উত্তরায় লিফট ছিঁড়ে আগুন, নিহত ৫

রাজধানীর উত্তরার একটি বহুতল বিপণিবিতানের লিফট ছিঁড়ে আগুন লেগে পাঁচজন নিহত ও অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় উত্তরার ট্রপিকানা আলাউদ্দীন টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্সে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঈদের কেনাকাটা করতে ওই বিপণিবিতানে তখন ক্রেতাদের ভিড় ছিল।
পুলিশের উত্তরা অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিন সিন জাপান হাসপাতাল ও হাইকেয়ার হাসপাতাল থেকে রাত একটা পর্যন্ত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন রেজাউল করিম (৩২), কাজী মিজানুর রহমান (৫২), জসিম (৪০), লতা আক্তার (৩০), সালমা আক্তার (৪০)। তবে স্বজনদের না পাওয়ায় তাঁদের কারোরই বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।
এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দগ্ধ অবস্থায় ভর্তি আছেন একই পরিবারের তিনজন। তাঁরা হলেন আবাসন প্রতিষ্ঠান ট্রপিক্যাল হোমসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মাহমুদুল হাসান (৪৬), তাঁর মেয়ে মাইশা (১০) ও ছেলে মুনতাকিন (৮ মাস)। মাহমুদুল হাসান ও মাইশার অবস্থা গুরুতর। তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।
বার্ন ইউনিটের কর্তব্যরত চিকিৎসক মো. নাসিরউদ্দিন বলেন, মাহমুদুল হাসানের শরীরের ৮০ শতাংশ, মাইশার ৫৫ শতাংশ ও মুনতাকিনের শরীরের ২৩ শতাংশ পুড়ে গেছে। মাহমুদুলকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ও তাঁর দুই সন্তানকে হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সের পেছনেই আলাউদ্দীন টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্সের অবস্থান। ১৪ তলা ভবনটির ৬ তলা পর্যন্ত পোশাক, অলংকার, ইলেকট্রনিকস, প্রসাধনীর দোকানপাট। ওপরের তলাগুলোতে বিভিন্ন অফিস। রাতে ওই ভবনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, শপিং কমপ্লেক্সে প্রবেশমুখের দুই পাশে দুটো লিফট। এর মধ্যে বাঁ পাশের লিফটটি ছিঁড়ে নিচে পড়ে গেছে। ভবনের সামনের রাস্তাজুড়ে প্রচুর কাচের গুঁড়া এবং কিছু মানুষের জুতা-স্যান্ডেল, ভবনের ভেতরের দোকান থেকে ছিটকে আসা বিভিন্ন টুকরো জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। ভবনের ভেতরে পুলিশ কাউকে প্রবেশ করতে দেয়নি। বাইরে থেকে দেখা যায়, দোতলা ও তিনতলার এসির বাতাস ঢোকা ও বের হওয়ার পথ বিস্ফোরিত হয়ে ‘ফলস সিলিং’-এর বিভিন্ন অংশ ঝুলে রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেজমেন্ট এলাকা।
আজহারুল ইসলাম নামের একজন ক্রেতা বলেন, তিনি বোন ও এক আত্মীয়সহ তৃতীয় তলায় ঈদের কেনাকাটা করছিলেন। ইফতারের আগে সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে সজোরে একটা পতনের আওয়াজ হয়। মানুষ প্রথমে ভেবেছিল ভূমিকম্প হয়েছে। এরপরই নিচতলা থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করে। ধোঁয়া দেখে বিপণিবিতানের ক্রেতারা হুড়মুড় করে নামতে শুরু করেন। এ সময় মেঝেতে পড়ে গিয়ে পদদলিত হন অনেকে, সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়ও অনেকে পড়ে আহত হন। তাঁরা তিনজন কোনোরকমে বের হয়ে আসেন। এ সময় তাঁর বোন পায়ে চোট পান।
ভবনের নিরাপত্তারক্ষী মো. ফয়সাল বলেন, ঘটনার সময় তিনি বিপণিবিতানের সামনের রাস্তায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। লিফট ছিঁড়ে নিচে পড়ার সময় তিনতলা থেকে ভবনের কাচের দেয়ালও ভেঙে নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে শুরু করে।
আরেক নিরাপত্তারক্ষী খোরশেদ বলেন, ভবনটিতে মোট পাঁচটি লিফট রয়েছে। এর মধ্যে দুটো মার্কেট অংশে ওঠা-নামার জন্য এবং দুটো ওপরের অফিস ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ওঠার জন্য।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের সামনে অগ্নিদগ্ধ মাহমুদুল হাসানের সহকর্মী কামাল উদ্দিন বলেন, ভবনটির বেজমেন্টে ট্রপিক্যাল হোমসের একটি শাখা কার্যালয় রয়েছে। সেখানে আয়োজিত ইফতারে অংশ নিতে দুই সন্তানসহ এসেছিলেন মাহমুদুল হাসান। তাঁরা কার্যালয়ের ভেতরে ছিলেন। ইফতারের আগে ওই ভবনে বিদ্যুৎ ছিল না। জেনারেটরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়। এ সময় লিফট ছিঁড়ে নিচে পড়ে যায় ও বিকট শব্দ হয়। বেজমেন্ট এলাকায় আগুন ধরে গেলে মাহমুদুল হাসান ও তাঁর দুই সন্তান দগ্ধ হন।
মাহমুদুলের বাবা মোজাম্মেল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁদের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে। তাঁরও ইফতারে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর ছেলে দুই নাতনিকে নিয়ে আগেই চলে আসেন। ছেলের বউ মেহবুবা হাসানকে নিয়ে ইফতারের কিছুক্ষণ আগে তিনি রওনা দেন। এসে জানতে পারেন, অগ্নিকাণ্ডে ছেলে ও দুই নাতনি দগ্ধ হয়েছেন। কান্নারত মোজাম্মেল বলেন, ‘ঈদের কেনাকাটা শেষে, দু-এক দিনের মধ্যেই বাড়ি ফেরার কথা ছিল। হঠাৎ আমার কী সর্বনাশ হয়ে গেল।’
ঘটনাস্থলে পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার বিধান ত্রিপুরা সাংবাদিকদের বলেন, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তবে রাত একটা পর্যন্ত পুলিশ নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় জানাতে পারেনি।
দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে উপকমিশনার বলেন, একটা লিফট ছয়তলা থেকে ছিঁড়ে ভূগর্ভস্থ দ্বিতীয় তলায় পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শর্টসার্কিট থেকে আগুন ধরে যায়। ভবনটির কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল। আগুন ধরার পরে ওই কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাতেও বিস্ফোরণ ঘটে। পাঁচতলা পর্যন্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের বাতাস ঢোকা ও বের হওয়ার পথটিও বিস্ফোরণে ভেঙেচুরে গেছে। তিনি বলেন, ইফতারের আগ মুহূর্তে হওয়ায় বিপণিবিতান থেকে অনেক লোক বাসায় চলে যান। আরেকটু আগে হলে হতাহতের সংখ্যা বাড়ত।
আগুনের কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহম্মেদ খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বেজমেন্ট মার্কেট কর্তৃপক্ষ নিজেদের মতো করে সংস্কার করেছে। সেখানে বিভিন্ন কার্যালয় তৈরি করেছে, যা ভবনের পরিকল্পনার মধ্যে ধাকার কথা নয়।
বিপণিবিতানের প্রভাতী পার্ল হাউস জুয়েলারির মালিক সুবোধ কর্মকার বলেন, ২০১২ সালেও এখানে আগুন লেগে পাঁচতলা পর্যন্ত ছড়িয়েছিল। এরপরও কর্তৃপক্ষ বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market