আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেই

রাজধানীসহ সারা দেশের আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। ছয় মাসের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে প্রায় দুই মাস আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ভবন মালিকদের কাছে এখনও পর্যন্ত কোনো চিঠি ইস্যু করেনি কর্তৃপক্ষ।
তবে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি ইতিমধ্যে কয়েকটি সভা করেছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুল মালেক মঙ্গলবার জানান, সর্বশেষ ১৬ মে এ সংক্রান্ত কমিটির একটি সভা করেছি আমরা। ওই সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো চিঠি ইস্যুর কার্যক্রম শুরু করবে। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর প্রায় ছয় হাজার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হলে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

তিনি আরও জানান, প্রতি ১৫ দিন অন্তর এ সংক্রান্ত কমিটির সভা করে তার অগ্রগতি জানাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা রয়েছে। খুব শিগগিরই আমরা আরও একটি সমন্বয় সভা করব। ওই সভায় সংস্থাগুলোর কাজের অগ্রগতি জানতে পারব। জানা যায়, ৪ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সভায় বৈঠকে আবাসিক এলাকা থেকে ছয় মাসের মধ্যে সব ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরানোর সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ৭ এপ্রিল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, প্রথমে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অপসারণ করা হবে। হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অপসারণের ব্যাপারে এলাকাবাসীর মতামত নেয়া হবে। এলাকাবাসী ইতিবাচক মত দিলে ওই সব স্বাস্থ্য ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান থাকবে। তবে এলাকাবাসী নেতিবাচক মত দিলে সেসব প্রতিষ্ঠান উঠিয়ে দেয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এলজিআরডি সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরানোর লক্ষ্যে প্রথমে ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের জন্য চিঠি ইস্যু করবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। প্রথম চিঠিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ৮-১০ দিনের সময় দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হবে। কারণ দর্শানোর জবাব পর্যালোচনা করবে সিটি কর্পোরেশন। সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ওই প্লট বাণিজ্যিক করা হয়ে থাকলে বা আদালতের কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকলে ওই ট্রেড লাইসেন্স বহাল থাকবে। অন্যথায় সময় বেঁধে দিয়ে ওই ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা হবে। সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি একই সময়ে চিঠি ইস্যু করবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংশ্লিষ্ট প্লটের ব্যবহার সম্পর্কে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে চিঠি ইস্যু করতে সমন্বিত কমিটির পক্ষ থেকে রাজউককে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিফোন সেবা কর্তৃপক্ষ চিঠি ইস্যু করে তাদের সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঢাকঢোল পিটিয়ে সরকার ছয় মাসের সময়সীমা বেঁধে দিলেও এরপর তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় বাড়ছে রাজধানীবাসীর। কেউ কেউ লোক দেখানো সিদ্ধান্ত বলেও সমালোচনা করছেন। জানতে চাইলে প্রকৌশল ও নগর বিশেষজ্ঞ ম. ইনামুল হক জানান, রাজধানীর আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরানোর মূল কাজ করতে হবে রাজউককে। এ ধরনের কাজ করার ব্যাপারে রাজউকের যথেষ্ট অনীহা রয়েছে। সেটা নগরবাসীর কাছে পরিষ্কার। তিনি আরও জানান, সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হলে আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সাহস বেড়ে যাবে। তারা নতুন উদ্যমে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে। এজন্য তিনি এলজিআরডি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান।

এ প্রসঙ্গে রাজউকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, ‘আলটিমেটাম দিয়ে আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরানোর ব্যাপারে কোনো লিখিত নির্দেশনা দেয়া হয়নি রাজউককে। লিখিত নির্দেশনা পেলে তারা আলটিমেটামের চিঠি ইস্যু করবেন। তবে তিনি দাবি করেন, রাজউক বেশ আগ থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে আবাসিক ভবনের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। কয়েক মাস ধরে ধানমণ্ডি, গুলশান ও উত্তরা এলাকায় আবাসিক ভবনের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এখনও এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল জানান, এলজিআরডি মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি ইস্যু করার ব্যাপারে কোনো ধরনের নির্দেশনা পাইনি আমরা। তবে এ সংক্রান্ত সভায় তিনি বা তার সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। নির্দেশনা পেলে তা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করবেন তারা। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের নবায়ন বন্ধ রাখা হয়েছে। এসব ট্রেড লাইসেন্স ডিএসসিসি আর নবায়ন করবে না।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোহাম্মদ নবীরুল ইসলাম জানান, আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল বা আলটিমেটাম দেয়ার কোনো চিঠি মন্ত্রণালয় থেকে তারা পাননি। তবে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। তিনি আরও জানান, এলজিআরডি মন্ত্রণালয় থেকে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা পেলে তা দ্রুতই বাস্তবায়ন শুরু করবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমণ্ডি এলাকায় কার্যক্রম শুরু করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে সরকারি অন্যান্য আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অপসারণ কার্যক্রম শুরু করা হবে। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে; ধাপে ধাপে বেসরকারি আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অপসারণ কার্যক্রম শুরু করবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো।

গুলশান এলাকার মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজউকের অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ আদিলুজ্জামান জানান, আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অপসারণের জন্য ছয় মাসের আলটিমেটাম দিয়ে চিঠি ইস্যুর কোনো নির্দেশনা তিনি পাননি। তবে তিনি জানান, রুটিন কাজ হিসেবে আবাসিক ভবনের কারপার্কিংয়ের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি র‌্যাম্প অপসারণের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market