আজ রবিবার, ২৭ মে ২০১৮ ইং, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



৯ দিনের ছুটির ফাঁদ – চট্টগ্রাম বন্দরে ভয়াবহ অচলাবস্থা সৃষ্টির আশংকা

Published on 24 June 2016 | 3: 52 am

ঈদের টানা ৯ দিনের ছুটিতে পণ্য আমদানি ও রফতানিতে ভয়াবহ অচলাবস্থা সৃষ্টির আশংকা করা হচ্ছে। এতে করে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। লম্বা ছুটি শেষে যে কনটেইনার জট সৃষ্টি হবে তা স্বাভাবিক করতে কমপক্ষে দু’মাস লেগে যাবে। এর ফলে একদিকে তাদের আমদানি করা পণ্য বন্দরে পড়ে থাকলে গুনতে হবে বিপুল অংকের ড্যামারেজ, অন্যদিকে যথাসময়ে পণ্যের সরবরাহ না হওয়ায় মিল-কারখানায় উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হবে। রফতানি পোশাক শিল্পেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যথাসময়ে পণ্য ডেলিভারি দিতে না পারলে অর্ডার বাতিল হয়ে যাবে। বাতিল হবে শিপমেন্ট। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম চেম্বার, বিজিএমইএ, আমদানি-রফতানিকারকসহ সংশ্লিষ্টরা টানা ৯ দিনের ছুটিতে বিশেষ ব্যবস্থায় আমদানি-রফতানি কার্যক্রম সচল রাখার জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছেন। সংকট নিরসনে তারা চান, ছুটি চলাকালে আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস এবং ব্যাংক খোলা রাখতে হবে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অনেকে যুগান্তরকে বলেন, এমনিতেই চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটার জাহাজ মালিক ও শ্রমিকদের টানা ১৫ দিনের ধর্মঘট এবং সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর কারণে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সৃষ্ট জাহাজ ও কনটেইনার জটের ধকল সামলে উঠতে পারেনি বন্দর। উপরন্তু ঈদের ছুটিতেও বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে এই জট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বৃহস্পতিবার বলেছেন, সাধারণত ঈদের ছুটিতে পণ্য ডেলিভারি বন্ধ থাকলেও বন্দর অভ্যন্তরে ও বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য বা কনটেইনার উঠানো-নামানো বন্ধ থাকে না। ঈদে টানা ৯ দিনের সরকারি ছুটির ফাঁদে যদি বন্দর-কাস্টমস পড়ে সেক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য। ব্যবসায়ীরাও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। ঈদের ছুটিতেও যাতে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকে সেজন্য তিনি বন্দর ও কাস্টমসে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রয়োজনে আলাদা ডেস্ক খুলে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালু রাখার দাবি জানান। তিনি বলেন, যেহেতু বিশ্বের অন্যান্য দেশের ছুটির সঙ্গে বাংলাদেশের ছুটি মিলবে না সে কারণে টানা ৯ দিন বন্দর কাস্টমসে কার্যক্রম বন্ধ থাকলে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু বলেন, ঈদে সরকারের পক্ষ থেকে লম্বা ছুটি দেয়ার জন্য সরকারকে সাধুবাদ। কিন্তু জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বন্দর-কাস্টমস যাতে এই ছুটির ফাঁদে না পড়ে সে বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে। তিনি বলেন, কাস্টমস কমিশনার হোসেন আহমেদ বৃহস্পতিবার ঢাকা গেছেন। হয়তো ৯ দিনের ছুটির মধ্যে কীভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় কাস্টমস চালু রাখা যায় সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দেশনা নিয়ে আসবেন। তবে এ নির্দেশনা পেতে রোববার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি ও গার্মেন্ট ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আগে কখনও এভাবে ঘোষণা দিয়ে একসঙ্গে টানা ৯ দিন বন্ধের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ট্রেডিশনালি ঈদ বা অন্যান্য বন্ধেও বিশেষ করে রফতানি কার্যক্রম সচল থাকত। কিন্তু এবার টানা ৯ দিন বন্ধের ঘোষণায় পোশাক রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। রফতানি পোশাক খাত যাতে বন্ধের ফাঁদে না পড়ে সেজন্য বন্দর কাস্টমস ও এ সংক্রান্ত ব্যাংকিং খাত বিশেষ ব্যবস্থায় চালু রাখার দাবি জানান তিনি। নাসির উদ্দিন বলেন, রফতানির উদ্দেশে প্রতিদিন গড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মিলিয়ে ৫০০ ট্রাক তৈরি পোশাক চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। ফলে ৯ দিনের টানা ছুটির মধ্যে পোশাক রফতানি বন্ধ থাকলে গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অর্ডার ও শিপমেন্ট বাতিল হলে আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হবে বিদেশে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, দেশের মোট আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ৯৬ শতাংশ সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। এই বন্দরে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার কনটেইনার জাহাজে ওঠানো ও নামানো হয়। একইভাবে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ৩ হাজার ২০০ থেকে সাড়ে তিন হাজার কনটেইনার ডেলিভারি হয়। তাই কোনো কারণে এক বা দু’দিন কনটেইনার লোড-আনলোড কিংবা ডেলিভারি বন্ধ থাকলে বড় ধরনের কনটেইনার জটের সৃষ্টি হয়। একইসঙ্গে বহির্নোঙরে বাড়তে থাকে পণ্য ও কনটেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যাও। এতে করে জাহাজ জটও দেখা দেয়। জাহাজের গড় অবস্থান সময় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং নির্ধারিত সময়ের বেশিদিন কনটেইনার বন্দরে পড়ে থাকায় আমদানিকারকদের গুনতে হয় বড় অংকের ড্যামারেজ।
সূত্র জানায়, যন্ত্রপাতি ব্যবহারের স্বার্থে ৩০ শতাংশ জায়গা খালি রেখে চট্টগ্রাম বন্দর ইয়ার্ডে পণ্যভর্তি কনটেইনারের ধারণক্ষমতা ২৬ হাজার ৮৫৭ টিইইউস। এই ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে চার দিন আগেও অর্থাৎ গত রোববার পর্যন্ত বন্দরে লোড কনটেইনার ছিল ২৭ হাজার ৪১৩ টিইইউস (টুয়েন্টি ফিট ইক্যুভেলেন্ট ইউনিট কনটেইনার), যা ধারণক্ষমতার চেয়ে ৫৫৬ টিইইউস বেশি। পণ্যভর্তি কনটেইনার ছাড়াও বন্দর ইয়ার্ডে ধারণক্ষমতা ছাড়িয়েছে খালি বা এম্পটি কনটেইনারের সংখ্যাও। বন্দরে সাড়ে ৫ হাজার খালি কনটেইনার রাখার ধারণক্ষমতার বিপরীতে চার দিন আগেও এখানে খালি কনটেইনারের সংখ্যা ছিল ৭ হাজারের বেশি। এই অবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে তীব্র কনটেইনার জট দেখা দিয়েছে। বন্দরে কনটেইনার জটের পাশাপাশি বহির্নোঙরে ও বিভিন্ন জেটিতে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকা জাহাজের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও বিভিন্ন জেটিতে ৪৫ থেকে ৫০টি পণ্যবাহী জাহাজ থাকলেও বৃহস্পতিবার ছিল সর্বোচ্চ ৯০টি জাহাজ। এর মধ্যে ৫৮টিতে চলছে মালামাল লোড আনলোড কাজ। বাকি ৩২টি পণ্য জাহাজ পণ্য লোড-আনলোডের অপেক্ষায় বসে আছে। একসঙ্গে ৯০টি জাহাজ বহির্নোঙরে বা জেটিতে অবস্থান করায় এটিকে এলার্মিং বলেও মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
কনটেইনার জট প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজার এনামুল করিম বৃহস্পতিবার , বৃহস্পতিবার পর্যন্ত খালি ও লোড কনটেইনার মিলিয়ে বন্দরে কনটেইনারের সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ২৯টি। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ধারণক্ষমতা বেড়ে ৪০ হাজার ৬৫৭টি হয়েছে। তার হিসাবে আরও ৭ হাজার ৬২৮টি কনটেইনার রাখা যাবে। ঈদের ছুটিতে তেমন কোনো সমস্যা হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঈদের ছুটিতে বন্দর-কাস্টমসে কার্যক্রম চালু রাখতে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা জানার জন্য বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার হোসেন আহমদ ও চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


Advertisement

আরও পড়ুন