আজ বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৩ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



রনির গ্রেফতার নিয়ে ছাত্রলীগে তোলপাড়

Published on 09 May 2016 | 2: 35 am

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে গত ৭ মে হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের একটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে দায়িত্বরত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনিসহ নয়জনকে আটক করে বিজিবি। পুলিশ জানায়, এ সময় রনির কাছ থেকে একটি নাইন এমএম পিস্তল, ১৫ রাউন্ড গুলি, একটি সিল ও নগদ ২৬ হাজার টাকা উদ্ধার করে তাকে হাটহাজারী থানায় সোপর্দ করা হয়। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়ে তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রসঙ্গত, রনি মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী অনুসারী হিসেবে পরিচিত। রনির গ্রেপ্তার নিয়ে বর্তমানে ছাত্রলীগে তোলপাড় চলছে। পুলিশের পক্ষ থেকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অবৈধ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের কথা বলা হলেও মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীদের অভিযোগ, রনি রাজনৈতিক ‘রোষাণলের’ শিকার। তবে তার বিরোধী পক্ষের দাবি, রনি তার রাজনৈতিক প্রভাব দেখাতে গিয়েই এমন কর্মফল ভোগ করেছেন। কিন্তু সচেতনমহল বলছেন, ক্ষমতাসীন দলের কর্মী বলেই রনিকে নিয়ে মাতামাতিটা বেশি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো.নূরুল আবছার সম্পর্কে রনির আপন মামা। পুলিশ জানায়, বেলা সোয়া ১২ টার দিকে এই ইউনিয়নের ছইল্যাপুর কেন্দ্রে তার অনুসারীদের নিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মারতে দেখায় নির্বাচনে দায়িত্বরত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে অভিযান চালায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ সময় তার কাছে একটি সিলসহ আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যায়। পরে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত রণিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা ২০১৬ এর দুটি ধারায় এক বছর করে মোট দুই বছর কারাদণ্ড দেন। এছাড়া রণির বিরুদ্ধে হাটহাজারী থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করতে গিয়েই গ্রেপ্তার হয়েছেন রনি।

এদিকে রনির অনুসারীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে নুরুল আজিম রনি নগরের ছাত্র রাজনীতিতে বেশ আলোচিত মুখ। রনির ইমেজকে বিতর্কিত করতে এবং মহিউদ্দিন চৌধুরীকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতেই অদৃশ্য কারো ইন্ধনে এই গ্রেপ্তার বলে তাদের দাবি। এ প্রসঙ্গে নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু অস্ত্রসহ রনির আটক হওয়ার ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্রমূলক ও সাজানো’ নাটক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি গতকাল রাতে আজাদীকে বলেন, ‘সরকারের ভেতরেই অনেক ষড়যন্ত্রকারী রয়েছে। যারা নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ ভাবে। মহানগর ছাত্রলীগের এক ও অভিন্ন দাবি রনির শর্তহীন মুক্তি চাই।’ চিঠির মাধ্যমে রনির সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘লেখাটা যে তার সে বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। তাই আপাতত এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তেও আসা সম্ভব হচ্ছে না।’

রনির অনুসারী চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগ নেতা মাহমুদুল করিম বলেছেন, ‘সম্প্রতি জামায়াতশিবিরের তিন দশকের ঘাঁটি চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজ থেকে বিতাড়িত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনসংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এবং প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ সহিংসতার ঘটনায় বিশেষ ভূমিকা রাখায় দ্রুত লাইমলাইটে চলে আসেন রনি। মূলত রনির ইমেজকে বিতর্কিত করতেই এই গ্রেপ্তার।’

এদিকে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী হিসাবে পরিচিত নগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি মিথুন মল্লিক আজাদীকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলে অন্তর্কোন্দল থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা যেন নোংরামির পর্যায়ে না যায়। যারা এসব কানাঘুষা করছে আমার কাছে মনে হয় তারা রনির ক্ষতি চায়। ব্যক্তিগতভাবে রনির সাথে আমার সম্পর্ক ভালো। তার এমন ঘটনা সংগঠনের জন্য দুঃখজনক, অনাকাঙিক্ষত। আইনি প্রক্রিয়া মেনে রনির মুক্তির জন্য আমরা সব ধরণের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।’

এদিকে রনির মুক্তি দাবিতে গতকাল আদালত চত্বরে অবস্থান ধর্মঘট পালন করে মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। গতকাল দুপুরে মিছিল নিয়ে তারা আদালত প্রাঙ্গণে যান। মিছিলটি আদালত ভবন, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় প্রদক্ষিণ করে। এরপর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সামনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিচে প্রতিবাদ সমাবেশ করে ছাত্রলীগ। সমাবেশ থেকে আজ সোমবারের মধ্যে রণিকে মুক্তি না দিলে আদালত চত্বরে লাগাতার অবস্থান ধর্মঘট পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। এদিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান ধর্মঘট করার সময় জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ এসে নেতাকর্মীদের শান্ত করেন । এ সময় তিনি রনির গ্রেফতার ও দণ্ডিত হওয়া দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করে তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত করতে সহযোগিতা করার কথা জানান। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় একটা ঘটনা ঘটেছে। এখন আইনি প্রক্রিয়াতেই তাকে মুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত করতে আমি সহযোগিতা করব।’

এদিকে মেয়র আ জ ম নাছিরের উপস্থিতিতে মহানগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও তিন দিনের মধ্যে রনির মুক্তি দাবি করা হয়। গতকাল নগরীর দারুল ফজল মার্কেট চত্বরে হরতাল বিরোধী সমাবেশে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ও সাবেক গণপরিষদ সদস্য ইসহাক মিয়া এ দাবি জানান। তিনি বলেন, বর্তমান ইউপি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলকভাবে রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, সমাবেশে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন না।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বিবৃতি :

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আলী রেজা পিন্টু স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রনেতা নুরুল আজীম রনিকে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে ফাঁসানো হয়েছে।’ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সুস্থ রাজনীতির আইডল রনি ষড়যন্ত্রের শিকার।’

বিবৃতি প্রদানকারীদের মধ্যে আরও রয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক হাবিবুর রহমান তারেক, উপপ্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান, উপসমাজ সেবা সম্পাদক ফরহাদুল ইসলাম চৌধুরী রিন্টু, উপশিক্ষা ও পাঠ্যচক্র সম্পাদক মো: ইলিয়াছ উদ্দিন, সহসম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন, আশিকুন্নবী চৌধুরী, উপপরিবেশ সম্পাদক আবদুর রহিম জিল্লু, সদস্য মেজবাহ উদ্দিন মোরশেদ, ইয়াছিন আরাফাত, আলী রেজা পিন্টু, মোরশেদুল আলম রাসেল, হেলাল উদ্দিন, নাজমুল সাকিব, শওকত আলম, ফয়সাল বাপ্পী, আবু সাঈদ সুমন, মঈনুল ইসলাম রাজু, রাজিবুল হাসান রাজন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

মহানগর ছাত্রলীগের কর্মসূচি :

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি’র মামলা প্রত্যাহার পূর্বক নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। মিছিলটি নগরীর দারুল ফজল মার্কেটস্থ দলীয় কার্যালয় হতে শুরু হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসে শেষ হয়।

নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কোতোয়ালী থানা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান মনসুর, মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শেখ নাছির আহমেদ, হেলাল উদ্দিন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক উপ সম্পাদক আজিজুর রহমান, সহ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তারেক, প্রমুখ।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি ষড়যন্ত্রের শিকার। তিনি জামায়াত বিএনপি’র আতংকের কারণ হওয়াতেই তাকে ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। তার ছাত্রবান্ধব কর্মকাণ্ড এবং জনহিতকর কার্যকলাপই আজ তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকারের নিকট আমাদের অনুরোধ কাদের ইন্দনে এবং কাদের ষড়যন্ত্রের শিকার আজ নুরুল আজিম রনি তা সহসা উদঘাটন করুন।’ তারা নুরুল আজিম রনি’র নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন