আজ বৃহঃপতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



মতির বেপরোয়া গতি

Published on 25 May 2016 | 4: 03 am

মতিউর রহমান মতি_ দিনের পর দিন বাড়ছে তার বেপরোয়া গতি। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার টেন্ডারবাজি, শীতলক্ষ্যা নদীতে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, মেঘনা আর যমুনা তেলের ডিপো নিয়ন্ত্রণ, আদমজী জুট মিলের ইপিজেড নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে পুরো এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছেন মতি। তার বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় রয়েছে ২৫টিরও বেশি মামলা। বিভিন্ন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করতে গড়ে তুলেছেন ২০ থেকে ২৫ জনের ক্যাডার বাহিনী। তারাই মতির নির্দেশ পালন করে থাকে। মতির ভয়ে ভুক্তভোগীরা দূরের কথা, খোদ থানা আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় এমপির প্রশ্রয়ে তিনি কয়েকটি সেক্টর এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

রাজনৈতিক পরিচয়ে মতিউর রহমান মতি থানা যুবলীগের আহ্বায়ক। স্থানীয় এমপি শামীম ওসমানের প্রশ্রয় পেয়ে তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় দিনের পর দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। কয়েকদিন ধরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকার বিভিন্ন মহল্লায় সরেজমিন অনুসন্ধান করতে গিয়ে এমনই সব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মতিউর রহমান মতি সমকালের কাছে দাবি করেন, ‘আমি যা করছি বৈধভাবেই করছি, কোথাও কোনো অনিয়ম করিনি। আমার বিরুদ্ধে যেসব মামলা করা হয়েছিল সেগুলো আগের মামলা। আমার প্রতিপক্ষ হয়তো সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই এমন ষড়যন্ত্র করছে।’

দেড়শ’ বিঘার দীঘি দখল :গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টা। সিদ্ধিরগঞ্জের শিমুলপাড়ার আদমজী বিহারি ক্যাম্পের পাশেই বিশাল দীঘি। প্রায় দেড়শ’ বিঘা জমির ওপর পুকুরটিতে এক সময় স্থানীয় বাসিন্দারা গোসল করা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজ করতেন। প্রাকৃতিকভাবে যা মাছ হতো তা তারা ধরেও নিতেন। সেই পুকুরটি গত এক বছর ধরে মতির নিয়ন্ত্রণে। কোনো টেন্ডার ছাড়াই মতির ভাগ্নে মামুন মিয়ার মাধ্যমে দখলে নিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিহারি ক্যাম্পের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘এলাকার মানুষ যে পুকুরটি ব্যবহার করত সেটিই মতির ভাগ্নের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা জোর করে দখলে নেয়। পুকুরটির পাশেই অস্থায়ী দোকান নির্মাণ করে প্রতিটি দোকান ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় পজিশন বিক্রি করা হয়েছে। ৭০টি দোকান থেকে এভাবে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ শুধু তাই নয়, মতির নিজের এলাকা আইলপাড়ায় রেলওয়ের জমি দখল করে বানানো হয়েছে বিশাল আয়তনের অটো গ্যারেজ। টিনশেডের তৈরি ওই অটো গ্যারেজে প্রতি রাতে রাখা হয় ৫ শতাধিক অটো, যেখানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ওইসব অটোতে চার্জের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতি অটো থেকে প্রতিদিন ভাড়া হিসাবে আদায় করা হচ্ছে ১৫০ টাকা। মতির নির্দেশে তার ভাগ্নে মামুন, মিন্টু, বাবলা, টনসহ একটি সিন্ডিকেট এসব করছে। সরকারি দীঘি দখল করা প্রসঙ্গে মতিউর বলেন, ‘আমরা পুকুরটি দখল করিনি, সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করছি।’ কিন্তু এখনও তো কোনো টেন্ডার হয়নি জানানো হলে তিনি বলেন, ‘এখনও পাইনি, তবে টেন্ডার আমরা পেয়ে যাব। সে জন্যই আমরা আগেই মাছ চাষ করছি।’

চাঁদার টোকেন : অনুসন্ধানে জানা যায়, দেড়শ’ বিঘার দীঘি আর অটো বাইকের গ্যারেজ দিয়ে শুধু টাকা উপার্জনই করা হচ্ছে না, ইপিজেডের ভেতরে কোনো অটো প্রবেশ করতে চাইলে টোকেনের মাধ্যমে প্রবেশ করতে হয়। প্রতি টোকেন ৩০ টাকা। সকালে কিংবা রাতে ইপিজেডে অটো প্রবেশ করতে হলে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের টোকেন না নিলে অটো ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ইপিজেডের কয়েকজন কর্মকর্তা সমকালকে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘চাঁদার কারণে অটোচালকরাও আমাদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিয়ে থাকে।’ অটোচালক রহিম উদ্দিন, মফিজ মিয়া ও আবু কালাম বলেন, ‘ইপিজেডের ভেতরে অটো প্রবেশ করতে চাইলে ৩০ টাকা দিয়ে টোকেন নিতে হয়, সেই টোকেনে চলে অটো, সন্ধ্যার সময় আবার ঢুকতে চাইলে ৩০ টাকা দিতে হয়। ওদের টাকা না দিলে কারও অটো ঢুকতে দেওয়া হয় না।’ এসব টাকা কারা নিচ্ছে জানতে চাইলে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘যুবলীগ নেতা মতির লোকজনই এখানে এসব চাঁদাবাজি করছে। তার কারণেই কেউ মুখ খুলছে না।’ শুধু কি তাই, মতির একটি চালের দোকান আছে, সেখান থেকে জোর করে স্থানীয় বাসিন্দাদের চাল কিনতেও বাধ্য করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইপিজেড এলাকার মতো সিদ্ধিরগঞ্জের প্রায় এলাকাতেই রয়েছে মতির ক্যাডার বাহিনী, যারা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে নানাভাবে মানুষকে জিম্মি করে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। অটো থেকে তার ক্যাডারদের চাঁদা আদায় প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, ‘সেখানে কারা টাকা ওঠায়, কেন ওঠায় পুলিশ ভালো বলতে পারবে। আমি ওইসব চাঁদার সঙ্গে জড়িত নই।’

ছোট ভাই যখন নেপথ্যের হোতা :জানা যায়, সিদ্ধিরগঞ্জের আইলপাড়া এলাকার মৃত বাদশা মিয়ার ছেলে মতিউর রহমান মতি। তিন ভাইয়ের মধ্যে জজ মিয়ার স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন আতাউর রহমান। তার ছোট ভাই মাহবুবই হচ্ছেন মতিউর রহমান মতির অন্যতম সহযোগী। মতির হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন মাহবুব। এ ছাড়া রয়েছে ভাগ্নে মামুন, মাইগ্যা কাদির, জসিম, মানিক, রাবি্ব, মাহবুব, সেন্টু, হাবু, গুজা লিটন, সেলিম, ল্যাংড়া রবিউল, আসলাম, টাল মজিবুর, ইসমাইলসহ আরও অনেকে। এদিকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মতিউর রহমান মতির প্রধান অর্থ কালেক্টর মানিক ওরফে মানিক মাস্টার। তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) ৬নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। অস্ত্রধারী ক্যাডারদের মধ্যে রয়েছে আদমজী সোনা মিয়া মার্কেট এলাকার কাদির ওরফে মাইগ্গ্যা কাদির, বাবু, কদমতলীর নয়াপাড়ার একাধিক মামলার আসামি সরল ওরফে ডাকাত সরল, আ. রব মিয়া ও নোয়াব। মতির ওই ক্যাডারদের নামে সিদ্ধিরগঞ্জ থানাসহ আশপাশের থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। একটি সূত্র জানায়, গত বছর এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে মতি গ্রুপ ও গুলু মেম্বার গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে সোনা মিয়া মার্কেটের বাইতুল নূর হাফেজিয়া মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র সাগর গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এতে আরও দু’জন গুলিবিদ্ধ হন।

মতির নিয়ন্ত্রণে তেলের ডিপো :সিদ্ধিরগঞ্জে রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম সরকারি তেলের দুটি ডিপো। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে রয়েছে মেঘনা এবং পদ্মার ডিপো। দুটি ডিপো থেকে প্রতিদিনই শত শত ট্রাক তেল নিয়ে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। ওইসব তেল সরবরাহকারী ট্যাংক লরি মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন রাশেদ মহাজন ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম মণ্ডল। সম্প্রতি মতির নেতৃত্বে এক প্রকার জোর করেই ট্যাঙ্ক লরি মালিক সমিতির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়া হয়। ওই সমিতির সভাপতি হিসেবে মতিউর রহমান এবং তারই সহযোগী আমানুল হক মণ্ডল সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এখন দায়িত্ব পালন করছেন। কমিটির সাবেক সভাপতি রাশেদ মহাজন এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি। তবে নাসিকের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ট্যাঙ্ক লরি মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের কমিটির কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে মতি ও হক নতুন করে কমিটি আনছে। জোর করেই তারা এই কমিটি করেছে। এর বাইরে ভাই আমি বেশি কিছু বলতে পারব না।’ তবে কমিটির কয়েকজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মতি ও তার লোকজন জোর করেই কমিটি বাতিল করে তারা এখন নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তাদের ভয়ে কেউ কথা বলতে চায় না।’ অনুসন্ধানে দেখা যায়, দুটি ডিপোর তেল সরবরাহ করতে গিয়ে নানা কায়দায় হাজার হাজার লিটার অবৈধভাবে পাচার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। ওই চক্রের সদস্যদের সঙ্গেও মতিউর রহমানের ক্যাডারদের রয়েছে যোগসূত্র। অভিযোগ উঠেছে, জাহাজে করে তেল এনে ডিপোতে তেল আনলোড করার সময় লাখ লাখ টাকার তেল চুরি করে নিচ্ছে অসাধু ওই সিন্ডিকেট। এসব টাকার ভাগ পাচ্ছেন মেঘনা ও পদ্মা তেলের ডিপোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও মতিউর রহমান মতি। অভিযোগ প্রসঙ্গে মতিউর রহমান মতি বলেন, ‘আগের কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে পুলিশ হত্যা মামলা থাকায় কমিটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। পরে ওই কমিটিতে নিয়ম অনুযায়ী আমাকে সভাপতি করা হয়েছে। কোনো ধরনের জোরজুলুম করা হয়নি। আর তেল চুরির টাকা আমার খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’

মতির হাতের মুঠোয় ইপিজেড ও বালুমহাল :আদমজী ইপিজেড এলাকার প্রায় প্রতিটি শিল্প কারখানায় রয়েছে মতির নিয়ন্ত্রণ। জুট ব্যবসা, কারখানায় খাবার সরবরাহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে রয়েছে তার নিয়ন্ত্রণ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মতির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইয়াসমা নিটিং, ইয়েস্টার ইয়োকহোমা, এসএমএল, সুপার প্রটেক্ট সুজ, সুপ্রিম নিটওয়্যার, টেক্স জিপার, সোয়াদ গার্মেন্টসসহ ২৫টির বেশি প্রতিষ্ঠান। মতির সিন্ডিকেটে রয়েছেন শামীম, কাদির, জসিম, রবিউল ইসলাম, ইসমাইল, মামুন, মানিক, ফরহাদসহ একটি গ্রুপ। একইভাবে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে আইলপাড়া, মেঘনা ডিপোর পেছনে বার্মাশীল, পদ্মা ডিপোর পেছনে সাদুরঘাট বালুমহালসহ বেশিরভাগ বালুমহাল মতি ও তার ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ওইসব বালুমহাল থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, ‘আমি দুটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম, এখন আর করি না। এলাকার ছেলেপুলেরাই এখন করছে।’ বালুমহাল প্রসঙ্গে বলেন, ‘বালুমহালের সব আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। একটি বালুমহাল শুধু আমার নিয়ন্ত্রণে আছে।’

ভয়ে আওয়ামী লীগ নেতারাও :সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান বলেন, ‘দেখেন, মতির সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওর একচেটিয়া কাজের কারণে অনেকেই নাখোশ। তবে দলের নেতাকর্মীদের সবাইকেই বিভিন্ন কাজের সুযোগ দেওয়া উচিত।’ তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন থানা পর্যায়ের শীর্ষ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মতির বিরুদ্ধে বিগত বিএনপি-জামায়াতের সময় ৩০টির বেশি মামলা হয়। বর্তমান সরকারের সময় স্থানীয় এমপি শামীম ওসমানের প্রশ্রয়ে তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন অর্ধশত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।’ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, যুবলীগের আহ্বায়ক হয়ে থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আর সেক্রেটারিসহ কাউকেই পাত্তা দিচ্ছেন না। তার ক্যাডার বাহিনী নিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছেন পুরো সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায়।


Advertisement

আরও পড়ুন