‘পুলিশ আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল’

বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ধারা ৫৪ ও হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ধারা ১৬৭ সংশোধনে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল মঙ্গলবার খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আর এই রায় নিয়ে কোনো ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেননি দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে  বুধবার দুপুরে কথা বলে এমনটাই জানা গেল। তারা জানিয়েছেন তারা আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

আটকাদেশ দেওয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না, কাউকে গ্রেফতার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে এবং গ্রেফতারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার ব্যক্তিকে কারণ জানাতে হবে। এর ফলে পুলিশি দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অসুবিধা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপ-পুলিশ কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, আমরা পুলিশ  সদস্যরা আইনের সেবক। আমরা আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আদালত যেভাবে নির্দেশ দেবেন আমরা সে অনুযায়ী কাজ করব।

তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যদিও অনেক অভিযোগ রয়েছে। তবুও আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি হয়রানির জন্য পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করে না। অনেকে আবার তথ্যের প্রয়োজনে আটক করলেও জিজ্ঞাসাবাদের পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবুও আদালত যেহেতু রায় দিয়েছেন আমরা তা পালন করব।

নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে রমনা জোনের একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আদালতের রায় মেনেই আমাদের কাজ করতে হবে। তবে হাইকোর্ট যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছেন সে অনুযায়ী কাজ করতে হলে কিছুটা অসুবিধা তো রয়েছেই।

তিনি বলেন, অনেক সময় মামলা তদন্তের প্রয়োজনে আটক বা গ্রেপ্তার করতে হয়। তার মানে এই না যে পুলিশ তার ইচ্ছা মতো কাজ করে।

এ বিষয়ে কথা হয় শাহবাগ থানার ওসি আবু বক্কর সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা আইন মেনেই কাজ করতে চাই। আমি মনে করি কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
হাইকোর্টের রায়ের ফলে কাজের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যা হবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু হাইকোর্ট এ ব্যাপারে রায় দিয়েছেন এবং আমি একজন পুলিশ সদস্য, তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। রিট আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন,ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ও ব্যারিস্টার সারাহোসেন।                                                                                                                                                                                                                                   রিট আবেদনের বিবরণ থেকে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র শামীম রেজা রুবেলকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করার পর ওই বছরের ২৩ জুলাই মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশ-কার্যালয়ে তার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় বিচারপতি হাবিবুর রহমান খানের নেতৃত্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। তদন্ত শেষে কমিটি ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংশোধনের পক্ষে কয়েকটি সুপারিশ করে।

তবে পরবর্তীতে সেই সব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে। ওই রিট আবেদনের শুনানি শেষে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল হাইকোর্ট এই বিষয়ে কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন।

হাইকোর্টের ওই রায়ে ছয় মাসের মধ্যে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে প্রচলিত বিধি সংশোধন করার পাশাপাশি ধারা সংশোধনের আগে নির্দেশনাগুলো সরকারকে অনুসরণ করতে বলা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের দেওয়া ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করলে ২০০৪ সালে তা মঞ্জুর করা হয়। তবে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনাগুলো ওইসময় স্থগিত করা হয়নি।

এরপর বিগত বছরগুলোতে ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংশোধনে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের বিষয়টি কয়েকবার শুনানির জন্য কার্যতালিকায় এলেও শুনানি পর্যন্ত গড়ায়নি।

সর্বশেষ গত ২২ মার্চ আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়। এবং গত ১৭ মে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ বিষয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি নিয়ে রায় ঘোষণার দিন ২৪ মে  ধার্য করেন।

Mahabubur Rahman Mahabubur Rahman

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this:
Web Design BangladeshBangladesh Online Market