আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



তনু ধর্ষিত হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার

Published on 15 June 2016 | 5: 14 am

কুমিল্লায় কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। মামলার আলামত ও পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এটি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। অথচ মহলবিশেষ রহস্যজনক কারণে বিষয়টি নিয়ে ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করছে। এদের নানামুখী ভূমিকা প্রমাণ করে তারা আসলে প্রকৃত খুনিদের আড়াল করতে চায়। এ কারণে তনুর ফরেনসিক প্রতিবেদন নিয়ে এত বিতর্ক ছড়ানো হচ্ছে। কুমিল্লার সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে সমাজ সচেতন পর্যবেক্ষকমহল এমনটিই মনে করেন।
তারা বলেন, তনুর ধর্ষিত হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার জন্য বড় কোনো অপরাধ বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথমত, যেহেতু আলামত পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের বীর্য পাওয়া গেছে, সেহেতু সেক্সুয়ালের ঘটনাটি স্পষ্ট। পরের প্রশ্ন হল, এটি যদি স্বেচ্ছায় কিংবা পারস্পরিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে হবে তাহলে হত্যা করার প্রশ্ন আসবে কেন? অর্থাৎ জোরপূর্বক তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। এর একপর্যায়ে ধর্ষকরা নিজেদের আইনের হাত থেকে বাঁচাতে তনুকে হত্যা করে। এখন আইনশৃংখলা বাহিনী বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের অন্যতম কাজ হবে কারা তনুর সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে, সন্দেহভাজন তালিকায় কারা আছেন, তনুর পরিবার থেকে কাদের ইঙ্গিত করা হচ্ছে তাদের খুঁজে বের করা। এরপর প্রাপ্ত আলামতের সঙ্গে তাদের মধ্যে কোনো মিল আছে কিনা তার ডিএনএ পরীক্ষা করা। এছাড়া সংশ্লিষ্ট যেসব চিকিৎসক একেক সময় একেক ধরনের প্রতিবেদন ও বক্তব্য দিয়েছেন তাদের ব্যাপারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে।
নারী নেত্রী, মা ও শিশুকল্যাণ ফাউন্ডেশন কুমিল্লার নির্বাহী পরিচালক দিল নাশিন মোহসেন যুগান্তরকে বলেন, তনুর মরদেহের ময়নাতদন্তের দুটি প্রতিবেদন কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। তনুকে হত্যার আগে ধর্ষণ করেছে ঘাতকরা। ২য় ময়নাতদন্ত রিপোর্ট সঠিকভাবে প্রদান না করে শুধু সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স (স্বেচ্ছায় যৌনসঙ্গম) করার নামে তনুর চরিত্র হনন করা হয়েছে। তিনি বলেন, তনু কুমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন কর্মী, তাকে আমরা ভালোভাবেই চিনি, তার চরিত্র নিয়ে চিকিৎসকরা যে তথ্য প্রদান করেছেন তা ষড়যন্ত্রেরই অংশ। মোহসেন বলেন, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য অন্য কোনো কারণে প্রভাবিত হয়ে সত্য গোপন করে থাকতে পারেন। তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা যে ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে মেডিকেল সায়েন্সের সঙ্গে তা পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। তিনি ঘাতকদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।
বিশিষ্ট নারীনেত্রী ও এইড কুমিল্লার নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া বেগম শেফালী বলেন, তনুকে যে ধর্ষণ করা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। চিকিৎসকদের যুক্তি অনুযায়ী সে যদি স্বেচ্ছায় যৌনসঙ্গমে মিলিত হতো তাহলে তাকে কেন হত্যা করা হল? কেন তার চুল কেটে দেয়া হল? সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় তো ৩ পুরুষের বীর্যের আলামত মিলেছে। তিনি বলেন, ২য় ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. কামাদা প্রাসাদ সাহা প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে অপরাধী এবং ১ম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শারমিন সুলতানাকে বাঁচানোর জন্যই পরিকল্পিতভাবে একটি মিথ্যা বানোয়াট প্রতিবেদন দিয়েছেন। তিনি ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের বিষয়ে তদন্তপূর্বক আইনের আওতায় এনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনসহ বিচারের দাবি জানান।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা কুমিল্লা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল আলম চৌধুরী নোমান জানান, তনুর ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ এ বিতর্ক সৃষ্টি করে ময়নাতদন্তকারী বোর্ড ইচ্ছাকৃতভাবেই জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে নিয়ে তনুর মৃত্যুর কারণই এড়িয়ে গেল। এতে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হল। এ বিষয়ে তিনি দায়ীদের শনাক্ত করে তনু হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে সূত্র জানায়, তনুর ঘাতক শনাক্তে সন্দেহভাজনদের বীর্য, রক্ত, হাতের ছাপসহ সিআইডি অন্যান্য ডিএনএ নমুনা থেকে ঘাতক শনাক্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কবে নাগাদ সিআইডি সন্দেহভাজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার উদ্যোগ নেবে সে বিষয়ে সূত্র নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেনি।
জানা যায়, রোববার কুমিল্লা ফরেনসিক বিভাগ থেকে দেয়া তনুর ২য় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে তনুর ‘মৃত্যুর কারণ’ উল্লেখ না থাকা এবং মৃত্যুর পূর্বে তার সঙ্গে ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ করার বিষয়টি কুমিল্লাসহ দেশজুড়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। তনু হত্যাকাণ্ডের পর লাশ উদ্ধার থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রথম সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত, পরে ২য় দফা কবর থেকে লাশ উত্তোলনের পর সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্তসহ ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং ডিএনএ রিপোর্ট প্রাপ্তির পর ২য় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স উল্লেখ করা- এসব গরমিলসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের রহস্যজনক ভূমিকার কারণে তনু হত্যার সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছেন সমাজের বিশিষ্টজনরা। এক্ষেত্রে তনুর ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরাই এ ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন বলে একাধিক চিকিৎসক ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বিশিষ্টজনরা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লার সাবেক একজন সিভিল সার্জন বলেন, কোনো ভিকটিমের ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ‘জোরপূর্বক যৌন সংসর্গ’ লেখা হয়ে থাকে। কিন্তু তনুর ক্ষেত্রে ধর্ষণের বেশ কিছু আলামত পরিলক্ষিত হলেও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা কেন তা এড়িয়ে গেছেন তা বোধগম্য নয়। তিনি আরও বলেন, তনুর ময়নাতদন্ত নিয়ে কুমিল্লার ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকদের এতটা বিতর্কে জড়ানো ঠিক হয়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে এমন বিতর্কের ঘটনা নিকট অতীতে ঘটেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুমিল্লার ফরেনসিক বিভাগের একাধিক সাবেক চিকিৎসক বলেন, সাধারণত কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ‘ফোর্সফুল সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সের’ আলামত লেখা থাকে এবং তা লিখতে হয়। তনুর ক্ষেত্রে মেডিকেল বোর্ড শুধু ‘ফোর্সফুল’ শব্দটি উল্লেখ করেননি। এ কারণে তনুর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনটি বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়ে মেডিকেল বোর্ড ‘পচা-গলা’ লাশে এ ধরনের আলামত পাওয়া সম্ভব নয় বলে যে বক্তব্য দিয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সের বিষয়টি ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা কিভাবে উল্লেখ করলেন। তাহলে কি তারা (চিকিৎসক) সিআইডির ডিএনএ প্রতিবেদনের ওপর ভর করে ২য় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছেন? এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায় বলে তারা মন্তব্য করেন। তারা আরও বলেন, ধর্ষণ করলে বাহ্যিকভাবে যেসব আঘাতের চিহ্ন শরীরে থাকে বা ছিল তা প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের পক্ষে উদ্ঘাটন সম্ভব ছিল।
২০ মার্চ সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি জঙ্গলে লাশ ফেলে দেয় ঘাতকরা। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ড সমাজ সচেতন প্রতিটি মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। এরপর তনু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে দলমত নির্বিশেষে দেশজুড়ে লাগাতার ক্ষোভ-বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা দিনের পর দিন রাস্তায় থেকে প্রতিবাদ জানান।
তনুর প্রথম ময়নাতদন্ত হয় কুমিল্লা মেডিকেল হাসপাতালে। এরপর আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্তের জন্য ৩০ মার্চ তনুর লাশ কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ১৪ মে কুমিল্লার আদালতে এসে পৌঁছায় নিহত তনুর ৭টি বিষয়ের ডিএনএ প্রতিবেদন। ১৬ মে তনুর ভেজাইনাল সোয়াবে ৩ পুরুষের শুক্রানু (বীর্য) পাওয়া যায়। এর আগে ৪ এপ্রিল প্রথম এবং ১২ জুন ফরেনসিক বিভাগের দেয়া ২য় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন। কিন্তু কোনো প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ বের করতে পারেনি ফরেনসিক বিভাগ। উল্টো পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন