জানোয়ার থেকে নিষ্প্রাণ ডিম পয়দা করেন। সদা সর্বদা তোমরা এমন অনেক বস্তু ও প্রাণী দেখছো। খোদাতাআলার কুদরত ও ক্ষমতার কত স্পষ্ট আয়াত ও নিদর্শন তোমাদের দৃষ্টির সামনে। তারপরও তোমাদের কী হলো। উদ্ভ‌ান্ত হয়ে কোনদিকে দৌড়াচ্ছো তোমরা!!

মাওলানা মনজুর নোমানী (রহ:)


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন