আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



নিরাপত্তা নিয়ে আতংকে বিদেশীরা – ছুটি নিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ

Published on 01 August 2016 | 3: 13 am

গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার পর বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত বিদেশীরা নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের কাছে চিঠি দিচ্ছেন। দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনারসহ প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানাচ্ছেন।

এতেও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিদেশী কর্মকর্তারা দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন। ছুটিতে যাওয়ার নামে তারা ঢাকা ত্যাগ করতে পারেন। এক্ষেত্রে ছুটির বিষয়ে অনুমতির জন্য সরকারের সম্মতি চাওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে কয়েকশ’ জাপানি নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাইকার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিদিওসি ইরিজাকি। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় জাইকার প্রায় অর্ধশত প্রকল্পের কাজ চলছে।

এগুলোতে কর্মরত জাপানি নাগরিকদের বিশেষ নিরাপত্তা দেয়ার জন্য ওই চিঠিতে মন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নিরাপত্তার প্রয়োজনে জাইকার কর্মকর্তারা যাতে নিজ দেশে ছুটিতে যেতে পারেন সে বিষয়ে সরকারের সম্মতি চাওয়া হয়েছে।

এই চিঠি পাওয়ার পর জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ৪৭টি প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি চিঠি দিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব এবং ৪৭টি প্রকল্পের পরিচালকদের কাছে চিঠি পাঠানোর সত্যতা স্বীকার করেছেন ইআরডির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।

বিদেশীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রোববার বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। বিদেশীদের থাকার জায়গা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র সর্বত্রই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। যখন যেখানে তারা চাচ্ছেন তাদের সেখানেই নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। দূতাবাস পল্লীসহ সব স্থান এখন নিরাপদ। প্রয়োজনে জাইকার নিরাপত্তার জন্য আরও বিশেষ নজর দেয়া হবে।

পহেলা জুলাই গুলশানের আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় ৭ জাপানি, ৯ ইতালি নাগরিকসহ ২২ জন নিহত হন। এরপর ঈদের দিন শোলাকিয়ায় জঙ্গিরা হামলা চালায়। গত সপ্তাহে খোদ রাজধানীর কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় পুলিশ।

এর আগে জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি, ইতালির নাগরিক তাভেল্লা সিজারি খুন হন। এসব ঘটনার পর থেকেই নিরাপত্তা নিয়ে বিদেশীদের মধ্যে আতংক তৈরি হয়েছে। সরকার নিরাপত্তা জোরদার করলেও অনেক দেশই এতে সন্তুষ্ট নয়। ফলে এরই মধ্যে মেট্রোরেল ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অর্ধশতাধিক প্রকল্পে কর্মরত জাপানিদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশের নাগরিকরাও গভীর উদ্বেগের মধ্যে কাজ করছেন। রোববার বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ইইউ রাষ্ট্রদূত দেখা করে শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই বিদেশীদের নিরাপত্তা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করেছে। জাতিসংঘের দফতরগুলো মাঝে মধ্যেই তাদের কর্মীদের ঐচ্ছিক ছুটি দিচ্ছে।

কেউ বাসায় বসে কাজ করতে চাইলে সে অনুমতিও দিচ্ছে। এছাড়া ইতালি ও জার্মানির নাগরিকদের অনেকেই ছুটি নিয়ে দেশে গেছেন। তাদের কেউ কেউ না ফেরার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োজিত বিদেশীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল রোববার বলেন, সব প্রকল্পেই নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে জাপানের অর্থায়নের প্রকল্পগুলোর প্রতি দৃষ্টি তো আছেই। সরকারের পক্ষ থেকে প্রচুর কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফলে ভয়ের বিষয়টি কেটে যাবে। আশা করছি অতি দ্রুতই জাইকার প্রকল্পগুলো পূর্ণমাত্রায় চালু হবে।

সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রীর কাছে ১৪ জুলাই পাঠানো চিঠিতে জাইকার ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ১ জুলাই গুলশানে সন্ত্রাসী হামলায় যেসব নিষ্পাপ মানুষ হত্যা করা হয়েছে তার জন্য আমরা অত্যন্ত দুঃখ-ভারাক্রান্ত। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭ জন ছিলেন জাপানের নাগরিক।

আমরা সব জাপানি নাগরিকের নিরাপত্তা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে জাপানি কোম্পানির কর্মরতদের নিরাপত্তায় বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার জন্য আমি অনুরোধ করছি। কর্মসূচির পুনর্বিন্যাস এবং কেউ দেশে ছুটিতে যেতে চাইলে যাতে তাকে অনুমতি দেয়া হয় সে বিষয়েও অনুরোধ করছি।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ জুলাই জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ৪৭টি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের সচিব ও সংস্থার প্রধানদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জাপানিজ অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিটেন্স (ওডিএ) সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পে কর্মরত জাপানি কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

যেসব প্রকল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইআরডির পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজক্ট (মেট্রোরেল)। মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার পাওয়ার প্ল্যান্ট। ব্রিজ ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট। তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (পিইডিপি-৩)।

প্রকিউরমেন্ট অব স্যালাইন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। প্রজেক্ট ফর এয়ারপোর্ট সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি সিস্টেম। ক্রস বর্ডার রোড ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট। ঢাকা-চিটাগাং মেইন পাওয়ার গ্রিড স্ট্রেংদেনিং প্রজেক্ট। কাঁচপুর-মেঘনা-গোমতি ব্রিজ রিহ্যাবরিটেশন। কর্ণফুলী ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্ট (ফেজ-২)। নর্দান বাংলাদেশ ইন্টিগ্রেটেড প্রজেক্ট, রুরাল ইলেকট্রিফিকেশন আপগ্রেডিং এবং ন্যাশনাল পাওয়ার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট।

অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ রোববার বলেছেন, নিরাপত্তা ইস্যুটি সরকার গুরুত্ব সহকারে দেখছে। দেশের বিভিন্ন স্থাপনায়ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ফলে বিদেশীরা এখন আর অনিরাপদ মনে করছেন না। তিনি বলেন, কোনো সংস্থা যদি নিরাপত্তার ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাহায্য চায়, সে বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

প্রয়োজনে তাদের এসকর্ট দেব। ইইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠান শেষে সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউর রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুনের নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এ সংলাপে অংশ নেন।

বৈঠক সূত্র জানায়, ইইউয়ের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন ওই সংলাপে নিরাপত্তা ইস্যুতে সরকারের নেয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেন, শুধু গুলশান, বনানী ও বারিধারায় নিরাপত্তা জোরদার করলেই হবে না, সারা দেশেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকা দরকার।

সূত্র জানায়, জঙ্গিবাদ আতঙ্কে ঢাকায় জার্মানি দূতাবাসের দুই কর্মী আর বাংলাদেশে ফিরবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। জার্মানি রাষ্ট্রদূত ড. ইমাম প্রিনৎসের উদ্ধৃতি দিয়ে জার্মানি সংবাদ মাধ্যম ডয়চেভেলের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইআরডি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে জাইকার বর্তমানে বিনিয়োগ (প্রতিশ্রুতিসহ) প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে বৃহৎ কয়েকটি প্রকল্পে জাইকার অর্থায়ন হচ্ছে- ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (মেট্রোরেল) মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকা দিচ্ছে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা।

যমুনা রেলওয়ে ব্রিজ কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টে ব্যয় হবে প্রায় ১১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। জাইকা দেবে প্রায় ৮ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে মোট ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা ঋণ সহায়তা দিচ্ছে ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্র“ভমেন্ট প্রজেক্টে (বাংলাদেশ) মোট ব্যয় হবে ২ হাজার ৪৭২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকা দেবে মোট ১ হাজার ৮৫১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন