আজ রবিবার, ২৭ মে ২০১৮ ইং, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



“আর যদি একটি লাশের বিনিময়ে সন্দ্বীপে শান্তি ফিরিয়ে আনে, তবে আমাকে হত্যা করা হোক”

Published on 22 June 2016 | 6: 19 pm

সাহেদ সারওয়ার শামীম

অনেকদিন থেকে মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেই সাথে চারিদিকে কানাঘুষা শুনছি সামনে সন্দ্বীপের দিনগুলো আরো খারাপের দিকে যাবে। যে কোন সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ঝরে যেতে পারে টগবগে কোন যুবকের প্রাণ, কিংবা কোন নিরীহ মানুষের প্রাণ যার সাথে রাজনীতির কোন সম্পর্ক নেই।

এই কয়েক বছরে সন্দ্বীপে আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। আর কত লাশ হলে সন্দ্বীপে শান্তি ফিরে আসবে। আর কত মায়ের বুক খালি হলে, আর কত বোন বিধবা হলে,কত সন্তান এতিম হলে,আর কত বোন তার ভাইকে হারিয়ে হাহাকার করলে শান্তি ফিরে আসবে? আর কত বোন চিৎকার করে কাঁদবে, ” আমার ভাইকে ফিরিয়ে দাও, কে আমাদের সংসার চালাবে?”তেমনি এরকম একটা মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। যুবলীগ নেতা বশিরের বোনের আত্মচিৎকার এখনো কান পাতলে শোনা যাবে।বশিরকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি। আমরা যখন জাতীয় ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিই, তখন বশিরও ছোট বয়সে আমাদের সাথে স্লোগান দিত –
“গুলশান, বনানী ভেঙে করো কলোনি
চেতনার অগ্নিমশাল বাকশাল বাকশাল!!”
সন্ত্রাসীদের কালো হাত ভেঙে দাও, গুড়িয়ে দাও!!”
এই মুজিব আদর্শের সৈনিক হতে গিয়ে মঞ্চের বিকল্প মঞ্চ তৈরী করতে গিয়ে, স্থানীয় নেতাকে রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেন বশিরের বড় ভাই। বশিরদের পরিবারের দায়িত্ব নেয়ার আশ্বাস, দুই একদিন কান্নাকাটি, ফিসফিসানি। অবশেষে সব নীরব। এরপর অনেক বছর পরে যে নেতার জন্য জীবন দিয়েছে বশিরের বড় ভাই, এবার সেই নেতার অনুসারীদের হাতে শিকার হলো বশির। বশির কারো কাছে সন্ত্রাসী হতে পারে, কারো কাছে মাস্তান হতে পারে। তবে সে আমার কাছে ছিল মুজিব আদর্শের এক অকুতোভয় সৈনিক। বশিররা দলের জন্য লড়াই করে, দলের জন্য অস্ত্র ধরে, নেতার জন্য ব্যবহার হয়ে অবশেষে বশিররা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়। কেউ আর খবর রাখে না।

বশিররা কেমন ছিলো? তাদের পরিবার কেমন করে চলছে! আহ! বশির এত বড় মাস্তান ছিল, এত বড় চাঁদাবাজ ছিল যে, সেই বশিরের লাশ দাফনের কাফন কেনার জন্য অন্যের কাছ থেকে টাকা নেয়া লাগে!! বশির আমার জানতে ইচ্ছে করে তুমি কি সেদিন পেটভরে ভাত খেতে পেরেছিলে? কতদিন বশিররা মাছ মাংস খেতে পারে না। বশিররা ভালো জামা কাপড় পরতে পারে না, টাকার অভাবে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসতে পারে না। অথচ বশিররা নাকি মস্ত বড় চাঁদাবাজ ছিল!! বশিরদের বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলেও টাকার অভাবে বশিররা বিয়ে করতে পারে না, অথবা বিয়ে হয় না ঐ ‘মাস্তান’ উপাধিটার জন্য।

অবশেষে যখন বশিরের বিয়ে হলো, তার ফুটফুটে সন্তান হলো, বশির তখন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে লাগলো যে,সে যা পারেনি তার সন্তান তা পারবে। তার সন্তান তার অভাবের দিনগুলো ঘুচিয়ে দিবে একদিন।কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন তাদের পিছু ছাড়েনি।

একদল দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারাল বশির, আর এতিম হয়ে গেলো তার সন্তান। কেউ থাকলো না এই এতিম সন্তানকে দেখার। ভাগ্যিস সেই মূহুর্তে বিশিষ্ট দানবীর, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পপতি, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামীলীগ সহ সভাপতি আকরাম খান দুলাল এই বাচ্চার সারা জীবনের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। এই পরোপকারী মানুষটিকে অনেক ধন্যবাদ।

মাঝে মাঝে নিজের বুকে হাত দিয়ে বলি আমিও মনে হয় বশিরকে বাঁচাতে পারতাম। সন্ধ্যা ৭টা। খবর পেলাম কারা যেন বশিরকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। খবর পাওয়ার সাথে সাথে আকরাম খান দুলাল ভাই সর্বাত্মক চেষ্টা করলেন বশিরকে বাঁচানোর জন্য। সেই মূহুর্তে হোটেল গোল্ডেন স্টারে বৈঠকরত অবস্থায় ছিলেন সন্দ্বীপ উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মাস্টার শাহজাহান বি.এ, উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রাজিবুল আহসান সুমন, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির এবং দলের সহ সভাপতি ফোরকান উদ্দিন আহমেদ।

উপজেলা চেয়ারম্যান মাস্টার শাহজাহান বি.এ. মগধারার সাবেক চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান শাহিনকে নির্দেশ দিলেন, বশির যদি সন্ত্রাসী হয় তাহলে তাকে পুলিশে দেয়া হোক, আর অসুস্থ হলে তাকে যেন হাসপাতালে দেয়া হোক।তবুও তাকে যেন মারা না হয়।

মাননীয় এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা চেষ্টা করলেন পুলিশের মাধ্যমে বশিরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়ার জন্য। রাত ৮ টায় খবর পেলাম সব শেষ। বশিরকে আওয়ামী-যুবলীগের নামধারী সন্ত্রাসীরা মেরে ফেলেছে। কারো কথা তারা তোয়াক্কা করেনি।

ক্ষমা করো বশির। তোমার জন্য কিছু করতে পারলাম না। এই রেশ কাটতে না কাটতে আমার জন্য আরো বড় একটি আঘাত হয়ে আসলো আমার সারিকাইতের ২ নং ওয়ার্ডের একটি টগবগে তরুণের প্রাণহানির ঘটনা। একটি পারিবারিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদল সন্ত্রাসী নির্মমভাবে তাকে প্রহার করে। মৃত্যুর সাথে লড়াই করে সে মৃত্যুর কাছে হার মানলো। হার মানলো ২০ বছরের তরুণ নুরুন্নবি ভূট্টো। এখনও আমি তাকে ভুলতে পারি নি। আমি যখনই সন্দ্বীপে যেতাম ও সারাক্ষণ চেষ্টা করতো আমার সাথে কথা বলার, আমার সাথে মিশে থাকার। ও বলতো, “শামীম ভাই আপনি পারবেন সারিকাইতকে বদলে দিতে।” ও ছিলো আমার একনিষ্ঠ ভক্ত, তার চাল-চলন সবকিছু ছিলো আমাকে ঘিরে। তার স্বপ্ন ছিলো আমি যেন মাদক, সন্ত্রাসমুক্ত সারিকাইত গড়ে তুলি। সরি ভূট্টো। আমি পারিনি তোমাদের আশা পূরণ করতে। তাই বলে কি তুমি অভিমান করে চলে গেলে। নাকি জীবন দিয়ে প্রমাণ করলে “সারিকাইতের মানুষের জন্য সাহেদ সারওয়ার শামীমকে ভীষণ প্রয়োজন ছিলো!”

আমি বুঝি না কেন তারা সবসময় গরিবদের টার্গেট করে রাজনীতির ফায়দা লুটতে চায়? এই পর্যন্ত সন্দ্বীপের যতজন জীবন দিয়েছে কিংবা সন্ত্রাসীদের শিকারে পরিণত হয়েছে তাদের সবাই মধ্যবিত্ত বা গরীব ঘরের সন্তান।

নাদিয়া, হুমায়ু­ন, জাহাঙ্গীর, আলমগির, ফাহালাবি, বশির, ভূট্টো ইউনিয়ন নির্বাচনে যে দুইজন প্রাণ হারালেন কিংবা আগেও যে সকল হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সবগুলোতে আমরা অসহায় মানুষগুলোকে টার্গেট করেছি। সামনে আর কত নাদিয়ারা, বশিররা জীবন দিবে?

আর কত পরিকল্পনা, কত জনের লাশ হলে সন্দ্বীপে শান্তি ফিরে আসবে। সেটা মুজিব আদর্শের হোক, জিয়া আদর্শের হোক বা জামায়াত আদর্শের হোক, যেই আদর্শেরই হোক না, সন্দ্বীপে যেন আর কোন মায়ের কথা বুক খালি না হয়। আর না যেন একটি তাজা প্রাণ আমাদের মাঝ থেকে ঝরে পড়ে যায়।

ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে সন্দ্বীপে আরো লাশ প্রয়োজন। এই হত্যার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। পরস্পরের প্রতি প্রত্যেককে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। কিন্তু আমরা কেউ কখনো বোঝার চেষ্টা করি না যে ক্ষমতা কারো চিরস্থায়ী নয়। এই হানাহানি, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া লাগবে।

আমাদের আরো গভীরে যেতে হবে, আবিষ্কার করতে হবে ঐক্যের কোন গভীরতম ভিত্তি। মানুষের চেতনার গভীরে অনুসন্ধান করতে হবে। খুজে বের করতে হবে কোথায় আমাদের সমস্যা রয়েছে। ব্যালেন্স রাজনীতির জন্য যদি আর একটি লাশের প্রয়োজন হয়, আর যদি একটি লাশের বিনিময়ে সন্দ্বীপে শান্তি ফিরিয়ে আনে, তবে আমাকে হত্যা করা হোক।

সাহেদ সারওয়ার শামীম
সভাপতি
সন্দ্বীপ আবাহনী


Advertisement

আরও পড়ুন