আজ সোমবার, ২০ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৫ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



রূপালীর বিপ্লব, সালেহ বিপ্লব

Published on 11 June 2016 | 3: 14 am

সালেহ বিপ্লব : সন্দ্বীপ ভবন। চিকন চাকন একটা চারতলা। ১৯৯৫। তখন দৈনিক রূপালীর অবস্থা খারাপ হতে শুরু করেছে। কিছুদিন আগে সার্কুলেশন ছিল ৫৫ হাজার, যেটা সেই সময়ে অনেক বনেদী পত্রিকার বেলায় কল্পনাও করা যেতো না। দেশের খ্যাতনামা অনেক সাংবাদিক তৈরি হয়েছেন এই রূপালী হাউসে। আমরা যখন জয়েন করি, নিউজ রুম চারতলায়। আগে ছিল নিচে সুবিশাল নিউজ ফ্লোর। এত সুন্দর আর আরামদায়ক নিউজরুম ওই সময় দুস্প্রাপ্য ছিল বেশ। সেই দিন বেশিদিন রইলো না। সৃষ্টির এক মহান কারিগর আলহাজ্ব মুস্তাফিজুর রহমান একের পর এক প্রতিষ্ঠান গড়ে গেছেন। নিজে পড়ে থাকতেন সুদূর সন্দ্বীপে, সাধারণ মানুষের মাঝে। সন্দ্বীপের মানুষকে তিনি যে কী পরিমাণ ভালবাসতেন! মাটি ও মানুষের প্রতি এত দরদী মানুষ, এত বিশাল হৃদয়ের জননেতা দেশে খুব কমই জন্মেছেন। কিন্তু ঘরে বাইরে বিভিন্ন সমীকরণে তিনি একের পর এক চাপের মুখে পড়েন, তার অনেক প্রতিষ্ঠান বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। আবার ঘুরে দাঁড়ায়, মানে একটা লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে এগুচ্ছে সন্দ্বীপ গ্রুপ অব পাব্লিকেশন্স। সাপ্তাহিক, পাক্ষিক গুলো বন্ধ হয়ে গেছে। টিকে আছে মাসিক ব্যাংকার। দৈনিক রূপালী হার না মানা কর্মীবাহিনীর মনোবলে টিকে ছিল। খুব বেশি জনবল নেই, তাও একেবারে কম না। আমি যে সময় কাজে যোগ দেই সেই সময়কার কথা এসব।

মুস্তাফিজুর রহমান সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক তার বড় ছেলে মাহফুজুর রহমান মিতা। বার্তা বিভাগের প্রধান লাজ্জাত ভাই। লাজ্জাত এনাব মহচি, তিনি বার্তা সম্পাদক। কুদ্দুস আফ্রাদ চিফ রিপোর্টার। কিন্তু জয়েন করার কয়েক দিনের মাথায় খেয়াল করলাম, লাজ্জাত ভাই কোন চিঠি সই করলে বার্তা সম্পাদকের সিলমোহর দিয়ে তার আগে হাতে লিখে দেন ভারপ্রাপ্ত। কুদ্দুস ভাইও তাই করেন। কারণ কী? অফিস বলছে বার্তা সম্পাদক, চিফ রিপোর্টার। এতে খুশী হওয়ার কথাকিন্তু তারা পুরো দায়িত্ব নিচ্ছেন না। ভারপ্রাপ্ত থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন নিজ দায়িত্বে। মাত্র দু এক মাসে এসব পেশাগত জটিলতা বোঝার কথা নয়, তবে বুঝে নিলাম। আগেই বলেছি রূপালী থেকে জন্ম নিয়েছেন দেশের প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তি। বার্তা সম্পাদক অন্য পত্রিকায় চলে গেছেন, চিফ রিপোর্টারও।আমি জয়েন করে জানলাম, লাজ্জাত ভাই আর কুদ্দুস ভাই সেই পদ দুটো সামলান। তখনি শিখলাম সংবাদপত্রের ওয়েজবোর্ড রোয়েদাদ। সহজ কথায় যাকে বলে সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বেতন স্কেল। রূপালী শুরু থেকেই ‘এ’ ক্যাটাগরির দৈনিক হিসেবে ওয়েজ বোর্ড দিয়েই লোক নিয়োগ করেছিল। হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া দুঃসময়ে বড় বড় সাংবাদিক যে যেখানে পেরেছেন চাকরি নিয়েছেন, এটাই নিয়ম। কিন্তু দুর্দান্ত মেধাবী কজন সাংবাদিক কর্মকর্তা রয়ে গেলেন। তারা আরেকবার চেষ্টা করবেন। সামনে নির্বাচন, যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, তাহলে এই সুন্দর পত্রিকাটা বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা যাবে। বলছিলাম লাজ্জাত ভাই ও কুদ্দুস ভাইর কথা। লাজ্জাত ভাই যদি বার্তা সম্পাদক হন, তাহলে ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী অনেক বেতন বাড়বে। কুদ্দুস ভাইর ক্ষেত্রেও তাই হবে। কিন্তু তাতে যে খরচ বাড়বে তা দেয়ার সামর্থ্য তখন রূপালী কর্তৃপক্ষের নেই। সব কিছু, দুপক্ষই দুই পক্ষের যুক্তিতে একমত। এই বিষয়টা আমার খুব ভালো লাগল। আরে বেতন না বাড়ুক, পদ তো বাড়বে, এই সুবিধা ছেড়ে দেয়ার স্বভাব এভারেজ বাঙালির নেই। সেই দুই মহান হৃদয় সাংবাদিকের আজকের অবস্থান কী? অসামান্য। লাজ্জাত ভাই প্রথম আলোর বার্তা সম্পাদক, কুদ্দুস ভাই চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বকোণ ঢাকা অফিসের নিউজ চিফ। একই সাথে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার বাংলাদেশস্থ স্টাফ রিপোর্টার।

ভালো বসের আন্ডারে জীবনের প্রথম চাকরি, এ যে কী অসাধারণ প্রাপ্তি, আমি জানি। বার্তা সম্পাদক বা চিফ রিপোর্টার শুধু নন, রূপালীর টিমটাই ছিল খুব খুব ভালো। আমরা যোগ দেয়ার টাইমে যাদের পেয়েছি, দুয়েক জনের নাম মেমোরিতে এই মুহূর্তে নেই। ডেস্কে ছিলেন ফারুক ভাই, পড়ে আমেরিকা চলে যান। ছিলেন আব্দুস সালাম সরকার, মিজানুর রহমান। (মিজান এখন আছেন প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ পিআইবি-তে।) রিপোর্টিং-এ জসীম আহমেদ, সোহেল মাহমুদ, আজমল হক হেলাল। মফস্বলের সহ সম্পাদক হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরী, আমি আর চুন্নু নতুন জয়েন করলাম, চুন্নু ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি। এক মাস পার না হতেই আমার পরীক্ষা শেষ। নিয়োগ দেয়া যায় বলে সম্মতি দিলেন কর্তারা। আমার চাকরি স্থায়ী হয়ে গেল। আমার আর হিলালীর। চুন্নু বেশিদিন থাকেননি। হিলালী ওয়াদুদ চৌধুরী, বন্ধু আমার, এখন ভোরের কাগজে। যেদিন আমার আর হিলালীর স্থায়ীকরন হল, পত্র পেলাম, সেদিন একটা সভা ডেকেছিলেন মিতা ভাই। মাহফুজুর রহমান মিতা। তিনি এখন সন্দ্বীপ থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য, পিতার স্থান পূরণ করেছেন। সেই সভায় মিতা ভাই জানালেন, দুপুরে তিনি লাঞ্চের মাধ্যমে নবাগতদের স্বাগত জানাবেন। খেতে গেলাম মারলিন এ। সেখানে আরেক কাহিনী।

মিতা ভাই আমার ইয়ার মেট, কিন্তু বিশাল দেহ আর বিশাল পদে থাকার কারণে বসের মতোই ভারিক্কী। তিনি ঘোষণা দিলেন, হিলালীর যত ইচ্ছা তত প্লেট বিরিয়ানি খেতে পারবে, বিল তিনি দেবেন। হিলালী খেতেও পারেন। আল্লাহর রহমতে কম খেলেন না। সবার খাওয়া শেষে যখন উঠি, তখন দেখলাম বিল-টিল নিয়ে ঝামেলা মেটাচ্ছেন শেখ আরিফ। রূপালীর স্পোর্টস রিপোর্টার। তিনি মিতা সাহেবের খুব আস্থাভাজন সাংবাদিক ও কর্মকর্তা। প্লাস খুব ভালো বন্ধু। আরও একজনের উপর মিতা ভাই খুব নির্ভর করতেন। দিদারুল ইসলাম মামুন। একটু সিনিয়র হলেও সার্কুলেশন ম্যানেজার নিজামকেও বন্ধু হিসেবে পেয়েছি। মামুন আর নিজাম, দুজনেই এখন রূপালী ইন্সুরেন্সে। সেই সব মানুষ, সুন্দর একটা টিমে আমার কর্মজীবন শুরু হল।

আমার টেবিল দেয়া হল চিফ রিপোর্টার কুদ্দুস আফ্রাদ আর সিনিয়র রিপোর্টার জসীম আহমেদের মাঝখানে। যতক্ষণ কাজ থাকে, একমনে কাজ করে যাই। কাজের বিরতি পড়লে একবার এদিক চাই, আরেক বার ওদিক। একবার কুদ্দুস ভাইকে দেখি। নিজের রিপোর্ট করছেন, আমাদের রিপোর্ট এডিট করছেন, রিপোর্টারদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ পরামর্শ দিচ্ছেন। আর চা সিগারেট খাচ্ছেন। তুমুল ব্যস্ত। কখনো কাগজ কলমে, কখনো ফোনে। আর এপাশে দেখি জসীম ভাইর কাজ। নোট দেখে স্ক্রিপ্ট লিখছেন, চিফ রিপোর্টারের পরামর্শ নিচ্ছেন, রিপোর্টের প্রয়োজনে ফোন করছেন। আমি চেয়ে চেয়ে দেখি, আর চোখে ভাসে অনাগত স্বপ্নের ডালি। একদিন আমিও এই ভাইদের মত বড় রিপোর্টার হব। রাত বা দিন যে কোন সময় যে কোন মন্ত্রীর বাসায় ফোন করব। কমেন্ট নিয়ে রিপোর্ট করব। এসব ভাবি। আর প্রেস রিলিজ থেকে নিউজ বানাই। আওয়ামী লীগ বিট করতেন কুদ্দুস ভাই ও জসীম ভাই। আজমল হক হেলাল ভাই জাতীয় পার্টি। কানাইদা তখন সহকারি সম্পাদক, সম্পাদকীয় সব কাজ তাকে করতে হত। উপ সম্পাদকীয়, মফস্বল, সাহিত্য, বিনোদন সবই তার করতে হত। সোহেল মাহমুদ সেক্টর কর্পোরেশন কাভার করতেন, বিনোদনেও যাতায়ত ছিল তার। কানাইদা পরে রিপোর্টিং-এ আসেন, বিএনপি বিট দেখতেন তখন। হিলালী যোগ দেয়ায় কানাইদা একটু ভারমুক্ত হন। আর আমাকে ট্যাগ করা হয় জসীম ভাইর সাথে, তার ডে অফ থাকলে আওয়ামী লীগের প্রোগ্রামে আমি যেতাম। আর একাধিক প্রোগ্রাম থাকলে তিনি একটায় যেতেন, আমাকে পাঠাতেন আরেকটিতে। তবে আমার মূল কাজ তখন প্রেস ক্লাব ও সিরডাপ মিলনায়তনে বিভিন্ন সভা সমিতি কাভার করা। ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটি তখনো সেভাবে জমে ওঠেনি, বেশির ভাগ সভা সেমিনার আর সমাবেশের কেন্দ্র ছিল প্রেসক্লাব। এসব অনুষ্ঠানে গিয়ে একে একে সাংবাদিক জগতকে চিনতে শুরু করলাম।

পত্রিকার পাতায় নাম দেখেছি, এমন সব বিখ্যাত সাংবাদিকদের দেখা পাওয়া! কী এক গর্বমেশানো অনুভব! মাহমুদা চৌধুরীর সাথে যেদিন পরিচয় হল, সেই দিনের উচ্ছ্বাস আমি আজও ভুলতে পারি না। মাহমুদা চৌধুরী, আমাদের মাহমুদা আপা। বিচিত্রায় তার লেখা সিনেমা সমালোচনা পড়তাম সেই ছোট্ট বেলা থেকে। তিনি আমার চোখের সামনে, শুধু চোখের সামনে কি? মাইক্রোবাসে তার পাশের সিটে বসে প্রেস কনফারেন্সে গেলাম আগারগাঁও বিজ্ঞান যাদুঘরে। অফিসে ফিরলাম বিশ্বজয়ের আনন্দ নিয়ে, আমার চেহারায় প্রবল আনন্দ ঠিকরে পড়ছিল! নিউজ রুমে ঢুকতেই কুদ্দুস ভাই বললেন, ‘বিপ্লবকে খুব এক্সাইটেড মনে হচ্ছে, কাহিনী কী?’ আমি বেশ কিছু সেকেন্ড সময় নিয়ে নিজেকে সামলালাম। তারপর কোন রকমে বললাম, ‘বস, মাহমুদা চৌধুরীর সাথে পরিচয় হল আজ।’ স্বভাবসুলভ হাসিমুখ নিয়ে চিফ রিপোর্টার আমার উত্তেজনা উপভোগ করলেন সস্নেহে। বললেন, ‘বড় টিপ?’ আমি বললাম, ‘জ্বী বস।’ তারপর জানালাম আমার বঙ্গ বিজয়ের ইতিহাস, যার মধ্যমণি, মাহমুদা আপা। আগামী পর্বে জানাচ্ছি সে বৃত্তান্ত।

সুত্র : SBC71


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন