আজ শনিবার, ১৮ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৩ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



কেউ পান মর্যাদা, কেউ যান কারাগারে!

Published on 11 July 2016 | 6: 11 am

সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দুই মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ খোকনকে মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। একই দিনে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভিকে উপমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সপ্তাহখানেক পর রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হয়। চমৎকার উদ্যোগ। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মর্যাদা বাড়লে জনগণেরই মর্যাদা বাড়ে। কিন্তু প্রশ্নটা হল, এই মর্যাদা নির্ধারণের মাপকাঠি কী? নারায়ণগঞ্জের মেয়র উপমন্ত্রী হলে রংপুরের মেয়র প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পান কোন যোগ্যতায়। বাকি মেয়রদের মর্যাদাই বা কী?

বর্তমানে দেশে ১২টি সিটি করপোরেশন আছে। তার মধ্যে নবগঠিত ময়মনসিংহ ছাড়া বাকি ১১টি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জনগণের রায় নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন মেয়ররা। কিন্তু তাদের একেক জনের ভাগ্য একেক রকম। কারো মর্যাদা বেড়েছে, কেউ বরখাস্ত হয়েছেন, কেউ মামলার আসামি, কেউ কারাগারে আছেন। আশা করি কাউকে বলে দিতে হবে না, আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা বহাল তবিয়তে আছেন, তাদের মর্যাদা বেড়েছে। আর বিএনপি সমর্থিতরাই দৌড়ের ওপর আছেন।

জনগণের রায় মন্ত্রণালয়ের কলমের এক খোঁচায় খারিজ হয়ে গেছে। ২০১৩ সালে বিপুল-উৎসাহ উদ্দীপনায় দেশের পাঁচ সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচটিতেই বিএনপি সমর্থিতরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাদের অবস্থা আপনারা জানেন? সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বরখাস্ত হয়েছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী এসএএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় কারাগারে আছেন। রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল নাশকতার মামলায় আসামি হিসেবে বরখাস্ত হয়েছেন। খুলনার মেয়র মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে নাশকতার মামলায় চার্জশিট হয়েছে। কিছুদিন কারাভোগ করে এখন জামিনে মুক্ত আছেন। গাজীপুরের মেয়র আব্দুল মান্নানও বরখাস্ত হয়েছেন। কখন কারাগারের ভেতরে থাকেন, কখন বাইরে থাকেন বোঝা মুশকিল। তবে দুই সৌভাগ্যবান মেয়র বরিশালের আহসান হাবিব কামাল ও কুমিল্লার মনিরুল হক সাক্কু বিএনপির সমর্থনে মেয়র নির্বাচিত হয়েও বহাল তবিয়তে আছেন। স্থানীয়রা জানেন তাদের এই থাকার গোপন রহস্য। দুজনই সরকারি দলের স্থানীয় এমপি ও নেতাদের সাথে সদ্ভাব রেখে দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্বাচনে জনগণের রায় যাইহোক, সরকার হয় কৌশলে তাদের দলে টেনেছে, নয়তো মামলা মোকদ্দমায় জেরবার করে ফেলেছে। সব সিটি করপোরেশনেই এখন সরকারের একক নিয়ন্ত্রণ। হয় পছন্দের প্যানেল মেয়র, নয়তো, নির্বাহী কর্মকর্তা মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন।

সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর মামলাটা তবু বোঝা যায়। কিবরিয়া হত্যার সুনির্দিষ্ট মামলা। কিন্তু রাজশাহী, খুলনা ও গাজীপুরের মেয়রদের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকানোর নামে এবং এ নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে বিএনপি-জামায়াত দেশজুড়ে যে তাণ্ডব চালিয়েছে, আমরাও তার বিচার চাই। কিন্তু নাশকতার এইসব মামলাগুলো অনেকটাই ঢালাও। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্যই এসব মামলাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। মেয়র নির্বাচিত না হলে বুলবুল, মনি, মান্নান নাশকতার মামলায় আসামি নাও হতে পারতেন। এখন নিশ্চয়ই তারা মাথা চাপড়াচ্ছেন, কেন যে নির্বাচন করতে গেলাম।

শুরুতেই বলছিলাম মেয়রদের পদমর্যাদার কথা। কোন মাপকাঠিতে, কোন যোগ্যতায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীর মর্যাদা ঠিক করা হল। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণের মেয়র যদি মন্ত্রীর পদমর্যাদা পান, চট্টগ্রামের মেয়র পাবেন না কেন? চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাসিরও তো সরকারি দলেরই। জানা গেছে, স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে কিছুটা কোণঠাসা হওয়ায় সরকারি দলের হয়েও মর্যাদাবঞ্চিত হতে হয়েছে তাকে।

নারায়ণগঞ্জের সেলিনা হায়াত আইভি সরকারি দলের হলেও নির্বাচিত হয়েছেন বিদ্রোহী হিসেবে। বিদ্রোহী হওয়ার অপরাধেই হয়তো তাকে সিকি মন্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। রংপুরের মেয়র শরফুদ্দিন ঝন্টু একসময় জাতীয় পার্টির এমপি ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। সরকারি দলের নীতিনির্ধারকদের নেকনজরের কারণেই রংপুরের মত ছোট সিটি করপোরেশনের মেয়র হয়েও মর্যাদা পেয়েছেন আধা মন্ত্রীর।

নির্বাচিত মেয়রদের মর্যাদা বাড়ানো খুব ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে ক্ষমতা বাড়বে স্থানীয় সরকারেরও। তবে সেটার একটা সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি ও যোগ্যতা থাকা উচিত। দল দেখে, ব্যক্তি দেখে মর্যাদা নির্ধারণ কোনো কাজের কথা হতে পারে না। সিটি করপোরেশনগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যেতে পারে। ‘এ’ ক্যাটাগরির সিটি করপোরেশনের মেয়র পেতে পারেন মন্ত্রীর পদমর্যাদা, ‘বি ‘ ক্যাটাগরির সিটি করপোরেশনের মেয়ররা পাবেন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ও ‘সি’ ক্যাটাগরির সিটি করপোরেশনের মেয়র পেতে পারেন উপমন্ত্রীর মর্যাদা।

এটা নির্ধারিত থাকলে, যিনি যে দল থেকেই নির্বাচিত হোন, প্রাপ্য মর্যাদা তিনি পাবেন, এটাই হওয়া উচিত। সিলেট, খুলনা, রাজশাহীর নির্বাচিত মেয়রদের কথা না হয় বাদই দিলাম। তারা তো বরখাস্ত হয়েছেন। কিন্তু যেভাবেই হোক কুমিল্লা আর বরিশালের মেয়র তো টিকে আছেন, তাহলে তারা মর্যাদা পাবেন না কেন? আ জ ম নাছির কেন মর্যাদাহীন? সিকি হোক, আধুলি হোক; কিছু না কিছু তাদের প্রাপ্য।

দলীয় পরিচিতি, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দই যদি মেয়রদের মর্যাদা ও কখনো কখনো দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হয়, তাহলে আর এত আয়োজন করে নির্বাচন করার দরকার কী ছিল। সরকারি দলের মনোনীতদের নির্বাচিত ঘোষণা করে, তাদের ইচ্ছামত মর্যাদা দিয়ে দিলেই হতো।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
probhash2000@gmail.com


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন