আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



নজরদারিতে নর্থ সাউথসহ ৩৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

Published on 11 July 2016 | 5: 17 am

রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিসান রেষ্টুরেন্ট ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহের পাশে জঙ্গি হামলায় বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ প্রেক্ষাপটে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর ৩৯টি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ক্লাসে অনুপস্থিত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের চলাফেরার উপরও এই নজরদারি অব্যাহত থাকবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান পদ্ধতি, লাইব্রেরী এবং তাদের ওয়েবসাইটগুলোও খতিয়ে দেখবে গোয়েন্দারা। এছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ছাড়াও প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিক, অর্থের যোগানদাতা, ট্রাস্টিবোর্ডে কারা রয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তারা কোন আদর্শের, কোথায় লেখা-পড়া করেছেন এ বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হবে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুইটি বড় জঙ্গি হামলার সাথে সম্পৃক্তদের অধিকাংশই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থী হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।

নর্থ সাউথ ইউনির্ভাসিটি ছাড়াও যে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে তার মধ্যে মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ১৪টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, নয়টি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল/কলেজ এবং তিনটি বেসরকারি কলেজ রয়েছে। এর আগেও এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকদের জঙ্গি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ট্রাস্ট্রি ও মালিক পক্ষের সম্ভাব্য নামসহ সন্দেহভাজনদের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে।

এ নিয়ে সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানিয়েছিলেন, সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িতরা প্রায় সবাই প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। এর আগে কিছু অপরাধীকে আমরা চিহ্নিত করেছি তারাও প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে কি করা যায় তা ভাবা হচ্ছে।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) বোম্ব ডিস্পোজাল টিমের প্রধান ও অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. ছানোয়ার হোসেন বলেন, জঙ্গি বিষয়টি নিয়ে সারাবিশ্বে এখন আতঙ্ক তৈরী হয়েছে। আমরা ২০০৯ সাল থেকে এটি নিয়ে কাজ করছি। তবে সম্প্রতি গুলশানে এবং শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর আবারো নতুন করে ভাবছি।

নজরদারির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, সন্দেভাজন সব জায়গাতেই নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কারণ, হিসেবে তিনি জানান, জঙ্গি দমন এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, তরুণদের আগে ধর্মীয় কথাবার্তা বলে রিক্রুট করা হয়। তারপর মোটিভেশনের (প্রণোদনার)মাধ্যমে তাদের অপারেশনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়। এরপর দেওয়া হয় ফিজিক্যাল (শারীরিক) ট্রেনিং। সর্বশেষে তাদের চাপাতি ও অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং দেওয়া হয়।

নর্থ সাউথ ইউনির্ভাসিটি রয়েছে বিশেষ নজদারিতে। চলতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়টির বিষয়ে তদন্ত করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়টির লাইব্রেরিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরিরের বইসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের বই পাওয়া যায়। এই তদন্তের পর বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় এ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। তদন্ত করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য প্রফেসর ডা. ইউসুফ আলী।

এ বিষয়ে ইউসুফ আলী বলেন, তদন্তে আমরা জিহাদী বই পেয়েছিলাম। তদন্তের পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম। সম্প্রতি যে প্রেক্ষাপট আমাদের সামনে রয়েছে তাতে এই বিষয়টির দিকে সরকারের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে জানতে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির জনসংযোগ কর্মকর্তা বেলাল আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, আপনারা জানেন আমাদের ইউনির্ভাসিটি ঢাকার অন্যান্য ইউনির্ভাসিটি থেকে আলাদা। এখানে কোনো কিছুকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। জঙ্গিবাদ তো প্রশ্নই ওঠে না।

তিনি বলেন, আপনি আমাদের ওয়েবসাইট ঘেটে দেখেন, সেখানে আমাদের পাঠ্যবই, পাঠদান পদ্ধতিসহ সকল কার্যক্রম দেওয়া আছে। আমরা অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যতিক্রম।

নর্থ সাউথের পাঠদান সম্পর্কে জানতে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সামিয়া সুলতানা ও ফাহিম রেদুয়ানের সঙ্গে। তারা বলেন, ইউনির্ভাসিটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা হলেও এই নিয়ে আতঙ্কিত নন তারা। কারণ, হিসেবে তারা জানান, প্রতিষ্ঠান জঙ্গি বানানো শিক্ষা দেয় না। কেউ ইচ্ছে করে জঙ্গি দলে নাম লেখালে কারো কিছু করার থাকে না।

গত ১ জুলাই গুলশানের সন্ত্রাসী হামলায় মোট ২২ জন নিহত হন। যাদের মধ্যে ১৭ জন বিদেশি নাগরিক। যারা হামলা করেছিলেন তাদের বেশিভাগই বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক তাদের পরিচিতি:
আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর কমিটির যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ইমতিয়াজ খান বাবুলের ছেলে রোহান ইমতিয়াজ হামলাকারীদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ঢাকার স্কলাসটিকা স্কুলে ‘ও’ লেভেল পড়াশোনা করেন। পরে বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। ছয়মাস আগে গত ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ থেকে রোহান নিখোঁজ হন।

আরেক সন্ত্রাসী মীর সামিহ মোবাশ্বিরের বাবা মীর হায়াত কবীর একটি টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানির এক্সিকিউটিভ। মোবাশ্বিরও স্কলাসটিকা স্কুল থেকে সম্প্রতি ‘ও’ লেভেল সম্পন্ন করেন। ‘এ’ লেভেলে ভর্তি হওয়ার জন্য তিনি গুলশানের এমিনেন্স কোচিং সেন্টারসহ দুটি কোচিং সেন্টারে পড়ছিলেন। পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক ক্লাসে অংশ নেওয়ার কথা বলে তিনি গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি।

ফুটবল পাগল নিবরাস ইসলাম নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। পরে তিনি অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক মোনাশ ইউনিভার্সিটির মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসে পড়েন। সেখানে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট সার্ভিসেস’র কোষাধ্যক্ষও ছিলেন তিনি। এর আগে পড়েছেন ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল টার্কিশ হোপ স্কুলে। ২০১৪ সালের শুরুর দিক থেকেই তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পরিবার ও বাড়ির কারণ দেখিয়ে ২০১৫ সালের দিকে নিবরাস মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে যান। এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে বিচরণ কমিয়ে দেন নিবরাস।

হামলাকারী পাঁচ জনের মধ্যে আরেকজনের ছবি শনাক্ত করা হয়েছে তাসিন রওনক আন্দালিব নামে। আন্দালিব ধানমন্ডির সানিডেল স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল পাশ করেন। তিনিও মালয়েশিয়ায় মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে নিবরাস ইসলামের সহপাঠী ছিলেন।

এছাড়া গুলশানের জিম্মিদশা থেকে জীবিত ফিরে আসা হাসনাত রেজা করিম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে ২০১২ সালে নর্থ সাউথ ইউনির্ভাসিটি থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি থাকাবস্থায় তার চলাফেরা নিয়ে সন্দেহের জন্ম দেয়।

অন্যদিকে গুলশানে হামলার ঘটনার পর আইএস (ইসলামিক স্টেস)’র বরাত দিয়ে বাংলাদেশি তিন তরুণের ভিডিও প্রকাশ করে সাইট ইন্টেলিজেন্স। ভিডিওর প্রথম তরুণ সাবেক নির্বাচন কমিশনার সফিউর রহমানের ছেলে তাহমিদ রহমান শাফি। রাজধানীর উত্তরা এলাকায় তার বাসা, গ্রামের বাড়ি সিলেটে। ২০১৪ সালের ১৮ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে তাহমিদের বাবা সফিউর রহমান মারা যান। তাহমিদ গ্রামীণফোনে চাকরি করেছেন। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত সঙ্গীত বিষয়ক রিয়েলিটি-শো ‘ক্লোজআপ ওয়ানের’ প্রথম সিজনের মাধ্যমে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল তার। তাহমিদ নটরডেম কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছেন। এরপর তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে পড়েছেন।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দেশের বৃহত্তম ঈদগাহ ময়দান শোলাকিয়ার পাশে আজিমুদ্দীন হাই স্কুলের সামনে পুলিশ ও হামালাকারীদের গোলাগুলিতে নিহত আবির রহমানও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বিবিএ ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র ছিলেন। আবির বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল থেকে ‘এ লেভেল’ পাশ করার পর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে ভর্তি হন। তিনিও চার মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন