আজ বৃহঃপতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৪ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



এডিজি আমীর হোসেনের ঘুষ কেলেংকারি ফাঁস

Published on 29 May 2016 | 3: 42 am

কোনো মিডিয়া বা মাধ্যম নয়। কারও হাত ঘুরেও নয়। তিনি ঘুষ নেন সরাসরি। ঘুষ নেয়ায় কোনো রাখঢাক নেই তার। তাই টেবিলের নিচ দিয়ে নয়, অবলীলায় ঘুষের টাকার বান্ডিল তিনি গুনে নেন টেবিলের ওপর রেখেই। ওপেন সিক্রেট স্টাইলে ঘুষ নেয়া এই কর্মকর্তার নাম আমীর হোসেন। প্রশাসন ক্যাডারের ৮৪ ব্যাচের এ কর্মকর্তা পদমর্যাদায় অতিরিক্ত সচিব। বর্তমানে তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে উচ্চপদস্থ এই সরকারি কর্মকর্তার বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের অকাট্য প্রমাণ বেরিয়ে আসে। এমনকি তার ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিওচিত্র সংরক্ষিত আছে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, উচ্চপদস্থ এই সরকারি কর্মকর্তা অফিসের কাজকর্মে অনেকটাই গাছাড়া। সরকারি কাজে তার তেমন একটা মন নেই। কিন্তু ঘুষের বিনিময়ে কাজ হলে তিনি দ্রুত করিৎকর্মা হয়ে ওঠেন। সেক্ষেত্রে গভীর রাত পর্যন্ত অফিস করতেও তার কোনো দ্বিধা নেই।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, স্যার দিনের বেশিরভাগ সময় শুধু ঘুষ আদায়ের ফন্দি আঁটেন। কোন ফাইল কীভাবে আটকে রেখে, কোথায় প্যাঁচ কষে আটকানো যায় তা নিয়ে রীতিমতো তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে আলাপও করেন। এমনকি দর্শনার্থীর সামনেও হরহামেশা বলে থাকেন, কোথায় ঘুষ ছাড়া কাজ হয় বলেন তো। কিন্তু আমরা ঘুষের কথা বললে অনেকে নিয়মনীতির দোহাই দেন। আরে ভাই, নিয়মের ফাইল করতেও এখন টাকা লাগে। মালয়েশিয়ায় ঘুষ ওপেন সিক্রেট। প্রকাশ্যে কমিশন হিসেবে নেয়া হয়। তিনি বলেন, আমার স্যার তো প্রায় বলেন, তার প্রতি ঘণ্টার দাম ১ কোটি টাকা।
গত এক বছর ধরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ আসতে থাকে। পাওয়া যায় তথ্যপ্রমাণও। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হয়। গোপন ক্যামেরায় অনেকের ঘুষ লেনদেনের দৃশ্য ধরাও পড়ে। ঘুষের ভিডিও চিত্রে যা আছে : খবর ছিল শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত গ্র্যান্ড সুলতান নামের একটি পাঁচতারকা হোটেলে বার লাইসেন্স দিতে বিশাল অংকের ঘুষ বাণিজ্য হচ্ছে। এই ঘুষের একটি অংশ নেবেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক আমীর হোসেন। বার লাইসেন্স ইস্যুর আগে আমীর হোসেনের নেতৃত্বে একটি কমিটি গ্র্যান্ড সুলতান হোটেল পরিদর্শন করে। কিন্তু পরিদর্শন রিপোর্টটি অতিরিক্ত মহাপরিচালকের টেবিলে গিয়ে আটকে যায়। একপর্যায়ে হোটেলের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে নিজেই ফোন করেন আমীর হোসেন। পরিদর্শন প্রতিবেদন ছাড়াতে তিনি ২০ লাখ টাকা ঘুষ চান। নানা দেন-দরবারের পর টাকার অংক ১০ লাখ নির্ধারিত হয়। এর মধ্যে প্রথম কিস্তিতে ৫ লাখ টাকার ঘুষ নেন আমীর হোসেন। নিজের অফিসে বসেই ঘুষের টাকার বান্ডিল বুঝে নেন তিনি। এ ঘটনার পুরো ভিডিওচিত্র গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়।
দিনটি ছিল ১৩ মার্চ। দুপুর ২টা ৩২ মিনিট। ঘুষের টাকাভর্তি বাদামি রঙের একটি প্যাকেট নিয়ে ঢুকলেন একজন। আমীর হোসেনের টেবিলে দুপুরের খাবারের নানা পদ সাজানো। তিনি হলুদ রঙের শার্ট ও কালো প্যান্ট পরে খাবার নিয়ে বসেছেন। শান্ত মুখে প্লেটে ভাত তুলছেন। হঠাৎ ঘুষের টাকা নিয়ে আসা আগন্তুককে দেখে মুচকি হাসলেন। এরপর প্লেট থেকে মুখ তুলে বললেন, খবর কী? আগন্তুক বললেন, টাকাটা নিয়ে এসেছি। খাম থেকে এক হাজার টাকা নোটের কয়েকটি বান্ডিল বের করতে লাগলেন তিনি। টাকার বান্ডিল দেখে আমীর হোসেনের মুখে তৃপ্তির হাসি। জানতে চাইলেন, কত আছে? আগন্তুক নিচু স্বরে কিছু একটা বললেন। এরপর আমীর হোসেন টাকার বান্ডিলভর্তি প্যাকেটটি হাত বাড়িয়ে নিলেন। টেবিলের ড্রয়ার টেনে রেখে দিলেন। এরপর খাওয়া শেষ করে বাম পাশের ড্রয়ার খুললেন। ড্রয়ার থেকে গ্র্যান্ড সুলতান হোটেলের পরিদর্শন সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি বের করেন। একটানে প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করলেন। এবার কলিংবেল চেপে পিএকে (ব্যক্তিগত কর্মচারী) ডাকলেন। আগন্তুকের সামনেই পিএ’র কাছে সদ্য স্বাক্ষর করা পরিদর্শন প্রতিবেদনটি দিয়ে বললেন, ‘এটি এখনই জরুরি ভিত্তিতে ফাইলে পুটআপ দিতে বল।’ এরপর আগন্তুককে বললেন, ‘কি এবার খুশি তো। আপনার সামনেই সব কাজ করে দিলাম।’ এ ঘটনার পুরো ভিডিও চিত্র সংরক্ষিত আছে।
সূত্র জানায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে গত ছয় মাসে অন্তত ১০টি বার লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। লাইসেন্স ইস্যুর আগে নিয়মানুযায়ী সরেজমিন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে হয়। প্রায় প্রতিটি পরিদর্শন কমিটির প্রধান ছিলেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। লাইসেন্স ইস্যুর পূর্ব শর্ত হিসেবে সুপারিশসহ আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রতিবেদন থাকতে হবে। অভিযোগ আছে, এসব প্রতিবেদন দেয়ার ক্ষেত্রে মোটা অংকের ঘুষ নেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক আমীর হোসেন।
সূত্র বলছে, একেকটি বার লাইসেন্স ইস্যুতে কোটি টাকারও বেশি ঘুষ লেনদেন হয়। এর একটি অংশ আমীর হোসেনের পকেটে যায়। আর ঘুষের বড় একটি অংশ আরও উচ্চ পর্যায়ের চতুর এক কর্মকর্তার পকেটে ঢোকে। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার একটি সিন্ডিকেটও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এই ঘুষের হাটে ভাগ বসায়। এতে করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এডিজি স্যার, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের আওতাধীন বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও মোটা অংকের মাসোহারা আদায় করেন। এসব অনিয়ম জায়েজ করতে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের খুশি রাখেন। এজন্য ওপর মহলে দামি দামি বিদেশী মদের বোতল উপঢৌকন পাঠান’।
সূত্র জানায়, মাঠ পর্যায়ে কর্মরত ইন্সপেক্টর, সহকারী পরিচালক ও উপ-পরিচালকরাও আমীর হোসেনের ঘুষ আবদারে অতিষ্ঠ। এসব কর্মকর্তাদের অনেকের কাছ থেকেই তিনি নির্ধারিত রেটে ঘুষ নেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরের কাছে অতিরিক্ত মহাপরিচালক আমীর হোসেনের ঘুষ বাণিজ্যের গোমর ফাঁস করেন। এদের অনেকেই ভালো পোস্টিং বা পদোন্নতির জন্য তার হাতে মোটা অংকের ঘুষ তুলে দেন। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও তারা কাক্সিক্ষত পোস্টিং বা পদোন্নতি কোনোটিই পাননি। ঘুষ হিসেবে দেয়া মোটা অংকের টাকাও ফেরত আসেনি।
এমন প্রেক্ষাপটে ২২ মে আমীর হোসেনের অন্যত্র বদলির আদেশ জারি হয়। এরপর থেকেই ঘুষের টাকা ফেরত পেতে আমীর হোসেনের বাসায় গভীর রাত পর্যন্ত ধরনাও দিচ্ছেন অনেকে। কিন্তু আমীর হোসেন নির্বিকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিনি সাফ জানিয়ে দেন,  ‘ঘুষের টাকা ফেরত হয় না।’ বিষয়টি নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
সূত্র জানায়, অতিরিক্ত সচিব আমীর হোসেন ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে যোগ দেন। এর আগে তিনি রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোতে (ইপিবি) কর্মরত ছিলেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে পোস্টিং পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত চারজন মহাপরিচালক রদবদল হয়। কিন্তু আমীর হোসেনের চেয়ার থাকে অক্ষত। দীর্ঘ ৪ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি একই পদে কর্মরত আছেন।
জানা গেছে, দীর্ঘ সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে কর্মরত থাকার সুবাদে ঘুষ আদায়ের নাড়িনক্ষত্র আত্মস্থ করেন আমীর হোসেন। এক পর্যায়ে বিশাল অংকের ঘুষের টাকা তার কাছে ধরা দেয়। এই অঢেল ঘুষের টাকায় রীতিমতো সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন তিনি। ঢাকায় একাধিক বাড়ি ও নিজ গ্রাম লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে বহুতল বিপণিবিতান নির্মাণ করেন। এছাড়া গ্রামের বাড়িতে কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু করেছেন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ব্যবসা।
সূত্র জানায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের বেশ কয়েকটি সার্কেল ঘুষের জন্য প্রসিদ্ধ। এসব সার্কেলকে অনেকটাই স্বর্ণের ডিমের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এগুলোর মধ্যে আছে গুলশান, রমনা, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর ও তেজগাঁও সার্কেল। এসব সার্কেলে পোস্টিং পেতে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তারা কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতেও এক পায়ে প্রস্তুত থাকেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের আওতাধীন পণ্যাগার (ওয়্যার হাউস), বাংলা মদের ডিপো, মাদক নিরাময় কেন্দ্রসহ বিভিন্ন মাদকজাতীয় ড্রাগ বিক্রির অনুমোদনে মোটা অংকের ঘুষ দিতে হয়। এসব ঘুষ ধরতে আমীর হোসেনসহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের একজন ইন্সপেক্টর বলেন, ‘এডিজি স্যার প্রায়ই একেকজন ইন্সপেক্টরকে ফোন করে তার অফিসে যেতে বলেন। অফিসে গেলে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেন, ‘গুলশান বা রমনায় পোস্টিং নেবেন নাকি? পোস্টিং পেতে চাইলে রেডি হন।’ অতিরিক্ত মহাপরিচালকের এই প্রলোভনের ফাঁদে অনেকেই পা দিয়ে ধরা পড়েন। মোটা অংকের ঘুষের টাকা তুলে দেন আমীর হোসেনের হাতে।
সূত্র জানায়, ভালো পোস্টিংয়ের আশায় অগ্রিম ঘুষ দেয়া অনেক কর্মকর্তা এখন আমীর হোসেনের রামপুরার মহানগর আবাসিক এলাকার বাসার সামনে প্রায়ই গভীর রাত পর্যন্ত বসে থাকেন।
আমীর হোসেনের বক্তব্য : বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, পোস্টিং দেয়ার এখতিয়ার তার নেই। এ বিষয়টি প্রশাসন দেখে থাকে। তাই বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ভিত্তিহীন। বার লাইসেন্স ইস্যুসংক্রান্ত পরিদর্শন প্রতিবেদন দিতে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিদর্শন প্রতিবেদন দেয়ার জন্য কমিটি করে দেয়া হয়। কমিটিই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। অঢেল সম্পদের বিষয়ে তিনি বলেন, এসব সম্পদের বেশিরভাগই তার পরিবারের সদস্যদের। তার কোনো সম্পদ নেই।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন