আজ সোমবার, ২০ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৫ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



মিতু হত্যাকাণ্ড এসএমএস রহস্যের জট খুলতে ব্যস্ত গোয়েন্দারা

Published on 11 June 2016 | 4: 34 am

পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুর মোবাইল ফোনে ঘটনার আগের রাতে এসএমএস এসেছিল কিনা, সে রহস্য উদ্ঘাটনে প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছেন গোয়েন্দারা। এক্ষেত্রে সিডিআর (কল ডিটেইলস রেকর্ড) টেম্পারিং হয়েছে কিনা, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার আগে-পরে কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, সে সম্পর্কেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে শুক্রবার জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।
এদিকে সিসিটিভির ফুটেজে দেখা সেই যুবক মনির হোসেনকে গোয়েন্দা হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। সে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার না করলেও গোয়েন্দারা নিশ্চিত এ যুবকই সেদিন ঘটনাস্থলে ছিল এবং ইশারা-ইঙ্গিতে খুনিদের সেখানে আনার দায়িত্বটি পালন করছিল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া মনির হোসেনকে আটকের খবর শুক্রবার প্রকাশিত হয়।
এদিকে মিতুর মোবাইল ফোনে ছেলের স্কুলের সময় পরিবর্তনের বার্তাসহ আসা এসএমএসের রহস্য নিয়ে চট্টগ্রামের আইনশৃংখলা বাহিনীতে যেমন নানা ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে তেমনি সাধারণ মানুষও এ নিয়ে কৌতূহলী। সবার প্রশ্ন, এসএমএসই যদি না আসে তাহলে নির্ধারিত সময়ের আগে মিতুর বাসা থেকে বাচ্চাকে নিয়ে বের হওয়ার কারণ কী? ক্যান্টনমেন্ট স্কুল কর্তৃপক্ষ যেমন বলেছে, তারা ঘটনার আগের রাতে কোনো এসএমএস পাঠায়নি, তেমনি পুলিশও মিতুর মোবাইল কললিস্ট যাচাই করে তাতে স্কুল থেকে কোনো এসএমএস আসার প্রমাণ পায়নি বলে জানায়। কিন্তু গোয়েন্দারা বলছেন, এসএমএস পাওয়ার কারণেই মিতু ঘটনার দিন নিয়মিত সময়ের আগেই বাচ্চাকে স্কুল বাসে তুলে দিতে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বলে তাদের বদ্ধমূল ধারণা। তাছাড়া  মিতুর ঘনিষ্ঠ একজন, যিনি একই ফ্ল্যাটে থাকেন তারও দাবি, মিতুর মোবাইল ফোনে এসএমএস এসেছিল। ওই ফ্ল্যাটে তিনি ‘ডাক্তার ভাবি’ হিসেবে পরিচিত। আইনশৃংখলা বাহিনীর একটি সংস্থার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তাকে তিনি নিশ্চিত করেছেন, ঘটনার আগের রাতে মিতু তাকে ফোন করে সেই এসএমএসের কথা জানিয়েছিলেন। প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন গোয়েন্দা সংস্থার এমন একজন জানিয়েছেন, ‘স্পুফিং’ করে যে কারও মোবাইল ফোন থেকে তৃতীয় কারও মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠানো যেমন যায় তেমনি এসএমএস ডিলিট করা বা মুছে দেয়াও যায়। মিতুর মোবাইল ফোনেও ঠিক একইভাবে এসএমএস পাঠানো হয়েছিল কিনা এবং তা আবার মুছে দেয়া হয়েছিল কিনা, সেটিই বের করার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দা সংস্থার প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে সিডিআর বা কল রেকর্ড টেম্পারিংয়ের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, মিতু খুনে দেশী-বিদেশী চক্র জড়িত। এ অবস্থায় খুনিরা অনেক চিন্তাভাবনা করে এবং নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ড ঘটায়। চক্রটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল। এরা একে অপরের সঙ্গে ইশারা-ইঙ্গিতে অপারেশনে অংশ নেয়। এদের কাছে ছিল প্রযুক্তি। তারা ‘হটস্পট’ ব্যবহার করেছিল বলেও তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখছেন।
সূত্র আরও জানায়, ঘটনাস্থলের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ফুটেজ পাওয়া যেত ওআর নিজাম রোড কালিবাড়ী মন্দিরের সিসি ক্যামেরায়। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে চক্রটি এ সিসি ক্যামেরা বা ফুটেজ নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। এ কারণে মন্দিরের ক্যামেরায় ঘটনার সময়কার কোনো ছবি বা ফুটেজ পাওয়া যায়নি। এতে  প্রতীয়মান হয়, খুনিচক্রে ছিল প্রযুক্তিতে দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিও। সূত্র জানায়, এ ফুটেজ থাকলে ঘটনাস্থলের সব তথ্য উদ্ঘাটন করা গোয়েন্দাদের জন্য সহজ হতো। তারপরও গোয়েন্দারা কৌশলগত প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাচ্ছেন। মন্দিরের ফুটেজ না থাকার রহস্য গোয়েন্দাদের ভাবিয়ে তুলেছে। মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের উচ্চক্ষমতার এ সিসিটিভি ক্যামেরা ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। কিন্তু ঘটনার আড়াই ঘণ্টা আগে অর্থাৎ ভোর ৪টা থেকে সিসিটিভি বন্ধ থাকার বিষয়টি তাদের কাছেও রহস্যজনক মনে হয়েছে। তাদের ভেতরে নানা সন্দেহ দানা বেঁধেছে।  মন্দিরের সিসিটিভি বন্ধ থাকার বিষয়ে লিটন নামে এক ব্যক্তিকে শুক্রবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন একটি সংস্থার দুই কর্মকর্তা। লিটন ওই মন্দিরের সিসিটিভির বিষয়গুলো দেখভাল করেন।
সরেজমিন মন্দিরে গিয়ে লিটনের সঙ্গে কথা বললে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ঘটনার আড়াই ঘণ্টা আগে মন্দিরের সিসিটিভি ক্যামেরা কেন বন্ধ বা অচল হয়ে গেল, তাতে তিনি নিজেও অবাক হয়েছেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্দিরের একজন ভক্ত বলেন, তিনজনের কাছে সিসিটিভির ফুটেজ কক্ষের চাবি থাকে। তাছাড়া কেউ চাইলে কক্ষের জানালার পাশ দিয়ে মাউস হাতে নিয়ে সিসিটিভি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। ঘটনার আগে কেউ খুনিচক্রকে সহায়তা করতে ফুটেজ কক্ষের চাবি সরবরাহ করেছে কিনা অথবা জানালার পাশ দিয়ে যে মাউসের সাহায্য সিসিটিভি নিয়ন্ত্রণ করা যায়- এমন তথ্য খুনিচক্রের কাউকে বলে দিয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। যে কোনো ফুটেজ ডিলিট করতে বা মুছে ফেলতে চাইলে সাধারণত একটি পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হয়। কালিবাড়ী মন্দিরের সেই দুটি সিসিটিভি ক্যামেরায় এ ধরনের পাসওয়ার্ড ছিল না বলে মন্দির কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।
লিটন ছাড়াও ঘটনার রাতে দায়িত্বশীল দুই নিরাপত্তাকর্মী দীপক চৌধুরী ও বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন গোয়েন্দারা। এ তিনজনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে। এদের সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। পাশাপাশি ঘটনার দিন ভোরে এই পয়েন্টে কোন কোন ব্যক্তি কথা বলেছেন, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। এ পর্যন্ত জিইসি মোড়ের টাওয়ার ব্যবহার করে ঘটনার আগে ও পরে যারা কথা বলেছেন এমন ২৩০টি ফোন নম্বরের কললিস্টের তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
গত ৫ জুন ভোরে চট্টগ্রামের ব্যস্ততম জিইসি মোড় এলাকায় সৎ ও সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে দুর্বৃত্তরা ছুরিকাঘাত ও গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ ঘটনায় বাবুল আক্তার বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজের দৃশ্যমান তিনজনসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। মামলাটি তদন্ত করছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ছাড়া সিআইডি, পিবিআই, র‌্যাব ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটও চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি পৃথকভাবে তদন্ত করছে। যদিও গত ৬ দিনে এসব সংস্থা ঘাতকদের গ্রেফতার বা মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি। এর মধ্যে পৃথক একটি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া যুবক মনির হোসেন গ্রেফতারের পর অন্য সংস্থার লোকজনের নজরও এখন তার দিকে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন