আজ রবিবার, ২৭ মে ২০১৮ ইং, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



রহস্য উদঘাটনের দ্বারপ্রান্তে পুলিশ ।। মিতু হত্যা

Published on 24 June 2016 | 4: 12 am

পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার রহস্য উদঘাটন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইতোমধ্যে কিলিংয়ের কারণ, পরিকল্পনার স্থান, খুনিদের আগমন ও শেষ গন্তব্যস্থলসহ বেশ কিছু তথ্য পুলিশের হাতে এসেছে। হাতে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্যও। কিলিং মিশনে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অংশ নেয়া অন্তত ছয় জন পুলিশী হেফাজতে রয়েছে বলে একটি সূত্র জানালেও এ ব্যাপারে পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউই মুখ খুলতে নারাজ। গতকাল সিএমপির অন্তঃত তিন জন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আর একটু সময় চাই। কারণ কিলিংয়ে অংশ নেয়াদের ভাড়া করা হয়েছিল। আমরা শেকড় পর্যন্ত যেতে চাইছি। আবার সিএমপির উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা হত্যার মূল কারণ জনসম্মুখে আনা হবে কিনা তা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সিএমপি কমিশনার মো: ইকবাল বাহার মিতু হত্যা তদন্ত কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে মৃদু হেসে তিনি বলেন, সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে। আপনাদের একটা ভালো খবর দিতে চাইছি। আর একটু ধৈর্য ধরেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৫ জুন মাহমুদা খানম মিতু হত্যার কারণ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রত্যেকেই এটি জঙ্গিদের কাজ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বাবুল আক্তারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনিও সে দিকটিকে চিহ্নিত করেছিলেন। পরবর্তীতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি জামায়াত শিবির অধ্যুষিত শোলকবহর এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়ার কারণে সে সন্দেহ আরো গাঢ় হয়। পাশাপাশি দৃষ্টি যায় জামায়াত শিবিরের দিকে। কারণ বাবুল আক্তার আমানবাজারে জেএমবি কমান্ডার ফারদিনের যে আস্তানার খোঁজ পেয়েছিলেন সেখানে আটক তিনজনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র ও শিবির কর্মী ছিল। তাছাড়া এর আগে কারাবন্দি জেএমবি সদস্য ফুয়াদ ওরফে মো. বুলবুলের লেখা একটি চিরকুট অভিযান টিমের হাতে পড়ে। ফাঁস হওয়া ঐ চিরকুটে দেখা যায় বাবুল আক্তারসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে হত্যার পরিকল্পনা জঙ্গিদের আছে। বাবুল আক্তারকে না পেয়ে প্রতিশোধ নিতে তার স্ত্রীকে খুন করা হয়েছে কিনা এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত মাসে বুলবুলের লেখা ওই চিরকুটটি ফাঁস হয়েছে। এতে বুলবুলদের উপর কথিত নির্যাতন এবং নিজেকে ‘আইএস’ দাবি করা জেএমবি নেতা জাবেদকে খুনের অভিযোগ এনে পুলিশ সদস্যদের হত্যার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ জন্য ফুয়াদকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করে পিবিআই। পিবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চিঠি লেখার কথা ফুয়াদ স্বীকার করলেও হত্যাকাণ্ডের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে।

এরই মধ্যে গত ১২ জুন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানান, পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার ঘটনাটি জঙ্গিদের কাজ কিনা সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন। তার উপস্থিতিতে সিএমপির ৩৫ জন কর্মকর্তার সমন্বয়ে পাঁচটি কমিটি গঠন করা হয়। অভিযান পরিচালনা কমিটি, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ সংক্রান্ত কমিটি, কেইস ডকেট পর্যালোচনা কমিটি, ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ ও পরিচালনা কমিটি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ কমিটি ও ভিডিও ফুটেজ ও পর্যালোচনা কমিটি তাদের কাজ শুরু করে। তারা হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি সম্পৃক্ততার পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে বাবুল আক্তারের দুর্দমনীয় মনোভাবটাকে মাথায় রেখেছেন।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের চৌকস পুলিশ কর্মকর্তাগণ একের পর এক বৈঠক করে কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে তারা নিশ্চিত হয়েছেন মূল অপরাধী নেপথ্যে থেকে ভাড়াটে কিলার দিয়ে এ কাজটি করেছে। নেপথ্যে পরিকল্পনা করেছেন একজন মাত্র ব্যক্তি।

অভিযান টিমের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছে চারজন। জড়িত ছিল নয়জন। এরই মধ্যে মোটর সাইকেলের সেই তিন আরোহীসহ পাঁচজন পুলিশী হেফাজতে আছে। গতকাল শাকপুরা থেকে একজনকে নিয়ে আসা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে মোটর সাইকেলে চড়ে যে তিন জনকে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে তাদের পাশাপাশি প্রবর্তক মোড়ে পরিস্থিতি নজরদারিতে আরো একজন ছিল। ‘ম’ আদ্যক্ষরের এক ব্যক্তি মোটর সাইকেল চালাচ্ছিল। সে জানতো কাকে খুন করা হবে। শুধু তাই নয় বাবুল আক্তারের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত এক সোর্স হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র সরবরাহ করেছিল বলে জানা যায়। তবে তিনি জানতেন না কাকে হত্যায় এ অস্ত্র ব্যবহৃত হবে।

তদন্ত টীমের কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, মূল পরিকল্পনা হয়েছিল চট্টগ্রামের উত্তরে কোন এক এলাকায়। সুপরিকল্পিত এ হত্যাকাণ্ডের আগে অন্তত ৫ থেকে ৭ বার চেষ্টা চালিয়েছিল খুনিরা। কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি। হত্যাকাণ্ডে দু’টি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। একটি থেকে গুলি বের না হওয়ায় দ্বিতীয়টি থেকে গুলি করা হয়। এদিকে হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে আছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। জঙ্গিডাকাতদের সাথে বন্দুক যুদ্ধ, স্বর্ণ চোরাচালান, ইয়াবা চোরাচালান, পাহাড়তলিতে কেনা জায়গা নাকি অন্যকিছু? এ সম্পর্কে কিছুতেই মুখ খুলছেন না পুলিশ কর্মকর্তারা। শুধু তাই নয়, ‘উপর মহল’ থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে টেলিফোনে কোন প্রকার মন্তব্য করা থেকেও বিরত রয়েছেন প্রত্যেকে।


Advertisement

আরও পড়ুন