আজ শনিবার, ১৮ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৩ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা প্রশ্নে রিটের রায় বৃহস্পতিবার

Published on 05 May 2016 | 3: 12 am

বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা প্রশ্নে একটি রিটের উপর আগামীকাল বৃহস্পতিবার রায় দেবেন হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের নয় আইনজীবীর করা এ রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে জারিকৃত রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে রায়ের এই দিন ধার্য করেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের একটি বিশেষ বেঞ্চ।

অসদাচরণের দায়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। বিলটি পাসের পর একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই বছরের ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে এই রিট আবেদন দায়ের করা হয়। প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট ২০১৪ সালের ৯ নভম্বর রুল জারি করেন। রুলে ওই সংশোধনী কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, আইন সচিব, সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

এই রুলের উপর গত বছর ২১ মে শুনানি শুরু হয় এবং ১৭ কার্যদিবস শুনানি চলে। গত ১০ মার্চ শুনানি শেষে আদালত রায়ের তারিখ ঘোষণা করেন।

শুনানির প্রথম দিনেই আদালত মতামত দিতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে সিনিয়র পাঁচ আইনজীবীর নাম ঘোষণা করেন। তাদের মধ্যে ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও আজমালুল হোসেন কিউসি এই শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

১৯৭২ সালের সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের উপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। পরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয়।

ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে ৯৬ অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত ২ উপঅনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোন বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না।’ ৩ উপঅনুচ্ছেদ অনুসারে, ‘এই অনুচ্ছেদের ২ দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন।’

আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ শুনানিতে বলেছেন, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে বিচারকের অপসারণের বিধানটি ছিল। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে আপিল বিভাগও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওই বিধানটি সুরক্ষা দিয়েছিলেন। এই সুরক্ষার পর পঞ্চদশ সংশোধনী যখন পাস হয়, তখন সংসদও ওই ৯৬ অনুচ্ছদকে সংরক্ষিত করেছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে কিছুদিন পরে ৯৬ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে এই ক্ষমতা সংসদের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই পরিবর্তন হয়েছে সংবিধানের মৌল কাঠামোকে পরিবর্তন করে। কারণ, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে থাকা ৭(খ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মৌল কাঠামো পরিবর্তন করা যাবে না।

তিনি আরো বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মূল কাঠামো। আনোয়ার হোসেন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মূল কাঠামো। যেহেতু মূল কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে, সেহেতু এটি সংবিধান পরিপন্থি। কেননা, এই ক্ষমতাটা যদি সংসদের হাতে দেয়া হয়, দেশের সংসদ সদস্যরা শুধু আইন প্রণয়ন করেন না, তারা নির্বাহি ও প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করেন, তাহলে তাদের কাছে যদি অপসারণের ক্ষমতাটা দেয়া হয়, সেক্ষেত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি ও হস্তক্ষেপ হতে পারে। তাই এই ক্ষমতাটা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়াটা যৌক্তিক হবে না।

অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানিতে বলেন, বিচারপতিদের অপসারণের প্রক্রিয়া আগে ছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে। এই সংশোধনী (ষোড়শ) দ্বারা যেটা করা হয়েছে, সেটি হল রাষ্ট্রপতি অপসারণ করবেন সংসদের রেজুলেশনের ভিত্তিতে। পার্লামেন্ট রেজুলেশন নেবে তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে। তিনি আরো বলেন, ওই তদন্ত কমিটি কীভাবে গঠিত হবে সে বিষয়ে একটি বিল আনা হবে। বিলটি আইনে পরিণত হলেই কিন্তু এ বিষয়ে কারণ (কজ অব অ্যাকশন) উদ্ভব হবে। কাজেই জনস্বার্থ মামলা হিসেবে যারা মামলাটি করেছেন- তাদের মামলা করার সময় আসেনি। তিনি আরো বলেন, আইন হওয়ার পরে আইনে যদি কোনো রকম ব্যত্যয় হয়, দেখা যায় সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক- তখনই কারণ উদ্ভব ঘটবে এটা চ্যালেঞ্জ করার। এ কারণে রিট আবেদনটি ‘মেনটেইনেবল না’ (গ্রহণযোগ্য নয়) বলে জানান তিনি।

ষোড়শ সংশোধনী বিলটি পাস হওয়ার ঠিক আগে ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এক যৌথ বিবৃতিতে দেশের চারজন বিশিষ্ট আইনজীবী বলেন, বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদে ফিরিয়ে আনা হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে। এরা হলেন- ড. কামাল হোসেন, আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম ও রোকনউদ্দিন মাহমুদ। যৌথ বিবৃতিতে এই চার আইনজীবী আরো বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি। আমাদের সর্বোচ্চ আদালত অষ্টম সংশোধনী সংক্রান্ত দেয়া যুগান্তকারী রায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কোনো আলোচনা, বিতর্ক বা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন ছাড়াই হঠাৎ কেন সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব আনা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একজন বিচারপতিকে অপসারণের ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতারা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে পারেন কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন বিশিষ্ট এই চার আইনজীবী। তারা বলেন, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য দলের নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে সংসদে বিচারপতিদের অপসারণ করা হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে। এই চার আইনজীবী বিচারপতিদের অভিশংসন সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনের আগে জাতীয় ঐকমত্যের আহবান জানিয়ে বলেন, একমাত্র সঠিক আলোচনার পরই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।

ইতোমধ্যে এই সংশোধনীর আলোকে একটি খসড়া আইন অনুমোদন করেছে মন্ত্রীসভা। প্রস্তাবিত আইনটি সংসদে উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন