আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাঙালি জাতির জীবনে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে

Published on 09 August 2016 | 8: 57 am

আবদুল হালিম

“যদি রাত পোহালে শুনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই ……..
বিশ্ব পেত এক মহান নেতা আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা। ”

বিশ্ব ইতিহাসে ব্যতিক্রম ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধটা হয়েছিল উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সশস্ত্র সৈনিকদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের। সেই যুদ্ধে শ্রমিক, কৃষক, দিন মজুর, ছাত্র, জনতা এবং বাঙালি সশস্ত্র সৈনিক অংশ নিয়েছিল। পুলিশ, ইপিআর, সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য ছাড়া বাকিদের প্রশিক্ষণ ছিল খুবই সামান্য। তারা ছিল বাঙালি। একই কাতারে থেকে শিক্ষক ও ছাত্র এই লড়ায়ে অংশ গ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশ কে পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য এই সংগ্রাম। সেই লক্ষ্য অর্জন হয়েছে-আমরা পেয়েছি একটি দেশ “ বাংলাদেশ”। যাঁদের ত্যাগে অর্জিত এই দেশ তাঁদেরই নেতা আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রসিদ্ধ ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের ভাষায়-
দিন চলে যায় রাত চলে যায়
চলতে থাকে আঁকার রেশ
“শেখ মুজিবকে আঁকতে হবে”
আঁকতে চাইলে বাংলাদেশ।

বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশে এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যাঁর অবদান ছিল অসাধারণ তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই অবদানের জন্য তিনি ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃত। বাঙালির হৃদয়ে এই ত্যাগী রাজনীতিবিদ ও মানবহিতৈষীর স্থান অমলিন। ইতিহাসেও তিনি হয়ে আছেন চিরভাস্বর।
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিবস শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বৃহত্তর ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। ১৯৪৭ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন।ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র অবস্থায় তিনি মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু চেতনায় সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক শেখ মুজিব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ আদর্শ বিচ্যুত হয়ে দল ছেড়ে দেন। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর তিনি রাজনীতিতে সম্পূর্ণ সক্রিয় হন। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ছিল পুরোপুরি অসাম্প্রাদায়িক ও পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা এরই বাস্তব রূপায়ণ। নেতা ও নেতৃত্বেও গর্ব তাঁকে স্পর্শ করেনি কখনো। শেখ মুজিব খুবই সাদামাটা জীবন যাপন করতেন, ছিলেন উদার ও মানবতাবাদী। ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকেই সব সময় বড় করে দেখেছেন তিনি। এজন্য তাঁকে অসংখ্যবার কারা বরণ করতে হয়েছে। খাদ্য সংকটের জন্য বিক্ষোভের দায়ে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। কিন্তু বন্দি অবস্থায় এই আন্দোলনের সমর্থনে অনশন করেন। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ নীপিড়ন থেকে মুক্তির অসামান্য দলিল ছয় দফার রূপকার ছিলেন শেখ মুজিব।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। কিন্তু পশ্চিম    পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী বাঙ্গালীদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়। এই শৃঙ্খল থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের সাতই মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। এই ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের এক অসামান্য দলিল। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের নাজুক পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব দেশ পরিচালনার ভার নেন। তাঁর নেতৃত্বে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ এই চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচিত হয়। বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠা করেন মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ও শিশু একাডেমী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা তাঁরই অবদান। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে এদেশের নাগরিকত্ব দিয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাঙ্গালি যিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে বিশ্বসভায় বাংলাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবন্ধুর চোখে ছিল সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ।
পঞ্চাশ বছরের একটি মানুষ একটি জাতিকে তুমি-তোমরা-তোমাদের সম্বোধন করছেন, ভালোবাসার দাবিতে তাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, হুকুম করছেন, আদর-সোহাগে স্নেহ-প্রশ্রয়ে শাসন করছেন, পরামর্শ দিচ্ছেন, পথের দিশা দিচ্ছেন নিশায়-অমানিশায়, তিনি তাদের সবচেয়ে বড়ো আত্মীয় হয়ে যাচ্ছেন; দেশের মানুষ তা মনেও নিচ্ছে মেনেও নিচ্ছে এবং মেনে নিয়ে ধন্য হচ্ছে; তৃপ্ত-পরিতৃপ্ত এবং বিশ্বাসী ও সাহসী হয়ে উঠছে। তিনি হয়ে গেলেন স্বপ্নের সমান বড়ো, বিশ্বাসের সমান পবিত্র- এমনটি সংসারে আর ঘটেনি। এ

ই ধূলিপরে আকাশতলে এটি দৃষ্টান্তহীন এক বাস্তবতা। আমাদের ভাগ্য, আমাদের নেতা ও জাতির পিতা এতটা উঁচুতে উঠতে পেরেছিলেন। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর, সুবাসিত সংগ্রামমুখর গৌরবদীপ্ত স্বপ্নঘেরা ও সম্ভাবনাময় দেশ বাংলাদেশ ও তার অসামান্য প্রাণস্পর্শী মানুষগুলোকে সম্মানে- সম্ভ্রমে বিশ্বপরিচিতি দিয়েছেন। তার উল্টো পিঠে লেগে লেপ্টে আছে আমাদের থকথকে অপমান, দায়িত্বহীনতা ও কৃতঘœতার ছবি। আমাদের দূর্ভাগ্য, কিছু বেপথু ও অকল্পনীয় নিষ্ঠুর মানুষ ছায়ায় ও আলোছায়ায় থাকা কিছু নষ্ট ও ভ্রষ্ট মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় অকালে অসময়ে তাঁকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নেয় চরম বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে যুক্তাবস্থায় ঠান্ডা মাথায় ঘটানো বিশ্বের সর্ব নিষ্ঠুর পারিবারিক হত্যাকান্ড ঘটানোর মধ্য দিয়ে। কুখ্যাত খন্দকার মোস্তাক ও তার অনুসারি এবং সেনাবাহিনির কিছু বেপথু তরুণ অফিসার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্পষ্টভাষী। তিনি কখনও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। তিনি ছিলেন দূরদর্শী। তিনি তাঁর দলকে উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অনমনীয় মনোভাবের জন্যই প্রতিপক্ষ তাঁর সামনে পরাজিত হয়েছিল। তাঁর  জীবন অতিবাহিত হয়েছিল রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। জীবনের অনেকগুলো বছর কেটেছিল কারাগারে। তিনি শিখিয়েছিলেন কিভাবে অধিকার আদায় করতে হয়। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে সংগ্রাম করতে হবে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারদর্শী। তিনি সবসময় দলের নেতা-কর্মী, সাধারণ মানুষের মতের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি সর্বদা সাধারণ মানুষের একদম কাছে থাকতে পছন্দ করতেন। তাঁর আদর্শগুলো আমাদের সকলের মাঝেই থাকা উচিত। চর্চা করা উচিত প্রতিনিয়ত।
তিনি বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন,মানুষের অধিকার আদায় করতে চেয়েছিলেন, তিনি গরীব দুঃখীর মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন, দেখতে চেয়েছিলেন একটি স্বনির্ভর সোনার বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন যমুনা সেতুর। তাই এই সেতু নির্মাণের পর তাঁর নামেই রাখা হয় এই সেতুর নাম।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর মহান আদর্শ বাঙালি জাতির জীবনে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। বিশ্ব মানচিত্রে আজ বাংলাদেশ সম্মানিত আসনে অধিষ্ঠিত। এই মহান গৌরবের কৃতিত্ব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার। তিনি যে সব উদ্যোগ নিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিন রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাঁর আহ্বানে যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করা সকল সুনাগরিকের দায়িত্ব। তাঁর স্বপ্নের “সোনার বাংলা” রূপায়নের মধ্যেই তাঁর স্মৃতি অমর হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ ও বাঙালির অধিকার আদায়ে নেতৃত্বদান করার জন্য এই মহান নেতাকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির খেতাবে ভূষিত করা হয়। তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠন তথা তাঁর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মধ্য দিয়ে এই মহান নেতাকে যতার্থ মর্যাদা দান ও শ্রদ্ধা জানানই হোক আজকের শোক দিবসের অঙ্গিকার।

Abdul Halim
লেখকঃ যুগ্ম সম্পাদক মাসিক সোনালী সন্দ্বীপ


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন