সন্দ্বীপে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি

::::: এ বি এম সিদ্দিক চৌধুরী ::::

১৯২৯ সালের জানুয়ারী মাসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন চট্টগ্রাম আসেন তখন তাঁকে সন্দ্বীপ নিয়ে আসার জন্য সন্দ্বীপের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব জনাব সেকান্দর হোসেন ও হালিম উল্যা চৌধুরী সহ আরো কর্তৃক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি উদ্যোগ নেন।

দুবলাপার নিবাসী আবদুল ওয়াহেদ মিয়ার মাধ্যমে চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নরত, আব্দুল মোক্তাদের ও সলিম উল্যা চৌধুরীর নিকট পত্র লেখেন। তারা দু’জন চট্টগ্রাম হাবিব উল্যা বাহার সাহেবের বাসায় কাজী নজরুলের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে সন্দ্বীপে আসার জন্য আমন্ত্রন জানান। নজরুল তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু কমরেড মোজাফ্ফর আহমদের জন্মভূমির দাওয়াত বিনা দ্বিধায় গ্রহন করেন। ঐ সময় কমরেড মোজাফ্ফর আহমদ ব্রিটিশদের কোপানলে পড়ে কারাগারে বন্দি ছিলেন।

অবশেষে বাংলা ১৩৩৫ সালের ১৫ মাঘ আবদুল মোক্তাদের ও সলিম উল্যা চৌধুরী কবি নজরুলকে সঙ্গে করে ষ্টীমার যোগে সন্দ্বীপ পৌঁছেন। তাদের সঙ্গে সঙ্গি হয়ে আসেন কমরেড মোজাফফর আহমদের ভাতুষপ্রত্র আব্দুল ওয়াজেদ মিয়া। স্টীমার থেকে তাঁকে সন্দ্বীপের তৈরী দেশীয় নৌকায় উঠিয়ে কুলে আনা হয়।

এ সময় কবি নজরুল সন্দ্বীপের মাটিতে প্রথম পা রেখেই বলে উঠলেন-“চমৎকার জায়গা, এ যেন একটা মায়াপুর”। আমার মত ভবঘুরে পর্যন্ত এখানে নীড় বাঁধতে চাইবে।”।

পরে কবিকে একটি শোভাযাত্রা সহকারে সন্দ্বীপ টাউনের ডাক বাংলোতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে সন্দ্বীপের বিখ্যাত সুমিষ্ঠ ডাবের পানি খেতে দিলে তা পানরত অবস্থায় হঠাৎ কবি বলে উঠলেন- “এ যেন একেবারে সরাবন-তহুরা! ভারি মিষ্টি”।

ইতোমধ্যে কবিকে এক নজর দেখার জন্য ডাক বাংলোতে অনেক লোকের ভিড় জমে যায়। তাদের উদ্দেশ্য করে কবি নজরুল বলে উঠলেন-“আপনাদের দেখে খুব ভাললাগছে। কি সুন্দর স্বাস্থ্য! কি কমনীয় চেহারা! আপনারা সবাই বুজি আরবী পড়তে ও সাঁতার কাটতে জানেন? বিলেতে কে কয়বার গিয়েছেন?

বিকেলে কবিকে সন্দ্বীপের ঐতিহাসিক কার্গিল সরকারী হাই স্কুল মাঠে এক বিশাল গণ সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। এ সম্বর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বাবু প্রশন্ন কুমার মোক্তার। কবিকে উদ্দেশ্য করে মানপত্র পাঠ করা হয়, তবে এ মানপত্র কে পাঠ করেছিলেন, এর রচয়িতা কে ছিলেন আর কতটি মানপত্র পাঠ কবিকে দেওয়া হয়েছিলো তাহার তথ্য পাওয়া যায়নি।

সম্বর্ধনা সভার পরের দিন কবি নজরুল কমরেড মোজাফফর আহমদ এর বাড়ি যান। মুছাপুর ইউনিয়নের খুরশিদ আলম তহসিলদারের বাড়ীই বস্তুত কমরেডের বাড়ি। সেখানে গিয়ে কবি মোজাফফর সাহেবের মেয়ে আফিফা খাতুনকে একটি কলম উপহার দেন। কবি মোজাফফর সাহেবের বাড়িতে কয়েক দিন অবস্থান করেন। সেখান হতে কবি সন্দ্বীপ টাউনে ফিরে এলে সন্দ্বীপের চরবধুর আলি আহম্মদ সাহেবের আমন্ত্রনে মোটর গাড়ি করে চরবধুর উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেকালে সন্দ্বীপে কোন মোটর গাড়ি ছিল না। আয়োজকেরা চট্টগ্রাম থেকে একখানা মোটর গাড়ি সন্দ্বীপে নিয়ে আসেন কবির চলাচলের জন্য। কিন্তু কবির ভাগ্যে মোটর গাড়িতে খুব বেশি সময় চড়া সম্ভব হয়নি। গাড়িটি এক পর্যায়ে খারাপ হয়ে যায়। অতপর কবি আট বেহারার পালকিতেই চড়েই সন্দ্বীপের বিভিন্ন যায়গায় যাতায়াত করেন।

গ্রামের অসমতল মেঠোপথে গাড়ি যখন ওঠানামা করছিলো তখন ভাবুক কবি হঠাৎ বলে উঠলেন- “পথের উপর ঢেউ খেলে যায় গাড়ি, কাহার দেশে”।

চরবধুতেও কবি তার বক্তৃতা ও গানে সকলকে মুগ্ধ করেন। সেখান হতে ফিরিবার পথে তিনি আবুল হোসেন মিয়ার বাড়িতে কয়েক ঘন্টার জন্যে আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। কবি সেই বার খুরশীদ আলম চৌধুরীর বাড়িতেও গিয়েছিলেন।

কবি সন্দ্বীপের রান্না-বান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। মহিষের কাঁচা দুধের দধিই তার সবচেয়ে লোভনীয় জিনিসে পরিণত হয়েছিলো। কবির ‘চক্রবাক’ বইখানি ছাপানোর জন্য সন্দ্বীপের বহুব্যক্তি তাঁকে অর্থ সাহায্য করেছিলেন।

সন্দ্বীপের সফরের পট ভূমিকাতেই কবি নজরুল তাঁর ‘মধুমালা’ গীতিনাট্য রচনা করেন। নজরুলের ‘মধুমালাতে আছে, “চারিদিকে সমুদ্রের জল কল্লোল, মাঝে সন্দ্বীপ”। তার নায়িকা ‘মধুমালা’ এই সন্দ্বীপেরই রাজকুমারী।

তাঁর“ শীতের সিন্ধু” কবিতায়– শীত ঋতুতে সন্দ্বীপের পথে বঙ্গোপসাগরের শান্ত বুকে বিহারের কথা আছে। সন্দ্বীপের গুবাক তরুর সারির ছায়াতলে বসে সেই সময় নজরুল তাঁর ‘চক্রবাক’ কাব্যের অনেকগুলো কবিতা এবং ভাটিয়ালী সুরে বহু ‘সাম্পানের গান’ রচনা করেন।

জানা গেছে-কবি নজরুল “মিলন মোহনায়” কবিতাটি চট্টগ্রাম হতে ষ্টীমার যোগে সন্দ্বীপ আসার পথে এবং “বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি” কবিতাটি কমরেড মোজাফফর সাহেবের বাড়ির বৈঠক খানাতে বসে রচনা করেছিলেন।

আজহার উদ্দিন সাহেব “বাংলা সাহিত্যে নজরুল” গ্রন্থে লিখেছেন “নজরুল একবার চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ কমরেড মোজাফফর আহমদের বাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে সমুদ্র দৃশ্য ও সমুদ্র স্নান পরম আনন্দের সাথে কবি উপভোগ করেছিলেন। এই অঞ্চলের সাম্পান ও সাম্পানের মাঝি, গুবাক তরুর সারির সৌন্দর্য যুগিয়েছে কবির অনেক গানও কবিতার রস প্রেরণা। নজরুলের “সিন্ধু হিন্দেুাল”, চক্রবাক, চোখের চাতকের অধিকাংশ গান ও কবিতা সমুদ্র প্রেরণায় রচিত।

সন্দ্বীপে নজরুলকে প্রদত্ত একটি মানপত্র হুবহু তুলে ধরা হলো। মানপত্রটি সন্দ্বীপের দুবলাপাড় নিবাসী আবদুল ওয়াহেদ মিয়ার নিকট হতে সংগৃহীত।

খোশ আমদেদ,

বুলবুলের কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাহেব সমীপেষু ।

হে অতিথি! সিন্দুর কনিষ্ঠ কন্যা আমাদের এই শ্যামল তট ভূমিতে তরুন প্রাণের সমস্ত আবেগ, সমস্ত আনন্দ লইয়া আমরা তোমাকে অভিনন্দন জানাইতেছি। দরিদ্র আমরা; গৃহে ডাকিয়া লইবার সামর্থ আমাদের কি আছে? চারিদিকের সফেন জলরাশির উচ্ছল আনন্দ-নর্তন আমাদিগকে আমাদের অভাব অভিযোগ ভুলাইয়াছে; তোমাকেও একান্ত আপনার বলিয়া গ্রহণ করিবে, তসলিম জানাইবে।

ওগো কৃষাণের কবি, আর্তের দরদী।

আমাদের প্রাণেরকথা গানের সুরে তোমার কণ্ঠের বুলবুল গাহিয়া বেড়াইতেছে। আমাদের ব্যাথা তোমাকে ব্যথিত করিয়াছে, আমাদের ‘ক্ষুধা’ তোমাকে অভিভুত করিয়াছে, ওগো বন্ধু! তাই আমাদের সমস্ত ভক্তিশ্রদ্ধা ভালবাসা উজাড় করিয়া তোমার ডালি সাজাইয়া আনিয়াছি। সমুদ্রের কল্লোল দিবারাত্র আমাদের নিকট কোন অজানার বাণী বহিয়া আনিতেছে; কোন দূর সীমান্তের পানে কে যেন হাত ছানি দিয়া আমাদিগকে ডাকিতেছে; সে ডাকে, সে হাত ছানিতে তুমি তোমার “গোপনপ্রিয়া”র উদ্দেশ পাইবে, তোমার বাঁশি নতুন সুরে বাজিয়া উঠবে, তোমার প্রাণ ভালবেসে আপ্লুত হইবে“ সে প্রাণের, সে গানের আনন্দধারায় আমাদিগকে উদ্বুদ্ধ কর। অনুপ্রাণিত কর, হে কবি! তোমার আগমন আমাদিগকে সবুজ প্রাণরসে সিঞ্চিত করিয়াছে।

নব বসন্তের হে নকীব !

তোমাকে সালাম জানাই।

ইতি

তোমার স্নেহের- মহিমান্বিত সন্দ্বীপের অধিবাসীগণ।

”১৬ মাঘ ১৩৩৫ বাংলা  * সুনীতি প্রেস, চট্টগ্রাম

সুত্র : Kolom Soinik ফেসবুক পেইজ। এছাও  এ বি এম সিদ্দিক চৌধুরীর এ লেখাটি বিভিন্ন প্রত্র পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছে।

শাহাদাৎ আশরাফ শাহাদাৎ আশরাফ

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market