পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় মাসে প্রায় ১২ কোটি টাকার চাঁদা আদায় সন্ত্রাসীদের

সোনালী নিউজ প্রতিবেদন ::: রাঙামাটির জনৈক কাঠ ব্যাবসায়ী রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় ১টি সেগুন বাগান ক্রয় করেন। সে ব্যবসায়ী একজন সেনা অফিসারের ভগ্নিপতি সে সুবাদে রাঙামাটি ৩০৫ পতাদিক বিগ্রেডের একজন মেজর এর সাথে কথা বলেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যবসায়ী জানান নানিয়ারচর উপজেলাটি চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্য।

ইউপিডিএফ এলাকায় হওয়াতে তিনি চাঁদা না দেয়ার জন্য সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চান, ব্রিগেডের সেই সেনা কর্মকর্তা নানিয়াচর এলাকাটি মহালছড়ি জোনের অধিনে হওয়াতে ব্যবসায়ীকে মুঠোফোনে মহালছড়ি জোন কমান্ডারের সাথে আলাপ করিয়ে দেন। মহালছড়ি জোন কমান্ডার ব্যবসায়ীকে কয়েক দিন পর স্বশরীরে গিয়ে মহলছড়িতে দেখা করতে বলেন, রাঙামাটির সেই ব্যবসায়ী ৩দিন পর মহালছড়ি জোন কমান্ডরের সাথে দেখা করেন। ব্যবসায়ী আরেক সেনা কর্মকর্তার ভগ্নিপতি হওয়ার সুবাদে তাকে ভাল ভাবে আপ্যায়ন করেন এবং মহালছড়ি জোন কমান্ডার ব্যবসায়ীর কাছে জানতে চান তার ক্রয়কৃত সেগুন বাগানের অবস্থান কোথায়, কয়টি সেনা টহল দল লাগবে ইত্যাদি। সে ব্যবসায়ীর কাছে সব কথা শোনার পর মহালছড়ি জোন কমান্ডার ব্যবসায়ীকে বলেন, দেখুন ভাই, আইনশৃংখলা বাহিনী বা সেনাবাহিনী আপনাকে কত দিন আর পাহারা দিয়ে রাখবেন? দেখা যাবে এই সেগুন বাগানের জন্য আপনাকে ৪লক্ষ টাকা সন্ত্রাসীদের কাছে চাঁদা দিতে হবে, জোন কমান্ডার বলেন, তাতে আপনার জীবনের নিরাপত্তা এবং ব্যবসা দু’টাই ভালভাবে চলবে, কিন্তু আজ সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে সন্ত্রাসীদের চাঁদা না দিয়ে আপনি সেগুন বাগানের কাঠ কেটে নিয়ে যাবেন, দেখা যাবে চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা আপনার বা আপনার পরিবারের সদস্যদের পিছনে লেগে থাকবে সুযোগ পেলে অপহরণ করে ৪লক্ষ টাকার স্থলে ৮-১০ লক্ষ টাকা আপনার কাছ থেকে আদায় করে নিবে এমন কি আপনার জীবণটাও হারাতে হতে পারে। অন্য ১০জনের ন্যায় ব্যবসায়ীরা যে ভাবে সন্ত্রাসীদের টোল বা চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করছেন আপনিও সেভাবে সেগুন কাঠের ব্যবসা করুন। জনৈক ব্যবসায়ী বিনয়ের সাথে মহালছড়ি জোন কমান্ডারের কাছে জানতে চান যে, একজন জোন কমান্ডার হয়ে কেন তিনি এধরনের পরামর্শ দিলেন ? তার প্রতি উত্তরে জোন কমান্ডার ব্যবসায়ীকে বলেন, আমার সেনাবাহিনী যখন চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করবে, সাথে সাথে সন্ত্রাসীরা বা তাদের নেতৃবৃন্দরা বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানার নিয়ে আমার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবে, মিছিল করবে, অবরোধ ডাকবে এবং আমার বিরুদ্ধে সরকারী প্রশাসনের কাছে স্বারকলিপি দেবে। তখন আমার পদোন্নতি আটকে যাবে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক সমস্যা সৃষ্টি হবে, তখন আমার পক্ষে আপনি (ব্যবসায়ী) বা বাঙ্গালীরা রাস্তায় ব্যানার নিয়ে নামবে না কিংবা আমার সেনাবাহিনীর পক্ষে কেউ কথা বলবে না। এই হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের টোল আদায় বা চাঁদাবাজদের আসল চেহারা। (নিরাপত্তার স্বার্থে কাঠ ব্যবসায়ীর নাম ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের নাম গোপন রাখা হয়েছে)।

 
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে চাঁদাবাজদের দৌড়াত্ম্যে অতিষ্ঠ সাধারন মানুষ। একটি পালিত মুরগীর বিক্রয় করার টাকাও বাদ যাচ্ছেনা চাঁদাবাজদের কবল থেকে। এমনই অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় অধিবাসীদের।
একটি অনলাইন পত্রিকার অনুসন্ধানে পার্বত্য অঞ্চলের সর্বশেষ ২৫ জুন ২০১৬ পর্যন্ত অনুসন্ধানের চাঁদাবাজির সংক্ষিপ্ত তথ্য উঠে আসে, টোল বা চাঁদাবাজির হার, সেগুন কাঠ প্রতি হাজারে ৪ শত টাকা, গামারী কাঠ ও লালি কাঠ প্রতি হাজারে ২ শত টাকা, আগরগাছ প্রতি গোড়া ৩-৫ হাজার টাকা,জ্বালানী কাঠ প্রতি বড় গাড়ি ২ হাজার টাকা, মাঝারী গাড়ি ১ হাজার টাকা, ছোট গাড়ি (স্থানীয় ভাষায় চাদের গাড়ি) ৫ শত টাকা, মলি বাঁশ প্রতি হাজার ৪ শত টাকা, বড় বাঁশ প্রতি হাজার ২০ হাজার টাকা, সকল ঠিকাদারী কাজের জন্য প্রতি হাজারে ২ শত টাকা, ছোট বড় সকল দোকান থেকে মাসিক চাঁদার টোকেন বাধ্যতা মুলক, বাহির থেকে এসে পণ্য ক্রয় করা ব্যবসায়ীদের মাসিক চাঁদার টোকেন, সেগুন গাছের প্রতি গাড়ি ১২ শত টাকা এবং ব্যবসায়ী মালিকের চাঁদার টোকেন সরবারহ মাসিক, সকল গাড়ির মাসিক টোকেনও দৈনিক পণ্য গাড়ির জন্য ২ হাজার টাকা, বিভিন্ন সড়কে চলা গাড়ির মাসিক টোকেন ২ হাজার টাকা থেকে ৬হাজার টাকা পর্যন্ত, সিএনজি প্রতি গাড়ির জন্য ৬ শত টাকা, উপজেলা পযায়ের সড়কের প্রতি গাড়ি ৯ শত টাকা মাসিক টোকেন, মার্কেটিং কোম্পানির পণ্য সরবরাহ বাসৎরিক ১৫ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা, পাহাড়িদের বাজারে কাঁচা সবজি বিক্রির হ্মেত্রে মনের চাহিদা অনুযায়ী বা ইচ্ছে মতো, আদা প্রতিমণ ৩০ টাকা, হলুদ প্রতিমণ (শুকানো অবস্থায়) ৬ শত টাকা, কাপ্তাই লেক এর মাছ প্রতিমণ ৫ শত টাকা, কলা প্রতিছড়া ১০ টাকা, মৌসমী ফল বিক্রয়ের প্রতি হাজারে ২ শত টাকা, পশু (মহিষ,গরু,ছাগল, শুকর ইত্যাদি) ক্রর – বিক্রয় ৩-৫ শত টাকা, হাঁস,মুরগী প্রতিটি ২০- ৩০ টাকা, সরকারী চাকুরীজিবিদের প্রতি মাসে ৫শত থেকে ১হাজার টাকা, যে কোন রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের জন্য প্রতি দাওয়াত কার্ড ৫ শত টাকা, মালামাল পরিবহনের জন্য প্রকার বেধে ১- ৫ শত টাকা, ফসলী জমি বা ফলের বাগান লীজ নিলে প্রতি হাজারে ৫০ টাকা, লীজ দিলে মূল টাকার ৫০%, কাঠ চিরাইয়ে স’মিল প্রতিটি মিলের জন্য বছরে ৫ হাজার টাকা,বরফকল বা আইসক্রিম ফ্যাকটরী প্রতি বছর ৫- ১০ হাজার টাকা, বাজারের প্রতিটি দোকানদার ৩-৫ হাজার টাকায় টোকেন নিতে হয়, স্থানীয় ও জাতীয় এনজিও গুলি ৫-১০ লক্ষ টাকা দিতে হয় প্রতি বছর, জায়গা জমি ক্রয় – বিক্রয় প্রতি হাজারে ১ শত থেকে ২ শত টাকা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিটি বিয়ের জন্য গুনতে ৫-১০ হাজার টাকা, ব্যাক্তিগত বাড়ি বা দোকান ঘর নিমাণ ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, লঞ্চ বড় প্রতি বছর ৫০ হাজার, ছোট গুলি ২০- ৩০ হাজার টাকা, ইঞ্জিন বোট ৩- ৫ হাজার টাকা, জেলেদের পাস বা টোকেন প্রতি মৌসমের জন্য ১- ২ হাজার টাকা, জালের জন্য আলাদা টোকেন নিতে হয়, মাছের ট্রলার প্রতি বছর ৮- ১০ হাজার টাকা, মোবাইল কোম্পানির টাওয়ার প্রতিটি এককালিন ১০ লক্ষ টাকা, এছাড়া রাঙামাটি শহরের বনরুপায় বসে আদায় করা হয় বিভিন্ন এলাকার ২৭% হারে চাঁদা। সব মিলিয়ে পার্বত্য তিন জেলায় প্রতিমাসে সন্ত্রাসীরা ১০- ১২ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে সব জেলা ও উপজেলা গুলিতে বন বিভাগের চেক পোষ্ট, পুলিশ চেক পোষ্ট, আনসার চেক পোষ্ট, মৎস্য বিভাগের চেক পোষ্ট,সরকারী ভাবে টোল আদায়ের জন্য বিভিন্ন সড়কের ওপর বাঁশ দিয়ে অকট্টরী রয়েছে, তার দু’য়েকশ গজের ভিতর সন্ত্রাসীদের টোল বা চাঁদা আদায়ের নিদৃষ্ট স্থান।
 
উল্লেখ্য সন্ত্রাসীদের সব চেয়ে বেশী টোল বা চাঁদা আদায়ের স্থান হচ্ছে রাঙামাটি- চট্টগ্রাম সড়কের ঘাগড়া বাজার।
পার্বত্য তিন জেলায় এ তালিকায় রয়েছে চারটি পাহাড়িদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল যাদের ছত্রছায়ায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা টোল বা চাঁদা আদায় করছে । এসব সংগঠন গুলোর পার্বত্য তিন জেলার ২৫টি উপজেলাতে নিয়োগ দেয়া আছে টোল বা চাঁদা আদায়ের জন্য পাহাড়িসহ বেশ কিছু সংখ্যাক বাঙ্গালী, এদের বলা হয় কালেক্টর।
পার্বত্য তিন জেলার স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় আইনশৃংখলা বাহিনীর তৎপরতা থাকা সত্বেও কি ভাবে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল গুলোর ছত্রছায়ায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা টোল বা চাঁদা আদায় করছে ? জনমনে এমনই প্রশ্ন।
 
 
 


শাহাদাৎ আশরাফ শাহাদাৎ আশরাফ

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market