‘বাংলাদেশের জন্য অশুভ সংবাদ’

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। পণ্য রফতানি, রেমিট্যান্স আহরণ ও জনশক্তি রফতানি_ এই তিন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য দুঃসংবাদ বয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। ইইউ থেকে ব্রিটেনের বের হওয়া অন্তত দু’বছর পর কার্যকর হবে, তাই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে এখন থেকেই তৎপর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বাংলাদেশের রফতানির ৬০ শতাংশের বেশি যায় ইইউভুক্ত দেশগুলোতে। ইইউ দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির পরে ব্রিটেনই সবচেয়ে বেশি পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ( জুলাই-মে) ব্রিটেনে ২৭ হাজার কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়েছে। এর বেশির ভাগই তৈরি পোশাক। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইইউতে সব পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। ইইউ থেকে বের হলে ওই সুবিধা থাকবে কি-না তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন রফতানিকারকরা। ব্রিটেনে প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন। ব্রিটেন থেকে বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স আসে বাংলাদেশে। গত অর্থবছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়েছেন ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। গতকাল গণভোটের ফল প্রকাশের পর পাউন্ডের ১০ শতাংশ দরপতন হয়েছে, যা ১৯৮৫ সালের পর সর্বোচ্চ। পাউন্ডের দরপতন অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স কমে যাবে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ইইউ থেকে ব্রিটেনের বিচ্ছেদ সার্বিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য দুঃসংবাদ। বাংলাদেশে স্বল্প মেয়াদেও এর প্রভাব পড়তে পারে। শুক্রবার পাউন্ডের অনেক বড় দরপতন হয়েছে। এতটা দরপতন হয়তো স্থায়ী হবে না। তবে এর কিছুটাও যদি থেকে যায় তাহলে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা আগের চেয়ে কম টাকা পাবেন। রেমিট্যান্স গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হবে। বিনিময় হার কমে যাওয়ার আরেকটি ঝুঁকি রয়েছে। যারা রেমিট্যান্স পাঠান তাদের একটি অংশ এমন মনে করতে পারেন যে, বিনিময় হার আরেকটু বাড়ূক তখন পাঠাবেন। সে ক্ষেত্রে ব্রিটেন থেকে রেমিট্যান্স কমেও যেতে পারে। ব্রিটেনপ্রবাসী, যাদের বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ আছে, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

জাহিদ হোসেন  আরও বলেন, বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কি হবে তা নির্ভর করবে বিশ্ব অর্থনীতি, ইইউ এবং ব্রিটেনের অর্থনীতিকে এ ঘটনা কীভাবে প্রভাবিত করবে তার ওপর। ফলে যদি ইইউর অর্থনীতি আরও দুর্বল হয় তাহলে ইইউতে বাংলাদেশের রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর ব্রিটেনের অর্থনীতি যদি দুর্বল হয় তারও প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রফতানির ওপর। জনশক্তির ওপর প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইইউর বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশিরা ব্রিটেনে অভিবাসন করেন। ব্রিটেন থেকেও অন্য দেশে যান। মানুষের এই যাতায়াতের ওপর কড়াকড়ি আরোপ হবে।

তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পাউন্ডের দরপতন অব্যাহত থাকলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। প্রাথমিকভাবে বিনিময় হার কেন্দ্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কাই বেশি। ইইউতে তৈরি পোশাকসহ সব পণ্যে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। ব্রিটেন ওই সুবিধা বহাল না রাখলে রফতানিকারকদের জন্য তা বড় দুঃসংবাদ হবে। তবে তারা আশাবাদী, ব্রিটেন ইইউ থেকে বের হলেও শুল্কমুক্ত সুবিধা রাখবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্রিটেনের বের হওয়া কার্যকর হবে দু’বছর পরে। এর আগে বাংলাদেশের বাজার সুবিধা নিয়ে কোনো আশঙ্কা নেই। তবে ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ বাজার পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে তার ওপর বাংলাদেশের রফতানি পরিস্থিতি নির্ভর করবে।

বাংলাদেশে ইইউ ডেলিগেশনের সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা জিল্লুল হাই রাজী সমকালকে বলেন, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ অস্ত্র ছাড়া সব কিছুই ইইউতে শুল্কমুক্ত রফতানি করতে পারে। রফতানির ক্ষেত্রে রুলস অব অরিজিনও শিথিল রয়েছে। ব্রিটেন ইইউতে না থাকলে এসব বিষয়ে নতুন করে আলোচনা করতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যের গণভোটের ফলাফল-পরবর্তী অবস্থা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির বিবেচনায় উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, গণভোটের ফল পুরো ইউরোপেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও কূটনীতির জন্ম দিতে পারে। এতে যুক্তরাজ্যের জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনও ঘটতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশের নাগরিকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাজ্যে রয়েছেন তাই তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনও এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, উল্টো দিক থেকে বিবেচনা করলে, ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ায় পূর্ব ইউরোপের নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে কাজ দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও থাকবে না। ফলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের সেখানে কৃষিক্ষেত্রে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটা সম্ভাবনার দিক। তবে নতুন পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের বাজারে পণ্য রফতানিসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন পরিকল্পনার প্রয়োজন হতে পারে, যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন তারা নিশ্চিতভাবেই বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দেবেন। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের বাজারে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে অস্ত্র ছাড়া অন্যান্য পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ নাও থাকতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতি বিশ্লেষক হুমায়ুন কবির বলেন, গণভোটের বড় একটা ইস্যু ছিল অভিবাসন। কট্টরপন্থিরা ইংল্যান্ডে অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের কথা আগেই জানিয়েছিল, যার প্রতিফলন গণভোটেও দেখা গেছে। এর ফলে ইউরোপের অন্যান্য দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের যারা যুক্তরাজ্যে অভিবাসী হওয়ার প্রত্যাশী ছিল তাদের সমস্যায় পড়তে হবে। এমনকি এর প্রভাব যুক্তরাজ্যের ভিসার ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের যে সুবিধা ছিল এখন যুক্তরাজ্যের বাজারে তা থাকবে কি-না, তা নিয়েও চিন্তা-ভাবনার কারণ রয়েছে। কট্টর নীতির দিকে ঝুঁকে পড়লে যুক্তরাজ্যের বাজারে পণ্য রফতানির জন্য বাংলাদেশকে দরকষাকষি করতে হতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের সহায়তাপুষ্ট যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, গণভোটের ফল পুরো বিশ্বকেই ইউরোপ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ, এর ফলে ইউরোপের আরও অনেক দেশে এ ধরনের গণভোট হতে পারে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ইইউয়ের অস্তিত্বই সংকটে পড়তে পারে। একইসঙ্গে ইউরোপে শ্বেতাঙ্গ উগ্র জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটার আশঙ্কা রয়েছে যা ইউরোপের সঙ্গে বাকি বিশ্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের দিক থেকে বিবেচনা করলে দুটি বিষয় রয়েছে। একটি হচ্ছে, এর ফলে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন এবং পণ্যের বাজার নিয়ে নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, নতুন পরিস্থিতিতে ইইউয়ের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার কারণে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার হতে পারে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর। এর ফলে যুক্তরাজ্যের বাজার থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market