মানুষের কাছে হাত পাতা আর জাহান্নামের আগুন চাওয়া সমান

আকাশ মিয়া (ছদ্মনাম)। রমজানে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছে আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করছেন। কারণ, তিনি ‘নও মুসলিম’। এক পর্যায়ে সাহায্য নিতে আসলেন গাজীপুরের এক সিমেন্ট ব্যবসায়ীর কাছে। দোকানি জানতে চাইলেন, বাড়ি কোথায়। লোকটি জানালো, কুষ্টিয়া। দোকানদার জিজ্ঞেস করলেন, কুষ্টিয়ার কোন উপজেলা? সে বলল, করিমগঞ্জ। ব্যবসায়ী বললেন, ‘আমার বাড়ি তো কুষ্টিয়া’। কুষ্টিয়ায় তো করিমগঞ্জ নামে কোনো উপজেলা নেই। সত্যি করে বলো, তোমার বাড়ি কোথায়? সে বলল, আমার বাড়ি রংপুর। দোকানি তার ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তাকে বড় অংকের আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দিলে লোকটি তাতে নারাজ। সে বলে, ‘এখন যা দিবেন, দিয়ে দেন।’ স্থানীয় জনপ্রতিনিধির (চেয়ারম্যান/মেম্বার) ফোন নাম্বার চাইতেই সে স্বীকার করে নেয় যে- সে নও মুসলিম নয়। তার হাতে থাকা এফিডেভিটের ফটোকপিটিও ভুয়া।

এখন প্রশ্ন হলো, ‘নও মুসলিম হলেই কি সাহায্য চাইতে হবে?’ এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই লোকটির কাছে। নেই আমাদের কাছেও। তার পরও আমরা প্রতিনিয়ত এমন চিত্র দেখি। আমাদের চারপাশে এমন অনেক সাহায্যপ্রার্থীর দেখা মেলে প্রায়ই। সাহায্যপ্রাথীর তালিকায় থাকে, নও মুসলিম, নদী ভাঙনের শিকার, হাসপাতালে কেউ অসুস্থ, লাশ বাড়ি নিতে পারছে না ইত্যকার মিথ্যা বলে মানুষকে প্রভাবিত করে বিচিত্র কৌশলে অর্থ আদায় করে থাকে এসব সাহায্যপ্রার্থী।

রমজান এলে বেড়ে যায় ভিক্ষুক ও সাহায্যপ্রার্থীর সংখ্যা। অধিকাংশই পেশাদার ভিক্ষুক। শবেবরাত কিংবা সাতাশ রমজানের রাতে (শবেকদর) মসজিদে কিংবা গোরস্তানের প্রবেশমুখে দেখা যায়- ভিক্ষুকের দীর্ঘ লাইন। মানুষকে প্রভাবিত করতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয় ধর্মীয় পোষাক। ইসলামের লেবাস কিংবা অনুভূতিকে পূঁজি করে ভিক্ষা করা হয় অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে ভিক্ষা একটি চরম নিন্দনীয় কাজ।

পৃথিবীর ধর্মগুলোর মধ্যে ইসলামই ভিক্ষা কিংবা কারো কাছে হাত পাতার বিষয়ে সবচেয়ে কঠোর অবস্থানে। হজরত সামুরা ইবনে জানদুব (রা.) থেকে বর্ণিত মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ভিক্ষাবৃত্তি হলো ক্ষতস্বরূপ; এর দ্বারা মানুষ মুখমন্ডলকে ক্ষতবিক্ষত করে’। -সুনানে নাসাঈ: ৫/৯৭

ভিক্ষার হাতগুলোকে কর্মীর হাতে পরিণত করা ছিল শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের অন্যতম এক মিশন। এক আনসার সাহাবি ভিক্ষা প্রার্থনা করলে নবী করিম (সা.) লোকটিকে ঘরের কম্বল বিক্রি করে কুড়াল কিনে নিজে হাতল লাগিয়ে দেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসটি বিখ্যাত।

তার পরও ভিক্ষুকের মিছিল থামছে না। ‘নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা’-এই বিশ্বজয়ী স্লোগানটি যেন এসব লোকের কানে যায় না। কারও কাছে সাহায্য চাওয়া যদি একান্ত প্রয়োজনেও হয়, তবু ইসলামে তা অপছন্দনীয়। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বরাবরই হাত পাততে নিরুৎসাহিত করেছেন। হজরত হাকিম ইবনু হিজাম (রা.) থেকে বর্ণিত হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম। -সহিহ বোখারি: ২/১১২;  মুসলিম: ২/৭১৭

অভাবের কারণেও হাত পাতা ইসলামের দৃষ্টিতে অপছন্দের কাজ। কারও দ্বারস্থ না হয়ে কর্মের প্রতি তাকে উৎসাহিত করেছেন মহানবী (সা.)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কারোর নিজ পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে এনে বিক্রি করা কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম। তাকে (প্রার্থীকে) সে কিছু দিক বা না দিক।’-সহিহ বোখারি: ২/৫৩৫

যারা সম্পদ থাকা সত্বেও তারা তাদের সম্পদ বাড়ানোর জন্য অন্যের কাছে হাত পাতেন তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন মহানবী (সা.)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ বৃদ্ধির জন্য কারো কাছে ভিক্ষা চায় সে তো জাহান্নামের আগুন ভিক্ষা চায়। তার ইচ্ছা, সে চাইলে জাহান্নামের আগুন কম ভিক্ষা করতে পারে বেশিও ভিক্ষা করতে পারে। -সুনানে ইবনে মাজা: ১/৫৮৯

কিন্তু যে ব্যক্তি কারও কাছে হাত পাতা থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ় ইচ্ছা করবে ইসলামে তার জন্য শুভ সংবাদ। হজরত সাউবান (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি এই মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে যে, সে অন্যের কাছে হাত পাতবে না; আমি তার জান্নাতের জিম্মাদারী গ্রহণ করবো। -ইবনে মাজা: ১/৫৮৮

লেখক: খতিব, বাইতুশ শফিক মসজিদ, বোর্ড বাজার, গাজীপুর

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market