গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী টিপু মুন্সীও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা!

গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান মুন্সী। তবে তিনি টিপু মুন্সী নামেই পরিচিত। নামের আগে-পরে গর্ব করেই লেখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই পরিচয়ে তার অধীনস্থ বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়ে গিয়ে তিনি সংবর্ধনাও নেন। কিন্তু বাস্তবে মুক্তিযোদ্ধার কোনো তালিকায় তার নাম নেই। তিনি একজন স্বঘোষিত মুক্তিযোদ্ধা। ‘দেশ রক্ষা বিভাগ স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র’ জমা দিয়ে সাময়িক সনদপত্রও নিয়েছেন। এমনকি এই সনদবলে ২০১০ সালে তিনি গেজেটভুক্তও হয়েছেন। এ সুবাদে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা হিসেবে গণপূর্তের অধিদফতরের মতো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দফতরে প্রধান প্রকৌশলীর পদে পোস্টিং নিতে সক্ষম হন। যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘দেশ রক্ষা বিভাগ স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদ’ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করা যাবে না। এসব নথিপত্র জমা দিয়ে গেজেটভুক্ত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। মুক্তিযোদ্ধাকে অবশ্যই কোনো না কোনো তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে অবশ্যই গ্রহণযোগ্য নথিপত্র জমা দিতে হবে। অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমি নিজেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেব।’ তিনি বলেন, ‘২০১০ সালে কি হয়েছে, না হয়েছে সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। আমি শুধু দেখব যথাযথ নিয়ম মেনে তাকে সনদ এবং গেজেটভুক্ত করা হয়েছে কিনা। কোনো ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানের মর্যাদা পেতে পারে না।’
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, হাফিজুর রহমান মুন্সীর বাড়ি টাঙ্গাইলের বাশাইল উপজেলার কাশীল গ্রামে। তার পিতার নাম মরহুম বজলুর রহমান মুন্সী। ১৯৫৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর তার জন্ম। সেই হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকালীন বয়স ছিল ১৪ বছর তিন মাস। আগে কখনও মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণ না করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি চাকরিসীমা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হলে ২০১০ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবেদন করে সাময়িক সনদ নেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের  তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম তাকে এই সাময়িক সনদ দেন। ওই বছরের ১ আগস্ট হাফিজুর রহমানকে যে সনদ দেয়া হয় তার সদস্য নং ম-১৫৮২৮৪। এর আগে জামুকার সুপারিশে একই বছরের ২৫ জুলাই তাকে গেজেটভুক্তও করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনে যে নথিপত্র জমা দেন তার কিছু কাগজপত্র যুগান্তরের কাছে এসেছে। এতে দেখা যায়, হাফিজুর রহমান ‘দেশ রক্ষা বিভাগ স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদ’ এবং ১১নং সেক্টরে কাদেরিয়া বাহিনীর ১নং হাতেম আলী কোম্পানি কমান্ডার লোকমান হোসেনের নামে ২০০৭ সালের ২৫ মে স্বাক্ষরিত ‘১১নং সেক্টর, কাদেরিয়া বাহেনী, ১নং হাতেম কোম্পানি, রণাঙ্গন ৭১’ নামে একটি সনদ জমা দেন। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের সনদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সাময়িক সনদ এবং গেজেটভুক্ত করা যায় না। কিন্তু রহস্যজনকভাবে এসব বিতর্কিত সনদ আমলে নিয়ে হাফিজুর রহমান মুন্সীকে গেজেটভুক্ত করা হয়।
এ সংক্রান্ত নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০০৯ সালে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির বয়স ২ বছর বাড়ানোর আদেশ জারির পর নিজের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেন হাফিজুর রহমান মুন্সী। তখন তিনি গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ২০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব এএফএম হায়াতুল্লাহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একটি পত্র দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, হাফিজুর রহমান মুন্সীর নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় না থাকায় তাকে প্রত্যয়ন করা গেল না। পরবর্তীকালে বিতর্কিত নথিপত্র জমা দিয়ে জামুকায় আবেদন করে রহস্যজনকভাবে গেজেটভুক্ত হওয়ার পাশাপশি সাময়িক সনদও পেয়ে যান এই কর্মকর্তা।
এদিকে এই সনদবলে মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে কেউ ২ বছরের বর্ধিত সময় চাকরির সুবিধা পাবেন কিনা সে বিষয়ে তথ্য তালাশ করা হয়। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। এতে চার ধরনের মুক্তিযোদ্ধাকে ২ বছরের বর্ধিত চাকরি সুবিধা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এরা হলেন, যেসব কর্মকর্তা-কর্মচরী চাকরিতে প্রবেশের সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, যাদের নাম মুক্তিবার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম গেজেটে প্রকাশিত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এই চার ক্যাটাগরির মধ্যে ‘গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা’র কথা উল্লেখ থাকায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা এই সুবিধা নেয়ার পাঁয়তারা শুরু করেন। এর ফলে ২০০৯ সালের পর নিয়মবহির্ভূত বিভিন্ন সনদ জমা দিয়ে দুর্নীতিবাজ বহু কর্মকর্তা জামুকায় আবেদন করে অসদুপায়ে গেজেটভুক্ত হন এবং সাময়িক সনদ পেয়ে যান। পর্দার আড়ালে থেকে এ প্রক্রিয়ায় সহায়তা দিয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রভাবশালীরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে মুক্তিযোদ্ধা চাকরিজীবীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে গেজেটভুক্ত হওয়ার সুযোগ নিয়েছেন তাদের ভর্ৎসনা করা হয়। এরপর ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান (তার মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে) স্বাক্ষরিত একটি পত্র জারি করা হয়। ওই পত্রের এক স্থানে চারটি মানদণ্ডের ব্যাখ্যা দেয়া হয়। এতে বলা হয়, ‘সরকার এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, যেসব কর্মকর্তা কর্মচারী চাকরিতে প্রবেশের সময় বা আবেদন করার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেননি অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ নেননি বা মুক্তিবার্তায়/গেজেটে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি, কিন্তু বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন বা সার্টিফিকেট নিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে ৫৭ বছর চাকরিকাল পরবর্তী ২ বছর বর্ধিত চাকরিকাল প্রযোজ্য হবে না।’
তবে সব নিয়মনীতি লংঘন করে হাফিজুর রহমান মুন্সীর সনদ গ্রহণ করে তাকে দুই বছরের বর্ধিত চাকরি করার সুযোগ দেয়া হয়। এ সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গেছে, হাফিজুর রহমান মুন্সী দ্বিতীয়বার ২০১০ সালে ভুয়া নথিপত্রের মাধ্যমে গেজেটভুক্তি হন। এরপর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে সাময়িক সনদ জমা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা চাকরিজীবীর বর্ধিত সুবিধা পেতে আবেদন করেন। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব জান্নাতুল ফেরদৌস ওই বছরের ৯ আগস্ট সাময়িক সনদ সংযুক্ত করে তা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মুক্তিযুক্তবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠান। তার পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ২৬ মে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব লোকমান আহাম্মদ ফিরতি আরেক পত্রে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবকে জানান, ‘হাফিজুর রহমানের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকায় তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন করা হল!’ এরপর একই বছরের ৬ জুন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব মনোজ কুমার রায় গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে এ বিষয়ে একটি পত্র দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘হাফিজুর রহমান মুন্সীর নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় (!) অন্তর্ভুক্ত থাকায় তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন করা হয়েছে। এমতাবস্থায় ‘দি পাবলিক সার্ভিস (রিটায়ারর্টমেন্ট) (এমেন্ডমেন্ড) অ্যাক্ট ২০১০’ অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারীদের চাকরি ২ বছর বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ৩১ ডিসেম্বর ২০০৯ তারিখের সম (বিধি-৪)-বিবিধ-৩৫/২০০৫-৪৩৯ নং পরিপত্রের অনুচ্ছেদ-১ অনুযায়ী গণপূর্ত অধিদফতরের ওই মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তার সার্ভিস রেকর্ড/ চাকরি বহিতে বয়স বৃদ্ধির বিষয়টি লিপিবদ্ধ করাসহ পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল।’ এভাবেই হাফিজুর রহমান মুন্সী সব নিয়মনীতির চোখে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করেন এবং প্রধান প্রকৌশলীর পদ পাওয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে যান। বর্তমানে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা হিসেবে গণপূর্ত অধিদফতরের মতো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন।
তিনি যা বললেন : সম্প্রতি হাফিজুর রহমান মুন্সীকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সংবর্ধনা দেন গণপূর্ত বিভাগের মহাখালী উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। খবর পেয়ে যুগান্তর প্রতিবেদক সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে যুগান্তরকে নানা তথ্য দেয়ার চেষ্টা করেন। কোন সেক্টর কমান্ডারের অধীনে আপনি যুদ্ধ করেছেন জানতে চাইলে হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সেক্টর কমান্ডারের নাম এই মুহূর্তে মনে নেই। তবে আমি কাদের সিদ্দিকীর আন্ডারে যুদ্ধ করেছি। তিনি সেক্টর কমান্ডার কিনা আমার জানা নেই। তিনি নিজেই একটি বাহিনীর প্রধান ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘খুব সম্ভবত মীর শওকত ১১নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন।’ সহযোগী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার নাম জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ব্যস্ততার কারণে আমি মুক্তিযোদ্ধার কোনো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারিনি। তবে আমার গ্রামের মানুষ জানে আমি মুক্তিযোদ্ধা।’ একপর্যায়ে তিনি যেসব নথিপত্র জমা দিয়ে সাময়িক সনদ পান ও গেজেটভুক্ত হন তার ফটোকপি প্রতিবেদকের হাতে ধরিয়ে দেন। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবেদন করে ২০১০ সালে তিনি গেজেটভুক্ত হন এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সাময়িক সনদপত্রও নিয়েছেন। তিনি জানান, গণপূর্তের একটি প্রতিপক্ষ গ্রুপ তার বিরুদ্ধে নানান ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। কুমিল্লা এলাকার চক্রটি তাকে এই পদ থেকে তাকে সরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market