আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ সন্ধ্যা হলেই স্বর্গীয় আমেজ

নগরীর প্রাচীন মসজিদ সমূহের মধ্যে অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। মুগল আমলে নির্মিত এ মসজিদে রোজা আসলেই দেখা যায় এক স্বর্গীয় পরিবেশ। একসাথে হাজার রোজাদার মুসল্লির মেঝেতে বসে ইফতার করার দৃশ্য নজর কাড়বে যে কারো। ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে এই দৃশ্য দেখা যায় প্রতি সন্ধ্যায়।

প্রতি বছর পবিত্র রমজানে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের মুসল্লিদের জন্য ইফতারের আয়োজন করেন মসজিদের খতিব আওলাদে রাসূল (সা🙂 মাওলানা ছাইয়েদ মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন তাহের জাবেরী আল মাদানি এবং শাহী জামে মসজিদ মুসল্লি পরিষদ। এ আয়োজনে ধনী, গরিব, মিসকিন,পথিকসবাই এক কাতারে বসে ইফতার করেন। সবার উদ্দেশ্য সম্মিলিত ইফতার, সাম্য, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন। ইফতার আয়োজনের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে মসজিদের খতিব মাওলানা ছাইয়েদ মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন তাহের জাবেরী আল মাদানি বলেন, রাসুলে করিম (.) বলেছেন, রোজাদারের জন্য দুটি খুশির সংবাদ রয়েছে। একটি ইফতারের সময়, তখন রোজাদার স্বর্গীয় আনন্দ অনুভব বরে। অপরটি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। কাজেই ইফতারের গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম।

তিনি বলেন, একজন রোজাদারকে ইফতার করালে সেও ্‌ওই রোজাদারের সমান সওয়াব পায়। সাহাবারা রাসুলের শানে আরজ করলেনইয়া রাসুলাল্লাহ (.) আমাদের সবার তো সে সামর্থ নেই। তখন রাসুলাল্লাহ (.) ইরশাদ করলেন, যদি এক গ্লাস পানি অথবা খেজুরের একটি অংশ দ্বারাও ইফতার করায় সে রোজাদারের সমান পুণ্য লাভ করবে। সে উদ্দেশ্যেই আমরা রোজাদারকে ্‌িফতার করানোর জন্য এ ব্যবস্থা চালু করেছি। মসজিদে ইফতার আয়োজন প্রসঙ্গে খতিবের ব্যক্তিগত সচিব মু. হাসান মুরাদ বলেন, প্রথম রমজান থেকে ১৫ রমজান পর্যন্ত এখানে প্রতিদিন দেড় হাজার থেকে ১৬শ’ লোক ইফতার করেন। রোজার শেষের দিকে এ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় দেড় হাজারে। ২০০৮ সালে খতিবের তত্ত্বাবধানে এখানে সম্মিলিতভাবে ইফতারির আয়োজন হয়ে আসছে। মূলত মক্কামদিনা শরীফের আদলে মুসল্লীদের ইফতারি খাওয়ানোর চিন্তা থেকেই তিনি এ আয়োজন করে আসছেন।

ইফতারের অর্থায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তিরাই অর্থের উৎস। সওয়াবের নিয়েতে মানুষজন টাকা পয়সা অথবা বিভিন্ন খাদ্য পণ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। আমাদের নিজস্ব স্টোর রুম রয়েছে, যারা যা আনেন তা এখানে সংরক্ষণ করা হয়। ১২ জন বাবুর্চি ও তাদের সহযোগীরা দুপুরের পর থেকে রান্না করেন। বেতনভুক্ত ১৫ জন কর্মচারী ও খাদেম আসরের পর থেকে ইফতার বণ্টন করেন। ইফতারের সময় যে অসাধারণ সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয় তা কল্পনাতীত। হাসান মুরাদ বলেন, আগে ধারণা ছিল, শুধু গরীবমিসকিনরাই মসজিদে ইফতার করেন। কিন্তু এখন ধারণা পাল্টেছে। প্রচুর পরিমাণ বিত্তবানরাও প্রতিদিন এখানে ইফতার করেত আসেন শুধু সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে ইফতার করতে আসে দেশের নামীদামি বিত্তবান মুসলমান। তারা সাথে করে নিয়ে আসে প্রচুর ইফতার সামগ্রী। রোজাদারদের সাথে ইফতার করে শিল্পপতিরাও আনন্দ পান। আসরের নামাজের পর থেকে রোজাদাররা এখানে আসতে শুরু করে। এখানে ইফতারে অংশ নেন কান্ত পথিক, অবসন্ন দিনমজুর, পরিশ্রান্ত ভিক্ষুক, নিম্নবিত্ত এবং উঁচু তলার মানুষ। স্থানীয় ব্যবসায়ীও বৃহৎ এই জমায়েতে ইফতার করতে পছন্দ করেন।

খাতুনগঞ্জের পাইকারী কাপড় ব্যবসায়ী আওলাদ হোসেন বলেন, এত রোজাদারের সঙ্গে একত্রে ইফতার করে আলাদা তৃপ্তি অনুভব করি। তাই দোকান থেকে অন্যান্য কলিগদের নিয়ে শাহী জামে মসজিদে ইফতারের চেষ্টা করি। দেখা গেছে, ইফতারে ছোলা, ডালের পেয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, জিলাপি, সমুছা, খেজুর এবং একগ্লাস করে শরবত দেয়া হয়ে থাকে রোজাদারদের। এক সময় ইফতারি কিনে পরিবেশন করা হলেও বর্তমানে ১২ জন বাবুর্চি দিয়ে রান্না করা হচ্ছে। এ ছাড়া ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক ইফতার বণ্টনের কাজ করছে নিয়মিত।

এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন বাদে জোহর থেকে মুসল্লিদের উদ্দেশে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়ে থাকে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক আবুল হায়াত মোহাম্মদ তারেক বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্নস্থান থেকে আগত আলেমে দ্বীনরা ধর্মীয় নানা বিষয়ে এখানে আলোচনা করেন। পাকিস্তান আমল থেকে এখানে এ নিয়ম চলে আসছে। তখন থেকেই যারা আলোচনায় অংশ নিতেন এখনো তাদের অনেকেই এ মসজিদে আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনা শেষে হাজারো রোজাদারকে নিয়ে মোনাজাত হয়; সন্ধ্যায় সবাই শরীক হন ইফতারে।

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market