আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



উচ্চ আদালতে ঝুলছে পাঁচশ’ জঙ্গির আপিল

Published on 17 July 2016 | 3: 40 am

নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ১৭৯ জন এবং বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আরও তিন শতাধিক জঙ্গির আপিল উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। এসব মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু মামলাজটের কারণে এগুলো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ফলে জঙ্গি হামলার শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে এসব দুর্ধর্ষ জঙ্গি কারাগারে বসেও নানা কৌশলে সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে, জঙ্গি কার্যক্রমে নির্দেশনা দিচ্ছে। সুকৌশলে সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে মেলামেশা করে তারা নতুনভাবে নেটওয়ার্ক বিন্যস্ত করছে বলে মনে করা হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জঙ্গি-সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রধান বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগুলোর নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

 এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘জঙ্গি হামলা-সংক্রান্ত মামলায় নিম্ন আদালতের ডেথ রেফারেন্স উচ্চ আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে। যারা এ ধরনের জঘন্য কাজ করেছে, তাদের বিচার দ্রুত শেষ করতে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে পুরনো ফৌজদারি মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বলা হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘জঙ্গিদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করার প্রয়োজন নেই। স্বাভাবিকভাবে জঙ্গিদের করা যে সব আপিল বিচারাধীন, সে সব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির কাজ চলছে।’

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (বিচার ও প্রশাসন) সাবি্বর ফয়েজ জানান, হাইকোর্ট বিভাগে বেশ কিছু জঙ্গির মামলা শুনানির জন্য অপেক্ষায় আছে। তবে তার কাছে কোনো হিসাব নেই। তিনি বলেন, ‘এসব মামলার পেপারবুক তৈরির কাজ গুরুত্ব সহকারে করা হচ্ছে। অনেক জঙ্গির মধ্যে মুফতি হান্নানসহ নামকরা বেশ কয়েকজন জঙ্গির মামলাও রয়েছে।’

সুপ্রিম কোর্টের একজন কর্মকর্তা বলেন, উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলোকে হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ- এই দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। এর মধ্যে আপিল বিভাগের মামলাগুলো প্রধান বিচারপতি আর হাইকোর্ট বিভাগের মামলাগুলো অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস উদ্যোগ নিলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এই ভয়ঙ্কর অপরাধীদের চূড়ান্ত বিচার ও দণ্ড কার্যকরের অপেক্ষা করছেন নিহতদের স্বজনরাসহ সারাদেশের মানুষ। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়কে তালিকাসহ চিঠি দেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে সলিসিটর কার্যালয়ের মাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। রাজধানীর গুলশান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গিদের ভয়াবহ হামলার পর সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত দশ বছর ধরে ২১ দুর্ধর্ষসহ প্রায় ৫শ’ জঙ্গির এসব মামলা বিচারিক আদালত হয়ে উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় দ কার্যকর করা যাচ্ছে না। ভয়ঙ্কর জঙ্গিরা অবস্থান করছে কাশিমপুর কারাগারসহ বিভিন্ন হাই সিকিউরিটি কারাগারে। এসব মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুত করার কাজ প্রশাসনিক জটিলতা, কার্যতালিকায় সিরিয়াল নেওয়াসহ নানা জটিলতায় আক্রান্ত। তাছাড়া এসব মামলার আসামি পক্ষের আইনজীবীরা আদালতের কাছে একের পর এক সময় বাড়ানোর আবেদন করেও বিচারিক কার্যক্রমকে দীর্ঘায়িত করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নিষিদ্ধ ঘোষিত জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই ও শায়খ আবদুর রহমানসহ শীর্ষ ৬ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। এরপর আর কোনো জঙ্গির ফাঁসির রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। অথচ দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১৭৯ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি রয়েছে। যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে, রমনায় পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, পল্টনে সিপিবির জনসভায়, খুলনা ও মিরপুরে কাদিয়ানি মসজিদে, একযোগে দেশের ৬৩ জেলায় এবং ঝালকাঠিতে বিচারকের ওপর বোমা হামলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আক্রমণের ঘটনায় গত ১০ বছরে এই ১৭৯ জঙ্গিকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেন বিচারিক আদালত। এ ছাড়া তিন শতাধিক জঙ্গিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এরপর জঙ্গিরা উচ্চ আদালতে আপিল করে। বছরের পর বছর পার হলেও উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি না হওয়ার এসব মামলার রায় কার্যকর করা যাচ্ছে না।

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সাল থেকে জঙ্গিবাদ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। রাজশাহীর বাগমারা, নওগাঁর রানীনগর, আত্রাই ও আশপাশ এলাকায় একাধিক মন্ত্রী ও বিএনপি নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় তারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। বিভিন্ন ব্যক্তিকে ‘নাস্তিক’ ও ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে তারা হত্যাযজ্ঞ চালায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হন। পরের বছর ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলার প্রায় ৬৩৪টি স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালায় জেএমবি। বিএনপি সরকারের শেষ দিকে বাংলাভাই ও শায়খ আবদুর রহমানসহ জেএমবির সব শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার ও বিচারের পাশাপাশি এবং হরকাতুল জিহাদ, জেএমবিসহ বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

বিভিন্ন স্থানের বোমা হামলার মামলায় একাধিক জঙ্গিকে মৃত্যুদ াদেশ দেন বিচারিক আদালত। সম্প্রতি মৃত্যুদ াদেশপ্রাপ্ত চারজনের ফাঁসি রায় বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এই রায়ের বিরুদ্ধেও আসামিপক্ষ আপিল করে। মামলাগুলো বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। ফাঁসির দ বহাল থাকা ওই চার জঙ্গি হচ্ছে- শেরপুরের আমজাদ হোসেন বাবু, নারায়ণগঞ্জের এইচ এম মাসুমুর রহমান, জামালপুরের আক্তারুজ্জামান ও ময়মনসিংহের আসাদুজ্জামান চৌধুরী পনির ওরফে আসাদ।

২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি শরীয়তপুরের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বোমা হামলার অভিযোগে কামারুজ্জামান ওরফে স্বপনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। ২০০৬ সালে সিলেটের দায়রা আদালত জঙ্গি আক্তারুজ্জামান, ২০০৮ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ জঙ্গি আসাদুজ্জামান, ২০১০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বোমা হামলার মামলায় জঙ্গি আবুল কালাম ওরফে শফিউল্লাহকে ফাঁসির আদেশ দেন। এসব রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের করা আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট তাদের ফাঁসি বহাল রেখেছেন।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন