আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



পরিশোধন ছাড়াই কনডেনসেট বিক্রি – লোপাট ৫৩৩ কোটি টাকা

Published on 31 July 2016 | 3: 57 am

পরিশোধন না করে প্রায় ৫৩৩ কোটি টাকা মূল্যের কনডেনসেট (গ্যাসের উপজাত) বাজারে ছেড়ে দিয়ে জ্বালানি তেল ভেজাল করার অভিযোগ উঠেছে তিন রিফাইনারি কোম্পানির বিরুদ্ধে। ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত গোল্ডেন রিফাইনারি, লার্ক রিফাইনারি ও সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি- এ তিনটি কোম্পানি মোট সাড়ে ৭ কোটি লিটার কনডেনসেট ক্রয় করেছিল পেট্রোবাংলার কাছ থেকে। বিধান অনুযায়ী, এই কনডেনসেট পরিশোধন করে সরকারের কাছে বিক্রি করার কথা। কিন্তু তারা বিপিসির (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) কাছে মাত্র ২৯ লাখ লিটার পেট্রল ও ডিজেল বিক্রি করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাকি ৭ কোটি ২১ লাখ লিটারের পুরো কনডেনসেটই রূপান্তর না করে পেট্রল পাম্পে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে, যা পরিশোধনের পর এই জ্বালানির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫৩৩ কোটি টাকা। এই অর্থের পুরোটিই ওই তিন কোম্পানির পকেটে চলে গেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এহসানুল জব্বার বলেন, জ্বালানি তেল নিয়ে এই অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় জড়িত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উল্লিখিত তিন রিফাইনারি কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে অভিযুক্তদের কাছে জ্বালানি তেলের উপজাত কনডেনসেট বিক্রি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পরে তাদের লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করা হবে বলে।

জানতে চাইলে সিভিও পেট্রোর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজাম উদ্দিন বলেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয় যেভাবে অভিযোগ করছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আমাদের কনডেনসেট সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিধিবিধান অনুসরণ করেই আমরা যাবতীয় কাজ করেছি। আমাদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা সাময়িক। আশা করছি খুব শিগগিরই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে কর্তৃপক্ষ।

বর্তমানে দেশে তিনটি সরকারি ও ১২টি বেসরকারি তেল রিফাইনারি কোম্পানি রয়েছে। তারা পেট্রোবাংলার কাছ থেকে কনডেনসেট কেনে। কনডেনসেট থেকে পেট্রল, অকটেন ও অন্যান্য জ্বালানি তেল উৎপাদন করে বিপিসির কাছে বিক্রি করে। কিন্তু অভিযোগ আছে কতিপয় রিফাইনারি পেট্রল পাম্প মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশে ক্রয় করা কনডেনসেট পরিশোধন (রিফাইন) না করেই পুরোটাই ভেজাল আকারে পাম্পগুলোতে বিক্রি করে দিচ্ছে। এই ভেজাল তেল ব্যবহার করায় গাড়ির ইঞ্জিন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বিকল হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি দুষন হচ্ছে পরিবেশও।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের জুন থেকে এ পর্যন্ত গোল্ডেন রিফাইনারি মোট ২৩ হাজার ৯শ’ টন (২ কোটি ৯৮ লাখ লিটার) কনডেনসেট ক্রয় করে পেট্রোবাংলার কাছ থেকে। এর মধ্যে বিপিসির কাছে মাত্র ৯৪ টন (১ লাখ ১৭ হাজার লিটার) ডিজেল বিক্রি করেছে কোম্পানিটি। বাকি ২৩ হাজার ৮০৬ টন কনডেনসেটের কোনো হদিস নেই। লার্ক রিফাইনারি একই সময়ে ১৮ হাজার ৫শ’ টন কনডেনসেট ক্রয় করে। এর মধ্যে বিপিসির কাছে মাত্র ১৫শ’ লিটার পেট্রল ও অকটেন বিক্রি করেছে। বাকি ১৭ হাজার টনের কোনো হিসাব নেই। আর সিভিও পেট্রো ক্রয় করেছিল ১৯ হাজার টন কনডেনসেট। বিপিসির কাছে বিক্রি করেছে মাত্র ৭৯২ টন (৯ লাখ ৯০ হাজার লিটার) পেট্রল। তাদেরও বাকি ১৮ হাজার ২০৮ টন কনডেনসেটের হিসাব নেই। ক্রয় করা কনডেনসেট দিয়ে অন্য কোনো জ্বালানি তৈরি করেছে কিনা সে সংক্রান্তও কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি কোম্পানিগুলো।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানি ৩টি এখন পর্যন্ত ৫৭ হাজার ৬৮০ টন কনডেনসেটের কোনো হিসাব দিতে পারেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্বালানি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, কনডেনসেট পরিশোধন করতে গিয়ে ২ থেকে ৩ শতাংশ ‘প্রসেস লস’ হয়। কিছু অংশ দিয়ে জ্বালানি তেল ছাড়াও অন্য উপজাত তৈরি হয়। কিন্তু কোম্পানি ৩টি এ সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। তিনি বলেন, পুরো কনডেনসেট তারা বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে বিক্রি করে দিয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, রিফাইনারিগুলো পেট্রোবাংলার কাছ থেকে প্রতি লিটার কনডেনসেট ক্রয় করে ৪৪ টাকা করে। আর বর্তমানে প্রতি লিটার পেট্রল ৭৮ টাকা ও ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা করে। অভিযোগ আছে- কতিপয় অসাধু রিফাইনারি পেট্রোবাংলার কাছ থেকে ৪৪ টাকায় কনডেনসেট ক্রয় করে তা কোনো রকম পরিশোধন ছাড়াই ভেজাল আকারে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল বলে পেট্রল পাম্পের কাছে ৭০-৭২ টাকা দরে বিক্রি করে দিচ্ছে।

ভেজাল জ্বালানি তেলে সয়লাব : সারা দেশে অবাধে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল জ্বালানি তেল। এ তেল ব্যবহারে শুধু গাড়ির মূল্যবান যন্ত্রপাতিই নষ্ট হচ্ছে না, পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ভেজালের কারণে দেশে সরকারের জ্বালানি তেল বিক্রি কমে গেছে ১৬ শতাংশ। অথচ প্রতিবছরই দেশে গাড়ি আমদানি বাড়ছে। সে হিসাবে জ্বালানি তেলের ব্যবহারও বাড়ার কথা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভেজাল জ্বালানি তেল বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির তেল বিক্রি কমেছে। বিপিসির যে পরিমাণ তেল কম বিক্রি হয়েছে তা পূরণ করা হচ্ছে ভেজাল তেল দিয়ে। তাদের হিসাবে দেশে প্রতিবছর অন্ততপক্ষে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ভেজাল তেল বিক্রি হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কিছুদিন আগে জানিয়েছেন, ভেজাল জ্বালানি তেল বিক্রির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ভেজাল তেল বিক্রি করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। ভেজাল রোধে অকটেন ও পেট্রলের দামও কমানো হয়।

জানা গেছে, সারা দেশে ভেজাল তেলের রমরমা ব্যবসা হওয়ায় অনেকে যথাযথ অনুমোদন না নিয়েই পেট্রল পাম্প খুলছে। সারা দেশে এ রকম ১০৩টি বেআইনি পেট্রল পাম্প শনাক্ত করেছে বিপিসি। চলতি বছরের শুরুর দিকে ভেজাল তেল বিক্রি বন্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বিপিসি। এতে বলা হয়, ভোক্তা পর্যায়ে মানসম্মত জ্বালানি তেল পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব বিপিসির। কিন্তু ভেজাল জ্বালানির বিস্তার ও অবৈধ বেচাকেনার কারণে বিপিসির জ্বালানি তেল বিক্রি কমে গেছে। এই অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত অসাধু বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর বেশিরভাগ কনডেনসেট কালোবাজারে বিক্রি করছে। ভেজাল তেল বিক্রির সঙ্গে ট্যাংক-লরি মালিক, বিভিন্ন সমিতি এবং ফিলিং স্টেশনের কতিপয় মালিকরা জড়িত।

এর আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থা সুপার রিফাইনারি নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভেজাল জ্বালানি বিক্রির অভিযোগ এনেছে। এ বিষয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- ২০০১ সাল থেকে জ্বালানি তেলে কনডেনসেট মিশিয়ে আসছে সুপার রিফাইনারি। বিভিন্ন সময় জ্বালানি মন্ত্রণালয় তদন্ত করে প্রতিষ্ঠানটিকে দোষী সাব্যস্ত করলেও তেলে ভেজাল দেয়া এখনও অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন