আজ রবিবার, ১৯ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৪ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বেলাল মোহাম্মদ আলো হাতে আঁধারের এক যাত্রী # (তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার্ঘ্য)

Published on 30 July 2016 | 3: 02 pm

কানাই চক্রবর্তী

‘ঐ যারা আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী , তুমি কি তাদের মত সত্যি নও?’ বেলাল মোহাম্মদ জীবিত থাকলে কি বলতেন জানি না, তবে তিনি আসলেই আলোর পথের যাত্রী ছিলেন এবং থাকবেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘আছ অন্তরে চিরদিন!’ কিংবা ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো, সেইতো তোমার আলো।’
একাত্তরে অন্ধকারের যাত্রী হয়েও বেলাল মোহাম্মদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। ইথারে ইথারে দেশ ও দেশের বাইরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে তার সৃষ্টি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যোগ করতে পেরেছিলো নতুন মাত্রা। এই ভূমিকার জন্য তিনিও হয়ে যান ইতিহাসের অংশ। দেরীতে হলেও এসবের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন স্বাধীনতা পদক।
আসলে বেলাল মোহাম্মদ ছিলেন একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। জাতি তাকে কতটুকু সম্মান জানাতে পেরেছিলেন সেটি বড় কথা নয়। তবে তিনি তার দীর্ঘ জীবনকে নানাভাবে সম্মানিত করেছেন -করেছেন অর্থবহ। ‘যুদ্ধ শেষ- দেশ স্বাধীন’ অতএব, সব কর্তব্য শেষ এমনটি কোনদিন তিনি মনে করেননি। বরঞ্চ তিনি বিশ্বাস করতেন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে আমৃত্যু লড়াই করতে হয়।
একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে তিনি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করেছেন স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করে। বিশেষ করে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে হঠাৎ করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়- তিনি তার বিপরীতে অবিচল অবস্থান নিয়ে ইতিহাসের দায়বদ্ধতা পালন করেছেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন স্বাধীনতা পাওয়াটাই সবশেষ কথা নয়। স্বাধীনতাকে অর্থবহ এবং উপভোগ করতে হলে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি দরকার। শিক্ষায় শিক্ষিত, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী, অপসংস্কৃতি, সকল প্রকার কূপমন্ডুকতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মান্ধতা দূর করতে পারলেই স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়। যুদ্ধপরবর্তী সময় থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেলাল মোহাম্মদের কর্মকান্ড পর্যালোচনা করলেই সেই সত্যটি বের হয়ে আসবে।
ব্যক্তি, সমাজ এবং জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তিনি শুধু তার চিন্তা কিংবা ভাবনাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না বরং তিনি তার ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য নিয়েছিলেন নানা উদ্যোগ। ২০১০ সালে অর্জিত স্বাধীনতা পদকটি তিনি উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশ বেতারকে। পাওয়া নগদ অর্থ দিয়ে তার জন্মস্থান সন্দ্বীপে গণশিক্ষা এবং বেকার যুবকদের কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য গঠন করেছিলেন লালমোহন-মোজাফফর কল্যাণ ট্রাস্ট।
বেলাল মোহাম্মদ প্রচলিত অর্থে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না তবে তার রাজনৈতিক ভাবনা এবং আদর্শ ছিলো। পর্যাপ্ত উৎপাদন ও ন্যায্য বন্টনের সুরাহা এবং প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে ভাই ভাই চেতনায় বিকাশ সাধনই চিলো তার লক্ষ্য।
রাজনীতি যদি শুধু মানুষের কল্যাণের জন্য হয় তাহলে বেলাল মোহাম্মদের সেই রাজনীতি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জন্য অবশ্যই অনুসরণীয় হতে পারে।
স্বাধীনতা ঘোষণার জীবন্ত সাক্ষী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘প্রতিষ্ঠাতা’ কবি বেলাল মোহাম্মদ ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই লোকান্তরিত হয়েছেন। পরিণত বয়সে মৃত্যুবরণ করলেও সবার একটি আকাংখা ছিলো ‘আরো কয়েকটি বছর বেঁচে থাকলে কি হতো?’ কিন্তু জন্ম-মৃত্যুতে কোনো হাত নেই। এটি বিধির বিধান মেনে নিয়েও বলা যায় তিনি শুধু শারীরিকভাবে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু রেখে গেছেন অনন্য ত্যাগ, আদর্শ আর স্বপ্ন। তার এই ত্যাগে অনুপ্রাণিত হয়ে অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে তাকে জানানো যায় যথার্থ সম্মান এবং শ্রদ্ধা।
এই শ্রদ্ধা তাকে দুই ভাবে জানানো যেতে পারে। প্রথমটির সাথে যোগ হতে পারে সরকারি উদ্যোগ। বেলাল মোহাম্মদের সব গ্রন্থিত ও অগ্রন্থিত গ্রন্থ, লেখা বই বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত সব লেখাসহ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নিয়ে ঐতিহাসিক বইটি সরকার নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করে প্রয়োজনে বেশী করে ছাপিয়ে ¯কুল-কলেজ পাঠাগারসহ বিভিন্ন গ্রন্থগারে বিলি করতে পারে। এতে করে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে বিতর্ক আছে তা আস্তে আস্তে প্রশমিত হতে পারে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে জাগ সন্দ্বীপ নিয়ে তিনি যে স্বপ্ন দেখেছেন তা বাস্তবায়ন করা এবং লালমোহন-মোজাফফর কল্যাণ ট্রাস্ট-এর কর্মকান্ড অব্যাহত রাখা। এই উদ্যোগটি সন্দ্বীপের বিশিষ্টজনরা নিতে পারেন। না হলে তাকে নিয়ে আমরা যা বলি না কেন কিংবা যত স্মরণসভাই করি তা হবে শুধু আনুষ্ঠনিকতা মাত্র।

 


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন