আজ রবিবার, ১৯ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৪ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



অগ্রণী ব্যাংকের ১৫৬ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি

Published on 21 June 2016 | 3: 25 am

ক্ষমতার অপব্যবহার করে ১৫৬ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি করেছেন অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বড় ধরনের দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট এ জালিয়াতি করেন ব্যাংকটির তৎকালীন শাখা মহাব্যবস্থাপক ও বর্তমানে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মিজানুর রহমান খানসহ ৪ কর্মকর্তা। যাদের একজনকে শাস্তির পরিবর্তে উল্টো পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। আর এ ঋণ জালিয়াতির মাশুল দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় পরিচালিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিশেষ পরিদর্শনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
পরিদর্শন পর্যালোচনায় দেখা যায়, জনৈক মাহতাবের তিন প্রতিষ্ঠান মেসার্স বিটিএল, মেসার্স মাহিন টেক্সটাইল ও মেসার্স পিনাকল টেক্সটাইল সুতা বিক্রি করেছে হলমার্ক গ্রুপ, প্যারাগন, নকশি ও অন্যান্য কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে। কিন্তু এসব বিল কেনাবেচার কাগজপত্র ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। এখানে পণ্যের উৎপাদন, লেনদেন ও সরবরাহের কিছুই হয়নি। আর এরকম ভয়াবহ জালিয়াতি করা হয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে। মূলত অগ্রণী ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভুয়া বিল বিক্রি করা হয়। অথচ মাশুল দিতে হয়েছে সোনালী ব্যাংককে। কারণ, পণ্য না পেলেও পাওনাদারদের টাকা গুনতে হয়েছে এ ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা সোনালী ব্যাংকের হিসাব থেকে এসব টাকা কেটে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনা না ঘটলে হলমার্ক কেলেংকারির ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ আরও কম হতো বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, জালিয়াতি করেছে অগ্রণী ব্যাংক, আর মাশুল গুনেছে সোনালী ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে ইস্যু করা বৈদেশিক বিনিময় বাণিজ্য ঋণের অর্পিত ক্ষমতা অনুযায়ী মহাব্যবস্থপক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে রফতানি ঋণপত্রের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের অর্থায়ন না থাকলে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত মূল্যের স্থানীয় বিল ক্রয়ের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে পারস্পরিক যোগসাজশে শাখা কর্মকর্তারা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তিনটির ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১৫৬ কোটি টাকা দিয়ে দেন। এক্ষেত্রে স্থানীয় বিল কিনে শাখার ঋণ পোর্টফোলিওকে ঝুঁকিপূর্ণ করা হয়েছে। এমন মন্তব্য করা হয়েছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে। এর মধ্যে হলমার্ক গ্রুপ, প্যারাগন, নকশি ও অন্যান্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য সরবরাহের বিপরীতে সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখার এলসি ও স্বীকৃতিতে শাখা নির্ধারিত তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে মোট ১০৮ কোটি টাকা মূল্যের ১০৫টি স্থানীয় বিল কেনা হয়। যার মধ্যে ৪২ কোটি টাকা মূল্যের ৪৫টি বিল ইতিমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। অর্থাৎ খেলাপি হয়ে গেছে।
শাখার নথি পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, প্রিন্সিপাল শাখা ও প্রধান কার্যালয় একই ভবনে হওয়ায় কেস টু কেস ভিত্তিতে মঞ্জুরিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সব নথিতেই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমোদন গ্রহণ করা হয়। ওই তিন প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় বিল ক্রয়ের ক্ষেত্রে এমডির অনুমোদন বা প্রধান কার্যালয়ের সম্মতি নেয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠান  তিনটির  হিসাবে মেয়াদোত্তীর্ণ বিল থাকা সত্ত্বেও বারবার তাদের বিল কিনে দায় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিশর্ক দলের পক্ষ থেকে ওই তিন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ক্ষমতার তথ্য অগ্রণী ব্যাংক দিতে পারেনি।
জানা যায়, তিন প্রতিষ্ঠানের দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী সরেজমিন পরিদর্শনে যায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিধি দল। কিন্তু দলটি দুটি প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। পরিদর্শক দলের মন্তব্যে দেখা যায়, অগ্রণী ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতায় জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অংকের অ্যাকমোডেশন বিল সৃষ্টি করে অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যাংকের তহবিল বের করে নিয়েছে জালিয়াত চক্র।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশে বলা হয়েছে, বিপুল অংকের টাকা সরানোর ঘটনায় জড়িত অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান খান, উপ-ব্যবস্থাপক জহরলাল রায়, সহকারী মহাব্যবস্থপক মো. আবদুল আজিজ দেওয়ান ও এসপিও হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি শাস্তি দেয়ার পরিবর্তে মিজানুর রহমান খানকে পদোন্নতি দিয়ে ডিএমডি করা হয়েছে। এতে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে যান। যার প্রমাণ পরে মুন গ্রুপসহ বিভিন্ন গ্রুপকে তিনি একইভাবে কয়েকশ’ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করেন। এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের ডিএমডি মিজানুর রহমান খানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে অগ্রণী ব্যাংকের আরও অন্তত ৪শ’ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য-উপাত্ত পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রোববার অনুসন্ধান টিম এসব তথ্য হাতে পায়। দুদক সূত্র জানায়, ভুয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে শুধু মুন গ্রুপকেই নয় আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেংকারির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকেও ‘বিটিএল’ নামক বেনামি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ৮ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) মিজানুর রহমান মতিঝিল আমিন কোর্ট শাখার ডিজিএম থাকাকালে ওই শাখা থেকে এ ঋণ প্রস্তাব পাঠানো হয়। সোনালী ব্যাংকে ৫০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও তানাকা গ্র“পের বন্ধ প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স মাইটাস স্পিনিং মিলসকে’ ঋণ দেয়া হয়েছে। একই গ্রুপের ‘মারহাবা সিন্থেটিক মিলস লিমিটেড’কে বন্ধকী সম্পত্তি অতি মূল্যায়ন দেখিয়ে ঋণ দেয়ার তথ্যও মিলেছে। ‘সুইস কোয়ালিটি প্যারের বিডি লিমিটেড’ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে ১২০ কোটি টাকা ফেসভ্যালু দেখিয়ে দেয়া হয়েছে ঋণ। খেলাপি হিসেবে পরে এসব আত্মসাৎ হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জনৈক মাহিনের বিরুদ্ধে রয়েছে ব্রিটেনে অবস্থানরত একটি দলের শীর্ষ নেতাকে অর্থায়ন এবং বিভিন্ন দেশে  অর্থ পাচারের অভিযোগ। এসব অনিয়ম ও আত্মসাতের সঙ্গে ডিএমডি মজিবুর রহমান, মিজানুর রহমান, ডিজিএম জওহরলাল রায়, এজিএম ফজলুল হক, অতিরিক্ত সচিব গোকূল চন্দ্র দাসের সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্রে। এছাড়া ডিএমডি মিজানুর রহমানের বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অবৈধ সম্পদের তথ্যও রয়েছে এতে।
অগ্রণী ব্যাংকের ২৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানে ১৫ জুন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৮ জনকে তলব করে দুদক।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন