আজ শনিবার, ২৬ মে ২০১৮ ইং, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



জঙ্গি তালিকায় ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা

Published on 21 June 2016 | 7: 21 am

বিএনপি নেতা ও সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানার নাম উঠে এসেছে জেলা ও নগর পুলিশের তৈরি করা পৃথক দুটি ‘জঙ্গি’ তালিকায়।  শাকিলা নিজেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

জেলা পুলিশের তৈরি করা জঙ্গির তালিকায় আছে ৫৩ জন।  এর মধ্যে হামজা ব্রিগেডের আছে ৫ জন।  সেই পাঁচজনের একজন ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা।

সিএমপির তৈরি করা জঙ্গির তালিকায় আছে ৫৯ জন।  এর মধ্যেও ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানার নাম আছে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, জঙ্গি তালিকায় যাদের নাম এসেছে, এদের মধ্যে যারা পলাতক তাদের গ্রেফতারের সর্বাত্মক চেষ্টা আমরা করছি।  যারা জামিনে আছেন তাদের বিষয়ে আমরা কঠোর নজরদারি করছি।

জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডকে অস্ত্র কেনায় এক কোটি ৮ লাখ টাকা দেয়ার অভিযোগে ২০১৫ সালের ১৮ অগাস্ট রাতে ধানমন্ডি থেকে দুই আইনজীবী হাসানুজ্জামান লিটন ও মাহফুজ চৌধুরী বাপনসহ শাকিলাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।  এর মধ্যে লিটন সুপ্রিম কোর্টে ও মাহফুজ চৌধুরী বাপন ঢাকা জজ কোর্টে কর্মরত।

পরে বাঁশখালী ও হাটহাজারী থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দুটি মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।  ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর লিটন ও বাপন এবং চলতি বছরের ৭ জুন শাকিলা জামিনে মুক্ত হন।

তবে গ্রেফতার হলেও লিটন ও বাপনের নাম জঙ্গি তালিকায় নেই বলে নিশ্চিত করেছে সিএমপি ও জেলা পুলিশ সূত্র।

গ্রেফতারের পর আদালতে দুই দফা জবানবন্দিও দিয়েছিলেন ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা।  জবানবন্দিতে শাকিলা জানিয়েছিলেন, ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট কার সেটা না জেনেই তিনি কিছু টাকা জমা দিয়েছিলেন।

তবে তিনি হেফাজত নেতা হারুন বিন ইজাহারের পক্ষে আদালতে মামলা লড়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।

জবানবন্দিতে শাকিলা জানিয়েছিলেন, ২০১৪ সালের ৩০ মে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ঢাকায় চেম্বারে শাকিলার সঙ্গে দু’জন দেখা করেন।  তারা চট্টগ্রাম থেকে গেছেন বলে জানান।  এদের একজন মাসুম এবং আরেকজন ওসমান আমিন।

ওসমান আমিন তার বাসা খুলশী বলে জানায় এবং তার আমদানি-রপ্তানি ও শিপিং ব্যবসা আছে বলে জানায়।  তার উচ্চতা আনুমানিক ৫ ফুট সাত ইঞ্চি।  প্রায় সমউচ্চতার মাসুমের থুতনিতে সামান্য দাঁড়ি আছে।  ওসমান আমিনের দামি গাড়িও আছে।

মাসুম ও ওসমান শাকিলাকে মুফতি হারুন ইজাহারের মামলা, লালখানবাজার বিস্ফোরণের মামলাসহ হেফাজত ইসলামের ৩০০ থেকে ৩৫০ মামলা পরিচালনার প্রস্তাব দেন।  এসময় শাকিলা তাদের কাছে মামলার রেকর্ডপত্র দেখতে চান।  কাগজপত্রে কিছু ত্রুটি দেখে শাকিলা মামলা পরিচালনায় আগ্রহী হন।  শাকিলা তাদের কাছে প্রয়োজনীয় আরও কাগজপত্র চান।  এসময় মাসুম ও ওসমান আমিন শাকিলাকে জানান, তার সঙ্গে ইজাহার সাহেবের (মুফতি ইজাহারুল ইসলাম) পরিবারের লোকজন যোগাযোগ করবেন।  তারা ফি বাবদ এক কোটি ২০ লক্ষ টাকা দেবেন বলে জানান।

ওসমান আমিন ও মাসুম মিলে ২০১৪ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ব্যারিস্টার শাকিলার চেম্বারে গিয়ে প্রথম ধাপে ২৫ লক্ষ টাকা দেন।  ৫-৬ দিন পর এসে আরও ৩০ লক্ষ টাকা দেন।  ১০-১২ দিন পর এসে আরও ৪৫ লক্ষ টাকা দেন।  ২০১৪ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে চেম্বারে গিয়ে আরও ২০ লক্ষ টাকা দেন।

জবানবন্দিতে শাকিলা জানিয়েছিলেন, ২০১৪ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে চুক্তি অনুযায়ী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চে হেফাজতে ইসলামের আসামিদের জামিন শুনানি করতে থাকেন।  কিন্তু জামিন করাতে ব্যর্থ হন।  কিছুতেই জামিন করাতে পারছিলেন না।  অ্যাডভোকেট ডেইজি মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘর্ষের মামলায় হেফাজত ইসলামের কিছু নেতাকর্মীর জামিন করিয়ে নেন।  এসময় মাসুম এসে শাকিলার কাছে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, অ্যাডভোকেট ডেইজি জামিন করিয়ে নিচ্ছেন আর আপনি কিছুই করতে পারছেন না।  মাসুম বিরক্ত হয়ে টাকা ফেরত চান এবং শাকিলাও বিরক্ত হয়ে তা ফেরত দিতে রাজি হন।  মাসুম শাকিলাকে সানজিদা এন্টারপ্রাইজের একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর দেন।

২০১৪ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে শাকিলা ধানমন্ডিতে ডাচ বাংলা ব্যাংকে মাসুমের বর্ণিত অ্যাকাউন্টে ২৫ লক্ষ টাকা জমা দেন।  ডিপোজিট স্লিপে আমার নাম-ঠিকানা ছিল।  পাঁচ-ছয়দিন পর শাকিলার জুনিয়র অ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটনের মাধ্যমে আরও ২৭ লক্ষ টাকা জমা দেয়া হয়।  সেপ্টেম্বরের শুরুতে লিটনকে দিয়ে শাকিলা ডাচ বাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে একবার ১৬ লক্ষ, আরেকবার ১৫ লক্ষ টাকা জমা দেন।  টাকা জমা দেয়ার সময় লিটন শাকিলাকে ফোন করে জানতে চান-ডিপোজিট স্লিপে কার নাম-ঠিকানা দেবেন? শাকিলা লিটনকে তার নাম-ঠিকানা দিতে বলেন।  মানিলন্ডারিং ও ট্যাক্স সংক্রান্ত ঝামেলা এড়াতে শাকিলা এ নির্দেশ দেন।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে শাকিলা ও অ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপন গিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় ২৫ লক্ষ টাকা জমা দেন।  এর ডিপোজিট স্লিপে বাপনের নাম-ঠিকানা ছিল।  ওসমানের দেয়া‍ এক কোটি ২০ লক্ষ টাকা থেকে ১২ লক্ষ টাকা নিজে ফি  ও মামলা পরিচালনার খরচ বাবদ কেটে রেখে বাকি এক কোটি আট লক্ষ টাকা তিনি ফেরত দেন।

সূত্রমতে, জবানবন্দিতে শাকিলা দাবি করেছেন, ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট র‌্যাব-৭ ধানমন্ডির বাসা থেকে শাকিলাকে গ্রেপ্তারের পর তিনি জানতে পারেন, যে সানজিদা এন্টারপ্রাইজের ডাচ বাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে তিনি টাকা জমা দিয়েছেন, সেটার মালিক মনিরুজ্জামান মাসুদ।

প্রসঙ্গত র‌্যাব বারবার দাবি করে আসছে-শহীদ হামজা ব্রিগেডের একটি উইংয়ের কমান্ডার হচ্ছেন মনিরুজ্জামান মাসুদ ওরফে ডন।  এই ডনের অ্যাকাউন্টেই শাকিলাসহ তিন আইনজীবী জঙ্গি অর্থায়ন করেছেন বলে দাবি র‌্যাবের।

তবে জবানবন্দিতে শাকিলা জানিয়েছেন, এই মনিরুজ্জামান মাসুদকে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি দায়ের হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের একটি সংঘর্ষের মামলায় জামিন করিয়েছিলেন শাকিলা।  এই মনিরুজ্জামান যে সানজিদা এন্টারপ্রাইজের মালিক তা তিনি জানতেন না।

সূত্রমতে, জবানবন্দিতে শাকিলা জানান, ওসমান আমিন মামলার কাজে শাকিলার চেম্বারে গিয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের দুর্দশার বিষয়ে সবসময় তার সঙ্গে আলোচনা করতেন।  তিনি ‘ভয়েস অব মাস্টারেফিন’ নামে একটি ওয়েবপেইজের কথা বলেন যেখানে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের বর্ণনা আছে।

শাকিলার জবানবন্দি ছয় পৃষ্ঠায় রেকর্ড করেন বিচারক।  লিটন ও বাপন তিন পৃষ্ঠা করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দিতে লিটন দাবি করেছেন, ২০১৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে শাকিলা তাকে ফোন করে তার বাসার নিচে যেতে বলেন।  তিনি গেলে শাকিলার বাসার কাজের মেয়ে এসে তাকে একবার ১৬ লক্ষ এবং পরবর্তীতে আরেকবার ১৫ লক্ষ টাকা দেয়।  তিনি এই টাকা ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডে ডাচ বাংলা ব্যাংকের শাখায় বর্ণিত অ্যাকাউন্টে জমা দেন।


Advertisement

আরও পড়ুন