আজ সোমবার, ২০ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৫ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



পাপনের মন্তব্যে তোলপাড় ক্রীড়াঙ্গন

Published on 24 June 2016 | 4: 04 am

বাংলাদেশ ক্রিকেট বর্তমান যে অবস্থায় এসেছে, তার জন্য সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু এবার সেই মিডিয়াকেই এক হাত নিলেন স্বয়ং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। প্রিমিয়ার লিগের অনিয়ম ও নানা বিতর্ক নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পাপন। তিনি বলেছেন এদেশের ক্রিকেটে যে অস্থিরতা চলছে তার জন্য এই সংবাদমাধ্যমই দায়ী।

এমনকি আবেগের বাঁধ ভেঙে পাপন বলেন, ‘রোজ রোজ আপনারা কি নিয়ে কথা বলছেন। আমি বুঝি না। আসলে আমি যেটা বুঝলাম, আপনাদের আমার ওপর কোনো ট্রাস্টই নেই।’ এরপর থেকে মূলত দেশের সংবাদমাধ্যম কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। সিনিয়র সাংবাদিক থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত সবাই বিসিবি প্রধানের কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করেননি।

বুধবার শেষ হয়েছে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ (ডিপিএল)। এবারের আসরে বেশ কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে ছিল প্রাইম দোলেশ্বর ও আবাহনীর ম্যাচে মাঠের আম্পায়ারদের সঙ্গে খেলোয়াড়দের অসদাচরণ। বিতর্কিত আম্পায়ারিংয়ের জন্য ম্যাচ বন্ধ থাকা। কোনো একটা নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দিতে বারবার ম্যাচ হয়েছে বিকেএসপির তিন নম্বর মাঠে। শেষ পর্যন্ত সেই দলই হয়েছে এবারের ডিপিএল চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু এসব ঘটনা চোখ এড়িয়ে যায়নি সাংবাদিকদের। নিয়মিত সংবাদমাধ্যমে এসব বিষয় নিয়ে সোচ্চার থেকেছে। যা মোটেও ভালোভাবে নেননি বিসিবি প্রধান।

যে কারণে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের ক্রিকেটের অস্থিরতার জন্য সংবাদমাধ্যমকে দায়ী করেন স্বয়ং বিসিবি সভাপতি পাপন। বিসিবি বসের এমন বেফাঁস কথাবার্তাকে কোনো ভাবেই সমর্থন দিচ্ছেন না এদেশের সংবাদকর্মীরা।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সভাপতি ও কালের কণ্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা মামুনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বললেন, ‘এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। যখন কোনো কিছু আপনার বিপক্ষে যাবে, তখন আপনি এমনটাই বলবেন। তবে একজন বোর্ড প্রধানের কাছ থেকে আমরা এ ধরনের কথাবার্তা কখনই আশা করি না। এটা সত্যিই দুঃখজনক।’

তিনি আরো বলেন, ‘যখন আপনি বারবার একটা দলকে সুবিধা দিচ্ছেন, প্রতিনিয়তই বিকেএসপিতে দলটির খেলা হচ্ছে, আম্পায়ার একই। তখন তো প্রশ্ন থেকেই যায়। আসলে কি হচ্ছে? আর এসব ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই সব মিডিয়ায় এসেছে।’

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের গত রোববারের সভায় অনুমোদন পায় দ্বি-স্তর নির্বাচক ব্যবস্থা। যা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আছে বলে জানা নেই মোস্তফা মামুনের। এছাড়া নির্বাচক প্যানেলে ম্যানেজারকে রাখা হাস্যকরও বলছেন তিনি।

এ ব্যাপারে পরিবর্তন ডটকমকে মামুন বলেন, ‘আমাদের ক্রিকেট কিন্তু ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে ভালো অবস্থায় রয়েছে। সিনিয়রদের পাশাপাশি তরুণ খেলোয়াড়রাও ভালো খেলছে। আর এসব ক্রিকেটারদেরকে কিন্তু আমাদের নির্বাচকরাই দলে জায়গা করে দিয়েছিলেন। তবে সমস্যা কোথায়? কেন হঠাৎ করেই নির্বাচক প্যানেলকে পরিবর্তন করতে হচ্ছে? আবার এই প্যানেলে যুক্ত হয়েছে ম্যানেজার। যা সত্যিই হাস্যকর।’

দেশের ক্রিকেট উন্নয়নে সংবাদমাধ্যম কোনো কিছুই বাড়িয়ে বলে না। সেটাই কিন্তু দেখা গেছে এবারও। প্রিমিয়ার লিগে সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সব মিডিয়ায় কিন্তু একই রকমভাবে এসেছে। তবে কেন এমন বেফাঁস কথা বললেন পাপন?

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে স্যাটেলাইট চ্যানেল দীপ্ত টিভির ক্রীড়া সম্পাদক অঘোর মন্ডল বলেন, ‘গণমাধ্যম সম্পর্কে ধারণা থাকলে তিনি এ ধরনের আচরণ করতেন না। কোনো ঘটনাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়াই গণমাধ্যমের কাজ। আর সেটা কে কোন ভাবে নেয়, তা সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, তার জন্য গণমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে। কে কি বলল তাতে কিছু আসে-যায় না।’

এবারের প্রিমিয়ার লিগে আবাহনী-দোলেশ্বর ম্যাচ নিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল তার জন্য বুধবার বিসিবি দুই ক্রিকেটারকে শাস্তি দিয়েছে। যেখানে তামিম ইকবালকে ১ ম্যাচ নিষিদ্ধসহ ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। আর দোলেশ্বর অলরাউন্ডার নাসির হোসেনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

তবে ব্যাপারটা ম্যাচের দিনই হলে ভালো হতো বলে মনে করেন অঘোর মন্ডল। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘যিনি অপরাধ করেছেন তাকে ঘটনার পরপর শাস্তিটা দিলে ভালো হতো। লিগ শেষ করে শাস্তি দিলে শেষ পর্যন্ত কোনো লাভ হয় না।’

ওই ম্যাচ নিয়ে সিনিয়র এই ক্রীড়া সাংবাদিক বলেন, ‘যারা একটা ম্যাচ শেষ করতে পারে না। তাদের কী দরকার? আমার কাছে মনে হয়েছে সিসিডিএমকে বিলুপ্ত করার সময় এসেছে এখন।’

বাংলাদেশ ক্রিকেটে এমন ঘটনা নতুন নয়। বেশ কয়েকবারই লিগে এমনটা দেখেছেন সবাই। আর এই ঘটনার জন্য অঘোর মন্ডল বলেন, ‘দেখেন একজন বোর্ড প্রধান যদি সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পালন করেন, তবে এমনটা হবার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এটা থেকে আমাদের বের হবার এখনই উপযুক্ত সময়।’

বাংলাদেশের ক্রিকেটে নাজমুল হাসান দুই মেয়াদে রয়েছেন বোর্ড সভাপতির দায়িত্বে। তার মুখ থেকে সংবাদ মাধ্যম নিয়ে এবারই প্রথম এমন কথা শুনেছেন গনমাধ্যমকর্মীরা। এমনটাই জানালেন এনটিভির সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার বর্ষণ কবির।

তিনি বলেন, ‘এটা না বললেই ভালো করতেন তিনি। হয়ত আবেগের বশে এমন কথা বলেছেন। আমাদের সঙ্গে তিনি কিন্তু এর আগে এমন আচরণ করেননি।’

এদিকে সিনিয়র সাংবাদিক আজাদ মজুমদার এ ব্যাপারে বলেন, ‘সত্যিই আমি এ ধরনের কথা-বার্তায় খুবই খুশি হয়েছি। যখন কোনো অথরিটি সাংবাদিকদের দায়ী করেন, তখন তাদের কাছ থেকে আমরা অনেকটা শেখার সুযোগ পাই। পরবর্তীতে আমাদের চিন্তায় থাকে কিভাবে আরো ভালো কাজ করব। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এটাই বলব, তিনি যেসব যুক্তি দিয়েছেন, তা কেউ মানবে না।’

এটা বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন নয়। এবারের লিগে যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তা সব সংবাদমাধ্যম সমালোচনা করেছে। কিন্তু বিসিবি বস মিডিয়াকে নিয়ে যা বলেছেন, তা মোটেও ভালো বলে মনে করেননি দৈনিক কালের কণ্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ পারভেজ।

তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটে অধিনায়করা কিন্তু মাঠে থেকেই ভালো-মন্দ সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পাপন সাহেব বলেছেন, অধিনায়করা সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায়। এটা আসলেই হাস্যকর।’ তিনি আরো বলেন, ‘এবারের দ্বি-স্তর নির্বাচক প্যানেলে রাখা হয়েছে ম্যানেজারকে। কিন্তু এটা না রেখে অন্যভাবে কোচকে দিয়েও ভালোমতো হ্যান্ডেল করা যেতে পারত।’

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড প্রধান বুধবার সংবাদ মাধ্যমকে যে কথা বলেছেন তা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না মাছরাঙা টেলিভিশনের ক্রীড়া সম্পাদক রাকিবুল হাসান। কথা হয় তার সঙ্গে। বললেন, ‘উনি যেটা বলেছেন সেটা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত। এ বছর প্রিমিয়ার লিগে যে সব ঘটনা ঘটেছে, তা সব মিডিয়ায় একই কথা বলেছে। হয়ত অনেকটা আবেগপ্রবণ হয়েই তিনি এমনটা বলেছেন। তবে এ ধরনের আচরণ তার কাছ থেকে আমরা কেউ আশা করি না।’

বাংলাদেশ ক্রিকেটে বর্তমানে যে অস্থিরতা চলছে তা হয়ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার জন্য করা হচ্ছে। এমনটাই মনে করছেন দেশের বিখ্যাত সব সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিকরা। আবার তারাই বলছেন এর থেকে খুব দ্রুত বের হয়ে আসবে আমাদের ক্রিকেট। সব কিছু ভুলে আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবেন সবাই।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন