৩৩ বিশিষ্টজন জঙ্গি টার্গেটে – গোয়েন্দা প্রতিবেদন

দুই মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন এমপিসহ দেশের ৩৩ বিশিষ্ট নাগরিক জঙ্গি হামলার শিকার হতে পারেন। তাদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি চলাফেরায়ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এসব কথা বলা হয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। সম্প্রতি এ প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। ওই তালিকায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও রয়েছেন শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ব্লগার ও ছাত্রনেতা। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি সংগঠনের নামে তাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টার্গেটে থাকা ব্যক্তিদের বাসা, কর্মস্থল ও চলাচলের পথ জঙ্গিরা নজরদারি করতে পারে। এসব জঙ্গি সাধারণত প্যান্ট, শার্ট, টি-শার্ট পরে থাকে এবং ছোট ব্যাগ বহন করে। হামলাকারীদের বয়স সাধারণত ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। হামলার সময় তারা চাপাতি বা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করলেও তাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা থাকে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বিভিন্ন সময় কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য তৎপরতা চালায়। নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যক্তিকে হুমকি দিয়ে থাকে। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে কাজ করছেন। সন্ত্রাসী ও তাদের মদদদাতাদের ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, দেশ ও দেশের মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত আছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সতর্কতার কারণে বর্তমান সময়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা হামলার শিকার হচ্ছেন। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষের কবি-সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সিনিয়র সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, ব্লগার ও সাবেক বিচারক রয়েছেন।

মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের টার্গেটে থাকা মন্ত্রীদের মধ্যে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ রয়েছেন। এ তালিকায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এবং হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির নাম রয়েছে। শিক্ষাবিদদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এ কে আজাদ চৌধুরী, বর্তমান ভিসি ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর উদ্দিন খান মামুন (মুনতাসীর মামুন), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, অধ্যাপক আরাফাত রহমান ও অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন রয়েছেন। ঢাকার সাবেক চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) বিকাশ কুমার সাহার নামও আছে তালিকায়।

এ ছাড়া সিনিয়র সাংবাদিক আবেদ খান, মনজুরুল আহসান বুলবুল, শ্যামল দত্ত, মুনি্ন সাহা, অঞ্জন রায়, নবনীতা চৌধুরী, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, ৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, রামেন্দু মজুমদার ও সৈয়দ হাসান ইমাম, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের সভাপতি কামাল পাশা, বল্গগার শাহিন রেজা, মাহমুদুল হক মুন্সি বাঁধন, আরিফ জেবতিক, কানিজ আকলিমা সুলতানা, এফএম শাহীন, সঙ্গীতা ইমাম এবং ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসুর নাম রয়েছে ওই তালিকায়।

বিশিষ্ট নাগরিকদের নিরাপত্তায় বেশ কিছু সুপারিশও উঠে এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। তাদের বাসভবন, কর্মস্থলে এবং কর্মস্থল থেকে বের হওয়া ও ফিরে আসার সময়ও তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো অনুষ্ঠানস্থলে অবস্থানকালীন এবং চলাচলের পথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা রাখা দরকার বলে পরামর্শ দেয় গোয়েন্দা সংস্থাটি। এসব বিশিষ্ট ব্যক্তির তালিকা সংশ্লিষ্ট থানায় সংরক্ষণ করে তাদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও সুপারিশ করা হয়।

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ছাড়াও দীর্ঘ মেয়াদে জঙ্গি তৎপরতা রোধে জঙ্গি সংগঠনগুলোর আর্থিক সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল এবং সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয় ওই প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল, উগ্র মৌলবাদী সংগঠন হত্যাকা সহ বিভিন্ন অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকা ব্যাহত করতে এবং দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে স্বার্থ হাসিলের জন্য স্বার্থান্বেষী মহল টার্গেট কিলিং চালাচ্ছে। গুপ্তহত্যা বন্ধ ও দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্কভাবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোসহ জনগণকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য এসেছে ওই প্রতিবেদনে।

হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু  বলেন, যারা ধর্মের নামে উগ্রবাদ বেছে নিয়ে মানুষ হত্যা করছে, তারা স্বাধীনতা, ধর্মীয় শিক্ষা, সন্তানদের লেখাপড়া, সামাজিকতা ও সভ্যতা বোঝে না। তারা ধর্ম ও সভ্যতাবিরোধী। ইসলামের নামে মূলত তারা জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে। মগজ ধোলাইয়ের ফলে তারা জাহান্নামের পথ বেছে নিয়েছে। তারা রোজাও মানে না, ঈদও মানে না। ওদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে ওদের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে।

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market