আজ শনিবার, ২৬ মে ২০১৮ ইং, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



পাঁচ ব্যক্তিকে খুঁজছে পুলিশ

Published on 30 June 2016 | 8: 47 am

মিতু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে আরও অন্তত ৫ ব্যক্তিকে খুঁজছে পুলিশ। এরা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সেজন্য দেশের সব বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে তাদের ছবিসহ জীবনবৃত্তান্ত দিয়ে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে এদের পাওয়া গেলে আটক করে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সোপর্দ করতে বলা হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে এ সতর্কবার্তা ২৮ জুন রাতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে পাঠানো হয়।

যাদের নামে সতর্কতা জারি করা হয়েছে তারা হলেন : মুছা সিকদার ওরফে আবু মুছা, রাশেদ, আবদুল নবী, শাহজাহান ও কালু। এই পাঁচজনকে খোঁজা হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন মিতু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (ইমিগ্রেশন) আরেফিন জুয়েল বুধবার বলেন, মিতু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত ৮ জনের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। এরা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে স্পেশাল ব্রাঞ্চ থেকে। তারা যথারীতি ব্যবস্থা নিয়েছেন বলেও জানান।

কিলিং মিশনের ৮ জনের মধ্যে ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাকি পাঁচজনের মধ্যে মুছাকে আটক করার বিষয়টি জানা গেলেও পুলিশের পক্ষ থেকে তা স্বীকার করা হচ্ছে না।

সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার বুধবার দুপুরে বলেন, গ্রেফতারকৃত ওয়াসিম ও আনোয়ারের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে নাম আসা আরও ৫ জনকে খুঁজছেন তারা। এরা যাতে কোনোভাবে দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য দেশের সব বিমান, স্থল ও নৌবন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই পাঁচজনের বাইরে আর কাউকে খুঁজছেন কিনা কিংবা আর কেউ তাদের সন্দেহের তালিকায় আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, যখন যে আসামিকে পাওয়া যাচ্ছে বা গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েই তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। নতুন করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। মামলার তদন্ত অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মিতু হত্যার মিশনে অংশ নেয়া সব কিলারকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। কিলিং মিশনের প্রধান মুছা গ্রেফতার হলে হয়তো আরও নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যাবে। এর নেপথ্যে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের চিহ্নিত করা যাবে। পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া যাবে। ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে নাম আসা কিলিং মিশনের প্রধান মুছাসহ অন্য আসামিরা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সেজন্যই তারা দেশের সব বন্দরে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন।

এদিকে এ পাঁচজনের বাইরে আর কাউকে খোঁজা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, এর বাইরে আপাতত আর কাউকে খুঁজছে না তারা। এ পাঁচজনের মধ্যে কিলিং মিশনের নেতৃত্ব দিয়েছে আবু মুছা। তাকে গ্রেফতার করা গেলেই হয়তো এ ঘটনার নেপথ্যে আর কেউ আছে কিনা কিংবা আবু মুছা নিজেই এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী কিনা তা জানা যাবে।

তবে পুলিশের অপর একটি সূত্র দাবি করছে, মুছাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে মামলার তদন্ত। কারণ মুছার ওপরে গেলে বের হয়ে যাবে অনেক অজানা রহস্য। দৃশ্যপটে চলে আসবে চেনা মুখ। তাছাড়া মুছার নামে সতর্কবার্তা জারি করা হলেও এরই মধ্যে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, মুছাকে অন্তত ১৭ দিন আগে অর্থাৎ গত ১২ জুন আটক করেছে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা রাঙ্গুনিয়ার রাজানগরের বাড়ি থেকে প্রথমে মুছার ভাই সাইফুলসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে আটক করে। তাদের মাধ্যমে চাপ দিয়ে ১২ জুন মুছাকে আটক করতে সক্ষম হয়। যদিও গতকাল পর্যন্ত মুছাকে আটক করা হয়েছে এমন তথ্য নিশ্চিত করেনি পুলিশ। এদিকে মুছা চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট এলাকার যে ভবনে ভাড়ায় থাকতেন সে ভবনের মালিক মোহাম্মদ আনিস বলেছেন, ১৩ জুন থেকে মুছার বাসা তালাবদ্ধ।

সূত্র জানায়, মুছাকে আটক করা হলেও তাকে রহস্যজনক কারণে মিডিয়ার সামনে আনা হচ্ছে না। একই মামলায় অপর আসামি এহতেশামুল হক ভোলাকেও পুলিশ এক সপ্তাহ আগে আটক করেছিল। কিন্তু তাকে গ্রেফতার দেখানো হয় এক সপ্তাহ পর সোমবার সকালে। মনির নামে এক সহযোগীসহ গ্রেফতারের পর তাকে জেলে পাঠানো হয়। মিতু হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এরা হচ্ছে এহতেশামুল হক ভোলা, মোতালেব ওরফে ওয়াসিম, আনোয়ার হোসেন, আবু নছর গুন্নু ও শাহজামান ওরফে রবিন। এর মধ্যে গুন্নু ও রবিনকে ৫ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তারা যে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে গ্রেফতার অপর দুই আসামি ওয়াসিম ও আনোয়ার রোববার আদালতে মিতু হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। জবানবন্দিতে ৮ জনের নাম প্রকাশ করেছে তারা। ৮ জনের মধ্যে কিলিং মিশনে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে তারা মুছার নাম বলেছে। মুছা নিজেই মিতুকে হত্যা করলে সাত-আট লাখ টাকা পাওয়া যাবে এমন প্রলোভন দেখিয়ে অন্য খুনিদের ভাড়া করে বলে জানায় ওয়াসিম ও আনোয়ার। দু’জনের মধ্যে মিতুকে গুলি করা নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য এসেছে জবানবন্দিতে। আনোয়ার বলেছে, ওয়াসিম নিজেই গুলি করেছে মিতুকে। এতে তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। অপরদিকে ওয়াসিম বলেছে, সে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করেছে। তার কাছ থেকে পিস্তল কেড়ে নিয়ে মুছাই মিতুকে গুলি করলে তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়। তবে ওয়াসিম আটকের পর পুলিশের কাছে ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে মিতুকে গুলি করার কথা স্বীকার করলেও ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে হত্যার দায় চাপায় মুছার ওপর। নিজে বাঁচার জন্যই ওয়াসিম এমন চতুরতার আশ্রয় নেয় বলে পুলিশ জানায়।

ভোলার কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র পাঠানো হচ্ছে ব্যালাস্টিক পরীক্ষায় : এদিকে মিতু হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র ভোলার কব্জা থেকে উদ্ধারের পর এ দুটি অস্ত্র ও ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা চার রাউন্ড কার্তুজ ব্যালাস্টিক পরীক্ষার জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। বুধবার রাতেই এসব অস্ত্র ও গুলি সিলগালা করে ঢাকায় পাঠানোর কথা। সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্য এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিতু হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামি এহতেশামুল হক ভোলা স্বীকার করে বলেছে, মিতুকে হত্যা করার জন্য অস্ত্র দুটি সে নিজেই কিলিং মিশনের সদস্য ওয়াসিম ও আনোয়ারকে দিয়েছিল। একইভাবে ওয়াসিম ও আনোয়ারও ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ভোলার কাছ থেকে অস্ত্র নেয়ার কথা স্বীকার করে। মিতুকে হত্যার পর সেই অস্ত্র পুনরায় ভোলাকে ফেরত দেয়া হয় বলেও জবানবন্দিতে জানায়। ভোলা অস্ত্রগুলো তার কর্মচারী মনির হোসেনের হেফাজতে রাখে। পুলিশ ভোলাকে গ্রেফতারের পর তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক মনিরের কাছ থেকে সোমবার ভোরে অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে।

সিএমপির সূত্র জানায়, মিতুকে হত্যার ঘটনাস্থল জিইসি মোড় থেকে ৫ জুন পুলিশ সেভেন পয়েন্ট ৬৫ এমএম ক্যালিবারের ২টি কার্তুজ, একই ধরনের অস্ত্রের ৩টি মিস ফায়ার্ড কার্তুজ উদ্ধার করে। এ কার্তুজগুলো ভোলার কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র থেকে বের হয়েছিল কিনা মূলত তা শতভাগ নিশ্চিত করতেই অস্ত্রের ব্যালাস্টিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। কারণ মামলায় এ অস্ত্রের ব্যালাস্টিক রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভোলার সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে গিয়ে ফিরে এসেছে স্বজনরা : পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার এহতেশামুল হক ভোলাকে কারাগারে দেখতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে তার স্বজনরা। বুধবার সকালে ভোলার স্ত্রী পারুল আক্তার তার বোন রাবেয়া বসরি বকুলিসহ স্বজনরা কারাগারে ভোলার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ভোলার পরিবারকে জেল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, ভোলা স্পর্শকাতর মামলায় গ্রেফতার। তাকে অন্য দশ আসামির মতো স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে না দেয়ার ব্যাপারে ওপরের নির্দেশনা রয়েছে। তার সঙ্গে দেখা করতে হলে আদালতের অনুমতি লাগবে। এছাড়া যারা তার সঙ্গে দেখা করবে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও দুই কপি ছবি লাগবে। দেখা করতে না পেরে পরিবারের সদস্যরা দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম কারাগার এলাকা ত্যাগ করে। ভোলাকে কারাগারের বিশেষ সেলে রাখা হয়েছে। তাকে অস্ত্র মামলায় দশ দিনের রিমান্ড আবেদন আদালতে পেন্ডিং রয়েছে।


Advertisement

আরও পড়ুন