আজ সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ ইং, ০১ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



নিরাপত্তাসামগ্রীর বিক্রি হরদম

Published on 21 July 2016 | 3: 29 am

একের পর এক টার্গেট কিলিং ও জঙ্গি হামলার পর এখন কেউ নিজেকে আর নিরাপদ মনে করছেন না। নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে এখন আলোচনা চলছে সর্বত্র। আইনশৃংখলা বাহিনীর নানা তৎপরতা এবং আশ্বাসে শংকামুক্ত হতে পারছেন না দেশের সাধারণ মানুষ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনেকে ব্যক্তিগতভাবেই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। আর ব্যক্তি পর্যায়ে নিরাপত্তার জন্য অনেকেই বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করছেন। অনেক এলাকায় ব্যক্তি পর্যায়ে নিজেরাই চাঁদা তুলে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করছেন।

এছাড়া বড় বড় মার্কেট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আর্চওয়ে গেট, সেন্সর অ্যালার্ম ও সার্চ মিররের (ভেহিক্যাল স্ক্যানার) ব্যবহার বহুগুণে বেড়ে গেছে। মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানে। হঠাৎ করে নিরাপত্তা নিয়ে শংকা দেখা দেয়ায় এসব সামগ্রীর বেচাবিক্রিও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এ খাতের ব্যবসা এখন বেশ জমে উঠেছে। গত দু’দিনে রাজধানীতে নিরাপত্তাসামগ্রী বিক্রির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন শপিংমল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মার্কেট ও আবাসিক এলাকা ঘুরে নিরাপত্তাসামগ্রীর পর্যাপ্ত ব্যবহারের দৃশ্য চোখে পড়েছে।

অন্যদিকে নিরাপত্তা নিয়ে শংকা দেখা দেয়ায় বেসরকারি নিরাপত্তা সেবাদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাও এখন রমরমা। প্রতিদিনই বিভিন্ন ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাকর্মীর চাহিদা জানানো হচ্ছে। অনেকে ব্যক্তি পর্যায়ে (গানম্যান) ও তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীর চাহিদাও জানাচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে বড় বড় কয়েকটি বেসরকারি সেবাদানকারী সংস্থার সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে। আইনশৃংখলা বাহিনী থেকে অবসর নেয়া অনেকেই বড় বড় এসব সংস্থায় চাকরি করেন। মূলত তাদেরই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রসহ নিয়োগ দেয়া হয়।

এদিকে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী অনেক প্রতিষ্ঠান অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসেই রাজধানীর বড় বড় কয়েকটি বেসরকারি নিরাপত্তা সেবাদানকারী সংস্থার পক্ষ থেকে দুই শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। এমনকি একটি নিরাপত্তা সেবাদানকারী সংস্থা ‘ডগ স্কোয়াড’ গঠনেরও অনুমতি চেয়েছে। তবে বেসরকারি পর্যায়ে কোনো নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে ডগ স্কোয়াড গঠন সংক্রান্ত নীতিমালা না থাকায় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু রাজধানীতেই বেসরকারি পর্যায়ে নিরাপত্তা সেবা দিয়ে থাকে এমন সংস্থার সংখ্যা দুই শতাধিক। এর মধ্যে অন্যতম সেবাদানকারী সংস্থাগুলো হচ্ছে- এলিট সিকিউরিটি সার্ভিস (এলিট ফোর্স), সিকিউরেক্স প্রাইভেট লিমিটেড, সিকিউরিটি গার্ড এজেন্সি (গ্রুফ ফোর), সেন্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড, প্রটেকশন ওয়ান, আইসিএল প্রাইভেট লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে সশন্ত্র নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে। এসব সংস্থার পক্ষ থেকে অনেক বেসরকারি ব্যাংক, বীমা ছাড়াও দেশের নামিদামি শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।

সরেজমিন পরিদর্শন ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে স্টেডিয়াম মার্কেট ও জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম মার্কেট ঘিরে নিরাপত্তাসামগ্রী বিক্রির দোকান গড়ে উঠেছে। শুধু এ দুটি মার্কেটেই নিরাপত্তাসামগ্রী বিক্রির ছোট-বড় দুই শতাধিক দোকান রয়েছে। এছাড়া চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর গুলশান, এলিফ্যান্ট রোডসহ বিভিন্ন বড় বড় মার্কেট এবং এলাকাভিত্তিকভাবে এসব সরঞ্জামের দোকান গড়ে উঠেছে। বায়তুল মোকাররম ও স্টেডিয়াম মার্কেটের দোকানগুলোর মধ্যে ক্যামেরা ভিশন, ক্যামেরা মিউজিয়াম, তাহমিন ইলেকট্রনিকস, ডিজিটাল ক্যামেরা মার্ট, বিচিত্রা ইলেকট্রনিকস, শিশির ইলেকট্রনিকস, ক্যামেরা জোন ও ডিজিটাল কালেকশন অন্যতম। তাহমিন ইলেকট্রনিকসের মালিক আবু তালেব যুগান্তরকে জানান, সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলা এবং আরও হামলার আশংকার কথা জানার পর নিরাপত্তাসামগ্রীর বিক্রি অনেক বেড়ে গেছে। নিরাপত্তার জন্য সাধরণ মানুষ সিসি ক্যামেরা, আর্চওয়ে, মেটাল ডিটেক্টর হ্যান্ডেল, দরজায় লাগানোর মেটাল ডিটেক্টর, গ্যারেট, সুপার স্ক্যানার বেশি কিনছেন। আর সহজলভ্য হওয়ায় বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগেও এসব স্থাপন করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে পাড়া-মহল্লার পাহারাদারদের হাতে এখন দেখা যাচ্ছে মেটাল ডিটেক্টর। আর চাহিদা বাড়ার কারণে এগুলোর দামও বেড়েছে কয়েকগুণ।

ক্যামেরা জোনের মালিক মাসুদ রানা জানান, অফিস বা বাসার নিরাপত্তা বাড়াতে বর্তমানে আইপি ও সিসি ক্যামেরা বিক্রি হচ্ছে বেশি। আইপি ক্যামেরা অনেক দূর থেকে ছবি রেকর্ড করতে সক্ষম। ইন্টারনেট সংযোগ বা ওয়াইফাই সুবিধার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে যে কোনো স্থানে এমনকি বিদেশে অবস্থানকালে এ ক্যামেরার মাধ্যমে তদারকি করা সম্ভব। ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনেও এটি তদারকি করা সম্ভব।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিসি ক্যামেরা বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে এভিটেক, ডাইয়ো, ক্যাম্পো, হিকভিশন, জিন ও ইয়োমাট ব্র্যান্ডের সিসি ক্যামেরা বিক্রি সবচেয়ে বেশি। এগুলো চীন, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও আমেরিকা থেকে আমদানি হচ্ছে। মান ও প্রকার ভেদে প্রতিটি সিসি ক্যামেরার মূল্য এক হাজার থেকে শুরু করে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে আউটডোর বুলেট ক্যামেরার (স্পিড ডোম) একেকটির দাম ৪৮ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। ৪টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও সংযোগের জন্য বক্সের দাম পড়ছে সর্বনিু সাড়ে তিন হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা। ৮টি ক্যামেরা সংযোগের জন্য দাম সর্বনিম্ন সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা। ১৬টি ক্যামেরা সংযোগের জন্য বক্সের দাম সর্বনিু সাড়ে ৮ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা। আর ৩২ ক্যামেরা সংযোগের জন্য বক্সের দাম সর্বনিু ৮ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা।

দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিসি ক্যামেরা ছাড়াও প্রতিটি আর্চওয়ে বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ থেকে শুরু করে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকায়। এছাড়া সেন্সর অ্যালার্ম ২০ হাজার টাকা, ভেহিক্যাল সার্চ মিরর ৩ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে মেটাল ডিটেক্টর বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪শ’ থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকায়। বেচাবিক্রি না থাকলেও দু-একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিরপত্তা সরঞ্জামের মধ্যে মাইন্ড ডিটেক্টর পর্যন্ত আমদানি করেছে। এর প্রতিটির মূল্য ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত চীনের তৈরি সিসি ক্যামেরায় বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। দেশের বাজারের ৯০ শতাংশ দখল করে রেখেছে চীনের তৈরি ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার দাম তুলনামূলক কম। এছাড়া তাইওয়ান, জার্মান, আমেরিকা, কোরিয়া থেকেও আমদানি হচ্ছে উন্নতমানের সিসি ক্যামেরা। তবে তুলনামূলক দাম বেশি হওয়ায় বাজারে এসব দেশের ক্যামেরা কম পাওয়া যায়।

ক্যামেরা ভিশনের স্বত্বাধিকারী আবদুস সালাম জানান, নিরাপত্তাসামগ্রীর মধ্যে সিসি ক্যামেরা ছাড়াও মেটাল ডিটেক্টর হ্যান্ডেল ও মেটাল ডিটেক্টর দরজাও বেশি বিক্রি হচ্ছে। একটি মেটাল ডিটেক্টর সর্বনিু ১ হাজার ৬০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের একটি পরিপূর্ণ দরজার দাম সর্বনিম্ন ১ লাখ ১৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা। আগে সিসি ক্যামেরা বিক্রি বেশি হলেও বর্তমানে মেটাল ডিটেক্টর পণ্যের বিক্রি বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে সন্দেহভাজনদের দেহ তল্লাশির সময় বিস্ফোরক ও গুলি ঠেকাতে এসব পণ্য বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন