আজ মঙ্গলবার, ২১ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৬ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



প্রসঙ্গ “হৃদয়ে সন্দ্বীপ’’

Published on 13 June 2016 | 7: 35 pm

কানাই চক্রবর্তী

এক
এর লেখক হেদায়েতুল ইসলাম মিন্টু। প্রকাশিত লেখাগুলো আগে সামাজিক গণমাধ্যম ফেস বুকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। তার এই আবেগময় লেখাগুলো পড়ে সেই সময়ে অনেকে স্মৃতিতাড়িত হয়েছেন। অনেকে উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন। নতুনরা নতুন করে পুরানো সন্দ্বীপের ঐতিহ্য আর লোকজ জীবনের একটা চিত্রকল্প খন্ডিত আকারে হলেও অবলোকন করেছেন।
ব্যক্তিগতভাবে আমারও প্রায় প্রতিটি ধারাবাহিক পড়ার সুযোগ হয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই কোন কোন ধারাবাহিক আমি একবারের বেশীও পড়েছি। লেখাগুলো পড়ে আমার সেই সময়ের মূল্যায়ন ছিল এরকম ‘মিন্টু ভাই লিখতে লিখতে লেখক হননি। তাই তাঁর লেখায় শব্দচয়ন, ব্যাকরণের শৃঙ্খলা, সর্বোপরি সাহিত্য মূল্য আছে কিনা তা দেখার প্রয়োজন নেই। এই যে তিনি কালের সাক্ষি হয়ে কোন রীতিতে ঘটনা বর্নণা করছেন কিংবা তিনি যা বলছেন তাতে ইতিহাসের কোন বিকৃতি হচ্ছে কিনা, এসব বিষয়কে আমি প্রাধান্য দিতে চাইনি। যে বিষযটা আমার উপলব্দিতে এসেছিল তা হচ্ছে তঁর লেখায় সন্দ্বীপের সোঁদা গন্ধ্র আছে। মা মাটি মানুষ আছে। আরো কিছু বিষয় আছে যা অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকও সেই বিষয়গুলোকে তুচ্ছ ভেবে তাদের লেখায় কখনো তুলে ধরেননি।
এর অর্থ হয়তো অন্যটি দাঁড়ায়। লেখাগুলোর কোন সাহিত্যমূল্য নেই, নেই ধারাবাহিকতা কিংবা গভীরতা, ইতিহাসধর্মী লেখাগুলোর পক্ষে কোন সাপোর্টিং নেই.. ইত্যাদি ইত্যদি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এসব কিছুই যদি না থাকে তাহলে গ্রন্থটি আলোচিত হবে কেন? মূল্যায়নই বা করবো কিসের ভিত্তিতে।
এর উত্তরটা আমার কাছে এই মুহূর্তে (যখন লিখছি) এ রকম– উল্লেখিত বিষয়গুলো না থাকলেও এমন ‘একটা কিছু আছে’ যা দিয়ে পাঠক টানা যায়। তবে এই ‘একটা কিছু কী’ তার ব্যাখ্যা করতে আমি কিন্তু অপারগ। এ ক্ষেত্রে ভাষাগত এবং ব্যাখ্যাগত সমস্যা প্রধান। হযতো আমরা যারা জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে সন্দ্বীপের বাইরে দেশে এবং বিদেশে অবস্থান করছি, আমরা যারা সন্দ্বীপের ভিটেমাটি হারিয়েছি তাদের মনস্তাত্বিক দিকটি এ ক্ষেত্রে বেশী কাজ করেছে।
‘হৃদয়ে সন্দ্বীপে’র অনেক পর্ব ছিল ভাসাভাসা। মিন্টু ভাই যেতে যেতে চেয়েও গভীরে যাননি। এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন। কিন্তু যতটুকু ভাসা ভাসা এসেছে তাতেই পাঠকরা উসকানি পেয়েছে – অনেকের স্মৃতিতে দফ করে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। এ যেন রবীন্দ্রনাথের সেই গানের মত– ‘তুমি যে সুরের আগুন জ্বালিয়ে দিলে মোর প্রাণে– সে আগুন ছড়িয়ে গেলো সবখানে সবখানে।’
আসলে তাই। মিন্টু ভাই যখনেই বলেছেন সন্দ্বীপ টাউনের পাঁচ রাস্তার মোড়, বাকীটা আর তাকে বলার প্রয়োজন হয় না। আমরা পাঠকরা দিব্বদৃষ্টিতে তা দেখতে পাই। এ ক্ষেত্রে তিনি শুধূ সূত্রধর মাত্র।
দুই
মিন্টু ভা্ইয়ের ফেসবুকের লেখাগুলোর গ্রন্থাকারে পুনঃ নির্মাণ করেছেন কাজী ইফতেখারুল আলম তারেক। এই পুনঃ নির্মাণ কিংবা মিন্টু ভাইয়ের নবজন্ম কেমন হয়েছে? খুব ভালো হয়েছে বা ভালো হয়নি বলে আমি তারেকের প্রতি অবিচার করতে চাই না। তারেক যে খুব সম্ভাবনাময় এই গ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তা উঠে এসেছে। অন্ততপক্ষে তার ধৈ্র্য্য এবং পরিশ্রম এতে খুবেই স্পষ্ট হয়েছে। সম্পাদনার ঘাটতিগুলো তার ইচ্ছাকৃত নয়, বরঞ্চ এ ক্ষেত্রে তার কম অভিজ্ঞতা এবং বয়স প্রধান কারণ বলে আমি মনে করি।
প্রকৃত প্রস্তাবে সম্পাদনা একটি কঠিন কাজ। বিশেষ করে অন্য একজনের চিন্তা ভাবনা নিজের মত আত্মস্ত করে তা ভাষায় প্রকাশ করা চাট্টিখানি কথা নয়। ফেসবুকের লেখায় মিন্টু ভাই যেভাবে এক প্রসঙ্গে থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন তাতে করে আমাদের মত (যারা আমরা অনেক কিছু দেখেছি কিংবা মিন্টু ভাইয়ের বর্ননার সাক্ষি) অনেকে মূল সুরটি উপলব্দি করতে পারলেও আজকের তরুণ প্রজন্মদের পক্ষে তা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। সে কারণে কিনা মিন্টু ভাইয়ের অনেক লেখায় যে আবেগ ছিল পুনঃনির্মাণে সেই আগুনে ঘি পড়েনি বরঞ্চ জল পড়েছে।
স্বাভাবিক ভাবে হৃদয়ে সন্দ্বীপের সম্পাদক অনেক ক্ষেত্রে মূল লেখার সুরটি আত্মস্ত করতে পারেননি। অনেক স্থানে খেই হারিয়ে ফেলেছেন্। সম্পাদনার আগে যে হোমওয়ারক দরকার ছিল তা এখানে অনুপস্থিত। সর্বোপরি মিন্টু ভাইয়ের মূল লেখার বহু বিষয়গামী ধারাকে একটি গ্রন্থিতে যোগ করা সম্ভব হয়নি।এ ক্ষেত্রে এ ধরনের বিপদজনক (?) একটি পান্ডুলিপি সম্পাদনার জন্য যতটুকু প্রস্তুতি ও সময় প্রয়োজন তারেক তার কতটুকু পেয়েছেন জানি না।
হৃদয়ে সন্দ্বীপে বিষয়গুলো যেভাবে ধারাবাহিকভাবে এসেছে তাতে আর একটু চিন্তা ভাবনা কাজ করতে পারতো। চমৎকার পরিছন্ন এবং তথ্যবহুল, নাতিদীর্ঘ একটি উপসম্পাদকীয়র পর পনের পৃষ্ঠার ‘সন্দ্বীপের ইতিহাস’ গ্রন্থে স্থান পাওয়ার কোন যুক্তি ছিল কী? এটি একবারেই অপচয়। এই অংশটি মিন্টু ভা্ই কিংবা সম্পাদকের মৌলিক লেখা নয়, যা ছাপার অক্ষরে সন্দ্বীপের ইতিহাস ধর্মী অনেক বইতে আছে। এ ক্ষেত্রে বরঞ্চ সন্দ্বীপের সমসাময়িক ভৌগলিক ইতিহাস যেমন ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে সন্দ্বীপের আয়তন এখন কোন পর্যায়ে এসে পৌছেছে, সন্দ্বীপ টাউন কবে বিলিন হলো, সন্দীপ টাউন কারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এসব শুরুতেই আসতে পারতো। কেন না মিন্টু ভাইয়ের সব হাহাকার- বিলাপতো এই সন্দ্বীপ টাউন ভেঙ্গে যাওয়াকে কেন্দ্র করে।
সম্পাদকের মধ্যে এই ভাবনা কাজ করা উচিৎ ছিল তিনি সন্দ্বীপের ইতিহাস সম্পাদনা করছেন না। মিন্টু ভা্ইয়ের বা কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা সম্পাদনা করছেন মাত্র।
একইভাবে দিদারুল আলম, আনোয়ার সেলিম এবং সাগর শাহনেওয়াজ এর তিনটি কবিতা উপস্থাপন যথাযত হয়নি। সন্দ্বীপকে নিয়ে তিনটি কবিতাই সুখপাঠ্য। কবিতাগুলোতে চমৎকারভাবে সন্দ্বীপের চিত্রকল্প উঠে এসেছে ঠিক কিন্তু যেহেতু গ্রন্থটি মিন্টু ভাইয়ের স্মৃতিচারন, সেখানে কোন রকম ভূমিকা ছাড়া সংযোজন খাপছাড়াতো হয়েছেই, মানও হয়েছে খর্ব। তবে কবিতা তিনটি অন্যরকমভাবে উপস্থাপন করা যেতো।
এ ছাড়াও ‘জোকস, অংশে (১০৪ পৃ:) ‘আই এম থ্রি” বলেছিলেন যে চেয়ারম্যান তার নামটা উহ্য রেখে জৈনেক চেয়ারম্যান উল্লেখ করলে ভালো হতো। কারণ আমাদের জন্য ‘জোক” হলেও উল্লেখিত চেয়ারম্যান, তার পরিবার, সন্তান এবং ভক্তদের জন্য তা মর্মপিড়ার কারণ হতে পারে। এসব ব্যাপারে লক্ষ্যরাখা সম্পাদকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তেমনিভাবে পৃষ্ঠা ১১০ এ নিচের দিকে সাংসদ মাহফুজুর রহমান মিতার কর্মকান্ড তুলে ধরাটা আরোপিত মনে হয়েছে। উপরের অংশটা অবশ্য স্মৃতিচারণের পর্যায়ে পড়ে। অন্যদিকে জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক স্মৃতিচারণ, সেকান্দর মহল প্রতিষ্ঠার ইতিকথা, মধুর স্কুল জীবন, ক্রীড়াঙ্গন, ঐতিহ্যের পাদপীঠ সন্দ্বীপ টাউন অংশে ফেসবুকের মিন্টু ভাইকে ভালোভাবেই খুজে পাওয়া গেছে। এখানে তারেক লেখকের সুরটি আত্মস্ত করতে সমর্থ হলেও মিন্টু ভাইয়ের চলচ্চিত্র এবং প্রণয় সর্ম্পকিত বিষয়টিতে লেখকের আবেগের লাগামটা টেনে ধরতে ব্যথ হয়েছে। চলচ্চিত্র সর্ম্পকিত মিন্টু ভাইয়ের নেতীবাচক ভাবটা শিল্প সংস্কৃতির লোক হিসাবে মিন্টু ভা্ইয়ের স্ববিরোধীতা প্রকাশ পেয়েছে ।সম্পাদকের বিষয়টি নজর দেয়া উচিৎ ছিল । বানান এবং ছবির ক্যাপশানের বিষয়ে সম্পাদককে আরো মনোযোগি হওয়ার দরকার ছিল। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ক্যাপশানে। প্রচছদ ভালো হয়েছে। ছাপার মানও খারাপ না। আলী হায়দার চৌধুরীর সুলিখিত লেখক পরিচিতি এই গ্রন্থটিকে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে।

তিন
ভূমিকায় মিন্টুভাই খুব দৃঢতার সাথে বলেছেন তার এ লেখাগুলো দীর্ঘ দুবছরের মধুর ভুলে ভরা লেখা। এই সহজ সরল স্বীকারোক্তি আসলে একজন প্রকৃত লেখকের অভিব্যক্তি। আমরা তাকে লেখকের স্বীকৃতি দিই আর না দিই, তিনি তার স্মৃতি নির্ভর শেকড়ের সন্ধানে ফিরে যাবার চেষ্টা করেছেন এই লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে। শ্রদ্ধেয় বেলায়েত স্যারের ভাষায় (একেএম বেলায়েত হোসেন, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং রাজনীতিবিদ) ‘আমাদের অনেকের মত তারও পিতৃনিবাস সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, সেটাও অনেক আগের কথা। এখন মিন্টু ইচ্ছে করলেও সেই জায়গায় ফিরে যেতে পারবে না। এ কথা জেনেও মিন্টু তার স্মৃতি নির্ভর শেকড়ের সন্ধানে ফিরে যাবার চেষ্টা করছে অকৃত্রিমভাবে। স্মৃতি কাতর হয়ে সে তার মূল সমাজটাকে খুঁজে বেড়িয়েছে এবং বেড়াচ্ছে। ’
আসলে ‘নদীর এপাড় ভাঙ্গে – ওপাড় গড়ে’ কথাটি ঠিক। সন্দ্বীপ শহরটি যদি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে না যেতো তাহলে মিন্টু ভাই এখনো সন্দ্বীপ শহরে থাকতেন মুকুটহীন যুবরাজ হিসাবে। আর নদী ভাঙ্গনে সর্বশান্ত হওয়ার কারণেইতো সন্দ্বীপবাসী পেলো ‘হৃদয়ে সন্দ্বীপ’ নামে একটি গ্রন্থ। যা পরবর্তি প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমার বিশ্বাস এখন থেকে আরো অনেকেই সন্দ্বীপকে নিয়ে স্মৃতচারণমূলক লেখায় সচেষ্ট হবেন।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার উপ প্রধান প্রতিবেদক


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন