আজ রবিবার, ২৭ মে ২০১৮ ইং, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ভোগ্যপণ্যে কারসাজির হোতা সিটি ও মেঘনা গ্রুপ

Published on 24 June 2016 | 3: 56 am

তেল, আটা ও চিনিসহ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের কোটি কোটি মানুষ। ভোক্তাকে পুঁজি করে একই জিম্মি নাটক করছে অপর বৃহৎ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ। চিনি, ভোজ্যতেল, সরিষা তেল, আটা, ময়দা, ডাল, লবণ, বোতলজাত খাবার পানি ও শিশুখাদ্যসহ এ দুটি কোম্পানির বেশ কিছু ভোগ্যপণ্যে ভোক্তাকে প্রতিনিয়ত বাড়তি পয়সা গুনতে হচ্ছে।  প্যাকেট ও বোতলজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ার সুযোগে সরবরাহকারী এ দুটি প্রতিষ্ঠান রীতিমতো অনৈতিক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। সিন্ডিকেট করে তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। বেশি মুনাফা করার জন্য ইচ্ছেমতো সরবরাহ লাইনের লাগাম টেনে রাখে। অবস্থাদৃষ্টে এদের কাছে সরকারও জিম্মি। এর ফলে ভুক্তভোগী ক্রেতাসাধারণ ছাড়াও অনেক সময় পরিবেশক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদেরও বিপাকে পড়তে হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান কথা বলতে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সরি, আমি এ মুহূর্তে এসব বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী নই।’
জানা গেছে, দেশে প্রতিবছর ১৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। দৈনিক চাহিদা ৪ হাজার ১০৫ টন। এর মধ্যে ২০ শতাংশ প্যাকিং তেল। বাকি ৮০ শতাংশই লুজ তেল। পরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেক চাহিদা পূরণ করে সিটি ও মেঘনা গ্র“প। তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে উঠানামা করে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পড়লে দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়ার কথা। কিন্তু খোদ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম কমেছে ৩৭ শতাংশ। আর পাম অয়েলের দাম কমেছে ১৭ শতাংশ। অপরদিকে সরকারের বাণিজ্যিক সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ বাজারে খোলা সয়াবিনের দাম কমেছে ১৭ শতাংশ, আর বোতলজাত সয়াবিনের দাম কমেছে ৭ শতাংশের কাছাকাছি। এছাড়া পাম অয়েলের দামও ৭ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ যে হারে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমেছে সে হারে কমেনি দেশের বাজারে।
এদিকে চলতি বছর মার্চে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের হস্তক্ষেপে অন্যান্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সিটি ও মেঘনা গ্রুপ প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে ৫ টাকা দাম কমাতে রাজি হয়। সেই হ্রাসকৃত হারও যৌক্তিক ছিল না। এরপরও বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে দেয়া এই প্রতিশ্র“তির বাস্তবায়ন হতে সময় লেগে যায় প্রায় দেড় মাস। এর দাম কার্যকর হওয়ার পথে, তখনই আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাত তুলে উৎপাদক ব্যবসায়ীরা সেই হ্রাসকৃত দামও আগের চড়া দরে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন। যেখানে বৃহৎ সরবরাহকারী হিসেবে এর নৈতিক দায়ভার পড়ে সিটি ও মেঘনা গ্রুপের ওপরই।
এছাড়া বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রতি লিটার সরিষার তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ থেকে ২৩০ টাকায়। সিটি গ্রুপের তীর ব্র্যান্ডের সরিষার তেল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। যদিও বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে প্রতি লিটার সরিষার তেল উৎপাদনে খরচ হয় ৯৭ টাকা। সে হিসাবে পণ্যটি থেকে সর্বোচ্চ ১৩৭ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা করছে তারা।
একইভাবে দেশে বছরে ১৫ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। প্রতিদিন চিনির চাহিদা ৪ হাজার ১০৫ টন। অথচ দেশের উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা রয়েছে ৭ থেকে ৮ হাজার টন। এখানে সিটি গ্রুপ এককভাবেই ৩ হাজার টন চিনি সরবরাহ দেয়ার সক্ষমতা রাখে। এর কাছাকাছি সক্ষমতা রাখে মেঘনা গ্রুপও। আরও কয়েকটি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান চিনির উৎপাদন, পরিশোধন ও আমদানি করে। কিন্তু রমজানকে সামনে রেখে দুটি গ্রুপ তাদের সরবরাহের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে বলে দাবি করেছেন পরিবেশক ও পাইকাররা। যে কারণে ডিও অনুযায়ী চিনির সরবরাহ মিলছে না কারোই। এ কারণেই চিনির বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীর্ষ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান দুটির এ অনৈতিক তৎপরতার লাগাম টেনে ধরতে সরকারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। বেশি দামে চিনি বিক্রির অজুহাতে মীর গ্রুপকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অথচ সিটি গ্রুপ মিল গেটে বাড়তি দামে চিনি বিক্রি এবং সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি সত্ত্বেও এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কোনো উদ্যোগ নেই।
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে আরও বলেছেন, দেশে গুটিকয়েক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য সারা দেশে সরবরাহ দিতে আগে ডিও প্রথা চালু ছিল। এই ডিও সিস্টেমে সহজেই একজনের পণ্য আরেকজনের হাতে হাতবদল হয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যেত। তখন পরিবেশক, পাইকার কিংবা অন্য ব্যবসায়ীদের আর মিল গেট মুখাপেক্ষী থাকতে হতো না। কিন্তু তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের সময় মূলত সিটি গ্রুপের চক্রান্তেই এ প্রথা বাতিল করা হয়। সে সময় এর পরিবর্তে পরিবেশকদের মাধ্যমে পণ্য ডেলিভারি দেয়ার সিদ্ধান্ত হলেও দীর্ঘ ৬ বছরেও এ পরিবেশক প্রথা সর্বত্র কার্যকর হচ্ছে না। সিটি গ্রুপও এ পরিবেশক প্রথাকে উৎসাহিত করছে না। নিয়ম মাফিক স্ট্যাম্পে চুক্তি এবং উভয়পক্ষের স্বাক্ষরের মাধ্যমে পরিবেশক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সাদা কাগজে চুক্তির মাধ্যমে তারা পরিবেশক নিয়োগ করেছে। এ কারণে পরিবেশক ডিও নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াও পাইকারদের ডিও নিষ্পত্তি এবং চাহিদা অনুযায়ী মাল সরবরাহ না দেয়ার অহরহ নজির রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজারও অস্থির হয়ে উঠছে।
এ প্রসঙ্গে দেশে ভোগ্যপণ্য উৎপাদক শীর্ষস্থানীয় একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, বাংলাদেশে চিনি মিলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সিটি গ্র“পের মিল। তারাই চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমরা এ প্রতিষ্ঠানের দেখানো পথেই হাঁটি।
এ প্রসঙ্গে ভলেন্টারি কনজ্যুমার ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস সোসাইটির (ভোক্তা) নির্বাহী পরিচালক খলিলুর রহমান সজল বলেন, দেশে মাত্র চার-পাঁচজন ভোগ্যপণ্যের উৎপাদক রয়েছেন। এরা মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। এ বাজারে প্রতিযোগিতা নেই। যদি দেশে প্রতিযোগিতা আইন বলবত থাকত তাহলে এভাবে বাজারে কোম্পানিগুলো কাজ করতে পারত না। কিন্তু সরকারের সেই রকম হাতিয়ার নেই। টিসিবি সক্ষম নয়। তিনি সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থার জন্য দ্রুত প্রতিযোগিতা আইন কার্যকর করার পরামর্শ রাখেন। তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা না থাকার কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে আমাদের বাজারে আনুপাতিক হারে কমে না। কিন্তু বাড়ার বেলায় বাড়ে। এটা হওয়ার কারণ যারা আমদানি করেন তারা সিন্ডিকেট তৈরি করে রাখেন।
বাংলাদেশ ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মৌলভী বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মো. গোলাম মাওলা এ প্রসঙ্গে বলেন, পণ্যের দামের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর। সরবরাহ ঠিক থাকলে এবং পরিবেশক ও পাইকাররা সময়মতো ডেলিভারি পেলে বাজারে পণ্যের অস্থিরতা কমে আসবে।


Advertisement

আরও পড়ুন