আজ শনিবার, ২৬ মে ২০১৮ ইং, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



পুলিশি হেফাজতে গুলিতে ফাহিম নিহত, নানা প্রশ্ন

Published on 19 June 2016 | 4: 10 am

হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে গত শুক্রবার বিকেলেই গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিমকে মাদারীপুরের আদালতে নেওয়া হয়েছিল। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তাঁর ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর ১৫ ঘণ্টা পরই গতকাল শনিবার সকালে পুলিশ জানাল, তাঁকে নিয়ে অভিযানের সময় সহযোগীদের গুলিতে এই সন্দেহভাজন জঙ্গির মৃত্যু হয়।
চলতি মাসে এ নিয়ে ছয় সন্দেহভাজন জঙ্গি কথিত বন্দুকযুদ্ধে বা গুলিতে নিহত হলো। তবে সর্বশেষ এই মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকারকর্মী, জঙ্গি-বিষয়ক বিশ্লেষক, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শকেরা জঙ্গি দমনে পুলিশের সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
তাঁরা বলছেন, হত্যার পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করতে ফয়জুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারত। ‘টার্গেট কিলিং’য়ের সঙ্গে জড়িত কোনো হিযবুত সদস্যের ধরা পড়ার ঘটনা এটাই প্রথম। বড় কোনো ঘটনাকে আড়াল করতে তাঁকে ‘হত্যা’ করা হলো কি না, সেটাও দেখার বিষয়।  অনলাইনের পাঠকেরাও বলছেন, জনতা যাঁকে ধরে পুলিশের হাতে দিল, তাঁর কাছে তথ্য সংগ্রহের আগেই ‘মেরে ফেলাটা’ পুলিশের বড় ব্যর্থতা।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, এভাবে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময় এ রকম হত্যার অর্থ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরেই হয়তোবা জঙ্গিদের চর লুকিয়ে আছে বা জঙ্গিবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে এমন কেউ রয়েছেন। যাঁরা চাইছেন না ওই ছেলের কাছ থেকে সব তথ্য বের হয়ে আসুক। কারণ, এ রকম তথ্য বেরিয়ে এলে তাঁদের মুখোশ উন্মোচন হতে পারে।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রের হেফাজতে যখন আসামি থাকে, তখন সকল দায় রাষ্ট্রের। একজন শিক্ষককে হত্যা করতে গিয়ে সে ধরা পড়ল। পরে পুলিশও বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এরপর রিমান্ডে থাকা অবস্থায় কীভাবে এটা হলো, তা সাধারণ বুদ্ধিতে আমাদের মাথায় ধরে না।’
৫ জুন চট্টগ্রামে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম হত্যার পর পুলিশ জঙ্গিদের ধরতে বেশ তৎপর হয়। শুরু হয় জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযান। বেড়ে যায় কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও। চলতি মাসে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়জনের মধ্যে ছয়জনই সন্দেহভাজন জঙ্গি বলে পুলিশ জানিয়েছে। ৬ জুন রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জামাল উদ্দিন, ৭ জুন রাজধানীর কালশীতে তারেক হোসেন মিলু ওরফে ইলিয়াস ও সুলতান মাহমুদ ওরফে রানা, ৭ জুন বগুড়ায় মিজানুর রহমান ওরফে কাউসার গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। পুলিশের দাবি, জামালউদ্দীন গত বছরের ডিসেম্বরে বাগমারার শিয়া মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায়, ইলিয়াস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা, সুলতান মাহমুদ বাগমারা শিয়া মসজিদে গুলির ঘটনা এবং মিজানুর গত বছরের নভেম্বরে বগুড়ার শিয়া মসজিদে হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া ৮ জুন গাইবান্ধায় একইভাবে নিহত জেএমবি সদস্যের পরিচয় জানা যায়নি।
এর আগে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে প্রিজন ভ্যান থেকে জেএমবির মজলিসে শুরা সদস্য সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহীন (৩৮), হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব হাসান (৩৫) ও জাহিদুল ইসলাম ওরফে মিজান ওরফে বোমা মিজানকে (৩৫) ছিনিয়ে নিয়ে যায় সহযোগীরা। পালানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন অন্যতম জঙ্গিনেতা হাফেজ মাহমুদ। ধরা পড়ার ১৪ ঘণ্টা পরেই পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন তিনি। এ ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া দুই জঙ্গির আর কোনো খোঁজ মেলেনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সর্বশেষ মাদারীপুরে ফয়জুল্লাহর মৃত্যুর পর তথ্য পাওয়ার একটি পথ বন্ধ হয়ে গেল।
মাদারীপুরের পুলিশ সুপার সারওয়ার হোসেন বলেন, গতকাল সকাল সাতটার দিকে ২০ সদস্যের পুলিশ দল ফয়জুল্লাহকে নিয়ে সদর থানার মিয়ারচর এলাকায় অভিযানে যায়। সেখানে আগে থেকে অবস্থান করা ফয়জুল্লাহর সহযোগীরা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি ছোড়ে। পুলিশের গাড়িতে গুলি লাগে, এক পুলিশ সদস্যও আহত হন। এ সময় ফয়জুল্লাহ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
কাল সকালে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ট্রলির ওপর ফেলে রাখা হয়েছে ফয়জুল্লাহর দেহ। হাতে হাতকড়া। পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর জিনস। বুকের বাঁ পাশে কালচে রক্তে ঢাকা বুলেটের ছিদ্র। অভিযানে নেওয়ার সময় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো থাকলে শরীরের এ অংশটি সুরক্ষিত থাকার কথা।
মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল মনে করেন, রাষ্ট্র কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সুশাসনের অভাব থাকলে পদে পদে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটতে থাকে।
‘আদালতে নেওয়ার সময় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে নেওয়া হয়। অপারেশনে যাওয়ার সময় কেন পরানো হয় না?’ অনলাইন সংস্করণের সংবাদের নিচে এ প্রশ্নটি রেখেছেন পাঠক মো. জাকির হোসেন। কাল বিকেল পর্যন্ত ওই সংবাদটির নিচে ৮৯ জন পাঠক মন্তব্য করেছিলেন। যার মধ্যে ৮০ জনই পুলিশ হেফাজতে ফয়জুল্লাহর নিহত হওয়ার ঘটনার সমালোচনা করেছেন। সোলায়মান নামে আরেক পাঠকের প্রশ্ন, ঘটনা আড়াল করতেই তাঁকে মারা হয়েছে কি? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেছেন, যেখানে ফয়জুল্লাহকে দিয়ে অনেক তথ্য উদ্ঘাটন সম্ভব হতো, সেখানে তাঁকে ক্রসফায়ারে দেওয়াটা বিশেষ কোনো মহলের সংশ্লিষ্টতা সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। রিজওয়ান আহমেদ নামে আরেকজনের মন্তব্য, ‘পুলিশের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলব এটাকে। এত দিন এত খুন হয়ে গেল, একজনকে ধরতে পারেনি পুলিশ। আর মানুষ যখন একজনকে ধরে দিল, তখন তার কাছ থেকেও তথ্য বের করতে পারেনি। বরং তথ্য বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হলো।’
হাতেনাতে কোনো সন্দেহভাজন জঙ্গির ধরা পড়ার এটি দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে গত বছরের ৩০ মার্চ রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে হত্যার পর পালানোর সময় দুই হামলাকারীকে ধরে ফেলেন এক হিজড়া। গত বছরই ওয়াশিকুর হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মুহা. নূরুল হুদা বলেন, ‘ফয়জুল্লাহ একটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ছিল। তার এভাবে মৃত্যু নিয়ে তো কথা উঠতেই পারে। যেহেতু সে ঘটনায় সরাসরি অংশ নিয়ে ধরা পড়েছে, তাই ঘটনা উদ্ঘাটনের জন্য, মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণের জন্য সে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমার তো মনে হয়, তাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই জরুরি ছিল। ওই আসামির নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশের যথেষ্ট সতর্কতা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এটা তো বলাই যায়, তাকে যেভাবে নিরাপত্তা দিয়ে রাখা উচিত ছিল সেভাবে রাখা হয়নি। সব মিলিয়ে এটা কোনো ইতিবাচক ঘটনা নয়।’
জঙ্গি-বিষয়ক বিশ্লেষক এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নূর খান বলেন, বড় কোনো ঘটনাকে আড়াল করার জন্য এ ঘটানো হলো কি না, এ ধরনের প্রশ্ন জনগণের মধ্যে আসতে পারে। কারণ, পুলিশ বলছে, ছেলেটি হিযবুত তাহ্রীরের সদস্য ছিল। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বে কোথাও হিযবুতের সদস্যদের এ রকম টার্গেট কিলিংয়ে অংশ নেওয়ার কথা শোনা যায়নি। এখন এই জঙ্গিদের পরিকল্পনা, অর্থায়নসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িতদের চিহ্নিত করতে পুলিশকে আরও সহনশীল হওয়া উচিত ছিল।


Advertisement

আরও পড়ুন