আজ শুক্রবার, ২৫ মে ২০১৮ ইং, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



জঙ্গিবাদের পেছনে শিক্ষক : নিয়োগে সতর্কতার পরামর্শ

Published on 24 July 2016 | 2: 50 am

গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলার ঘটনার পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তৃতি নিয়ে নতুনভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে। দুটি ঘটনায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি জঙ্গিবাদের সাথে শিক্ষকদের জড়িত থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে বাংলাদেশের আলোচিত সব জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেতৃত্বেই ছিলেন শিক্ষকরা। মাদ্রাসার শিক্ষকদের দিয়ে এর যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের শিক্ষকরাও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন। আর এ শিক্ষকরা শিক্ষকতার আড়ালে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করছেন জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে।

শিক্ষকদের জঙ্গি কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আআমস আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘তাদের অনেকেই শিক্ষক ছিল, এক্ষেত্রে তো বলার কিছু নেই। তারা শিক্ষকতা পেশায় এসে শিক্ষকতাকে ব্যবহার করেছে অশিক্ষকসুলভ কার্যক্রমের মাধ্যমে।’

তিনি বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ সবর্ত্রই বিষয়টি এখন দেখা দিচ্ছে। সেজন্য শিক্ষক নিয়োগের সময় আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’

আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘শুধু আমাদের দেশে নয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ পেশার আড়ালে কিছু মানুষ এ কাজগুলো করে যাচ্ছে। তাই শিক্ষক নিয়োগে আরও বেশি সচেতন হওয়া দরকার।’

বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত সশস্ত্র জঙ্গিবাদী সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। ৬৩ জেলায় বোমা বিস্ফোরণ করে আলোচিত হওয়া এ জঙ্গি সংগঠনটির অন্যতম প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই বাংলার শিক্ষক ছিলেন। জঙ্গি নেতা শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা লুৎফর রহমানও নওগাঁ’র মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের বাংলার শিক্ষক ছিলেন। এ সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা প্রায় সব নেতাই বিভিন্ন মাদ্রাসা ও কলেজের শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে কারাগারে থাকা সংগঠনটির শীর্ষ নেতা মাওলানা সাইদুর রহমানও শিক্ষকতায় জড়িত ছিলেন।

এদিকে কারাগারে থাকা আরেক আলোচিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসিম উদ্দীন রাহমানী ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুলিশের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটি ২০১৩ সাল থেকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। বাংলাদেশের যুবকদের উগ্রপন্থী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে জিহাদের মাধ্যমে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই এর মূল লক্ষ্য। আল কায়েদার মতাদর্শ অনুসরণকারী এ জঙ্গি সংগঠনটির হামলার মূল লক্ষ্য মুক্ত চিন্তার অনুসারী, ব্লগার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। নিয়মিতই বিভিন্ন শ্রেণীপেশার লোকদের হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে এ জঙ্গি সংগঠনটি।

গত ২৬ জুন এ সংগঠনের দাওয়াতী সেলের শীর্ষ নেতা মাওলানা মো. নাইম ওরফে সাইফুল ইসলাম ওরফে সাদ, সোহেল আহম্মেদ ওরফে সোভেল গ্রেফতার হন, এই দুইজনই রাজধানীর দুটি মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। এছাড়া জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের অন্যতম প্রধান মুফতি রউফও মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদী সংগঠন হিসেবে সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছে হিযবুত তাহরীর। এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রথম প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ গোলাম মাওলা এর প্রতিষ্ঠাতা। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মহিউদ্দীন আহমেদ ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক শেখ তৌফিক এ সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন। ২০০২ সাল থেকে সক্রিয়ভাবে জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে হিযবুত তাহরীর।

সম্প্রতি গুলশান হামলায় ঘটনাস্থল থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিমকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেছে আইনশৃংখলাবাহিনী। এর আগে হাসনাত রেজাসহ কয়েকজন শিক্ষককে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে বহিষ্কার করেছিল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। এদিকে গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহসানকে আটক করেছে পুলিশ।

গত সোমবার ঢাকার এক চিকিৎসক পরিবারের বিদেশ গিয়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার তথ্য জানায় আইনশৃংখলা বাহিনী। পুলিশের দাবি, তারা উগ্রপন্থায় জড়িয়ে সিরিয়ায় গেছেন। ওই চিকিৎসকের স্ত্রী নাঈমা আক্তার যশোর এমএম কলেজের শিক্ষিকা ছিলেন।

তবে সাম্প্রতিক হামলার পর আইনশৃংখলাবাহিনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ৩৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গোয়েন্দা নজরদারির তথ্য গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে অসংখ্য শিক্ষকের জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকার তথ্য উঠে এসেছে।

জঙ্গি তৎপরতায় শিক্ষকদের জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক আলোচনাসভায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর অধ্যক্ষদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, এ পেশায় এদের টিকতে দেওয়া হবে না। আপনারাও খেয়াল রাখবেন, শিক্ষকদের ভেতর যেন কোনো কুশিক্ষক, কুলাঙ্গার ঢুকে না পড়ে।

শিক্ষকদের এ ধরনের প্রবণতা প্রতিরোধে করণীয় কী- জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আআমস আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শুধু মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ হলে এ সমস্যাগুলো থেকে যাবে। দেখা যায় যারা এ অপকর্মের সাথে যুক্ত তারা প্রথমে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়ার জন্য হয়তো ফলাফল ভালো করার দিকে নজর দেয়। তারপর শিক্ষক হওয়ার পরে শিক্ষকের পদবির অপব্যবহার করে, মানুষকে বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জঙ্গি তৎপরতার সাথে যুক্ত করছে।

সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী ২০০৫ সাল থেকে ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে জঙ্গি হামলায় ৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন। আর অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের গবেষণা অনুযায়ী, স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর অর্থায়নে দেশে ১৩২টি জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় রয়েছে।


Advertisement

আরও পড়ুন