আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘ভিআইপি’ সাক্ষাৎ বন্ধ

Published on 14 June 2016 | 3: 31 am

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুই দিন ধরে ‘ভিআইপি’ (প্রধান ফটক) দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০০ টাকার বিনিময়ে যে কক্ষ দিয়ে দেখা-সাক্ষাৎ করানো হতো সেটিও গতকাল থেকে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান গেট দিয়ে টাকার বিনিময়ে অবাধে দেখা-সাক্ষাৎ করানোর গুরুতর অভিযোগ ওঠায় আইজি প্রিজন এসব অনিয়ম বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন বলে কারাগার সূত্র জানিয়েছে।

গত দুই দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান গেটে সরেজমিন খোঁজ নিতে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে মূল ফটক দিয়ে কারারক্ষীরা ১৫০ থেকে ২০০ বন্দীর সাথে তাদের স্বজনকে ১০০০-১২০০ টাকার বিনিময়ে বসিয়ে সাক্ষাৎ করানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। আর যাদের ভিআইপি স্টাইলে (প্রধান গেট) দেখা করতে টাকার সমস্যা তাদেরকে দক্ষিণ পাশের ‘স্পেশাল’ আরেকটি গেট দিয়ে দেখা করানো হচ্ছিল। কিন্তু কারাগারের গেটে প্রকাশ্যে নগদ টাকার বিনিময়ে স্বজনদের দেখা-সাক্ষাৎ করানোর বিষয়টি কে বা কারা গোপনে ভিডিও করে ইউটিউবে ছেড়ে দেয়। প্রকাশ্যে দুর্নীতির বিষয়টি আইজি প্রিজন জানতে পেরে গত রোববার সকালে কারাগার এলাকা পরিদর্শনের কথা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তুওই দিন আইজি প্রিজন আর কারাগার পরিদর্শন করতে যাননি। তারপরও কারাগার কর্তৃপক্ষ রোববার সকাল থেকে প্রধান গেট দিয়ে বন্দীর সাথে স্বজনদের সাক্ষাৎ করানো বন্ধ করে দেয়। দূর-দূরান্তÍ থেকে আসা বন্দীর অনেক আত্মীয়-স্বজন বিষয়টি জানতে পেরে ফিরে যান।
গতকাল সোমবার দুপুরে কারাগারে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান গেটে দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধের পাশাপাশি এ দিন দণি পাশের ২০০ টাকার স্লিপের বিনিময়ে দেখা সাক্ষাৎও বন্ধ। যার কারণে সাধারণ বন্দীদের সাক্ষাৎ কক্ষ ছাড়া আর কোনোভাবেই বন্দীর সাথে স্বজনেরা সাক্ষাৎ করতে পারেননি।
বন্দীর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসা এক মহিলা নাম না জানিয়ে বলেন, আমার স্বামী কারাগারের ১০ নম্বর সেলে আছে। তার সাথে সপ্তাহে একদিন দেখা করতে আসি। তার জন্য খাবারও নিয়ে এসেছি। তিনি বলেন, কারারক্ষীদের এক হাজার টাকা দিলে তারা প্রধান গেট দিয়ে সুন্দরভাবে দেখা করিয়ে দেয়। আজ এসে শুনছি মেইন গেটে দেখা সাক্ষাৎ হবে না। তাই চলে যাচ্ছি। কারণ সাধারণ কক্ষ দিয়ে দেখা করার কোনো পরিবেশ নেই।
কারাগারের সামনের এক দোকানি আক্ষেপ করে বলেন, সবতো কারাগারের লোকজনই খেয়ে ফেলছে। মেইন গেটে দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ হওয়ায় আমাদেরও কিছুটা সমস্যা হয়েছে। আমরা তাদের মোবাইল রেখে কিছু টাকা পেতাম। প্রতি ব্যাগে ১০ টাকা। অথচ এই মোবাইল কারারক্ষীরা রাখলে প্রতি মোবাইলের জন্য ১০ টাকা দিতে হয়। তা ছাড়া কারারক্ষীদের দোকান ছাড়া কোনো খাবারও কারাগারে প্রবেশ করে না। এই অজুহাত দিয়ে তারা খাবারে অতিরিক্ত টাকা নেয়। দেখা করতে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা নেয়। তাদের ব্যবসাতো সবসময় জমজমাট থাকে। ওপরের চাপ আসায় ২-৪ দিন সাক্ষাৎ বন্ধ থাকবে। এরপর আবার আগের সিস্টেম চালু হবে। তার মতে, কারাগারের গেটে এখন শুধু টাকা ওড়ে। তবে এর প্রতিবাদ করে কারাগারের গেট অর্ডারলি দেলোয়ার হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, বন্দীর স্বজনেরা কেন আসে এই গেট দিয়ে দেখা করতে। আমি চাই এই গেট দিয়ে সবসময় দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ থাকুক। তাহলে আমারও টেনশন কমবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যেভাবে লোকজন কারাগারে প্রতিদিন প্রবেশ করে তাতে যেকোনো সময় ‘দুর্ঘটনা’ ঘটে যেতে পারে। এর আগেও একবার কারাগারের গেট থেকে আসামি পালিয়ে গিয়েছিল। তখন বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় বিপদ আমার ঘাড়ে আসেনি।
গতকাল সন্ধ্যার আগে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা কুলসুম (ছদ্মনাম)। তার স্বজনেরা জানান, চেক ডিজঅনারের একটি মামলায় তিনি গ্রেফতার হয়ে কয়েকদিন কারাগারে ছিলেন। আজ মুক্তি পেয়েছেন। পরে ওই মহিলার সাথে কথা বলতে গেলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কী আর বলবো ভাই, এই কারাগারের পরিবেশ এত বাজে তা ৪-৫ দিন থেকেই বুঝেছি। ভাতের সাথে মাছের যে টুকরো দিচ্ছে সেটি সর্বোচ্চ একটি আঙুলের অর্ধেক পরিমাণ সাইজ হবে। এটি কি খাওয়া যায় ? এ ছাড়া থাকার কষ্ট, খাওয়ার কষ্ট, বাথরুমের কষ্টতো আছেই। এসব কি সরকারের লোকজন দেখেন না ? মাদকের মামলায় গ্রেফতার হওয়া আরেক যুবক জামিনে বেরিয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, এটা আরেক জগৎ। ভেতরে বসে আপনি কী চান? সবই পাবেন। শুধু লাগবে টাকা আর টাকা।
কারাগারের প্রধান গেট দিয়ে দেখা-সাক্ষাৎ দু’দিন ধরে বন্ধ হওয়ার কারণ জানতে চাইলে কারাগারের ঊর্র্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এই কারাগারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘রেড অ্যালার্ট জারি’ করা হয়েছে। যদি কারাগার সংশ্লিষ্ট কেউ কোনো বন্দীর স্বজনের কাছ থেকে টাকা আদায় করে এবং জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শুধু তা-ই নয়, কারাগারে সাদা পোশাকে যারা ডিউটি করছেন তাদের মধ্যেও যারা কারারক্ষীদের মতো কমবেশি আচরণ করছেন, তাদের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট দফতরকে জানানো হবে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন