আজ শনিবার, ১৮ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৩ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বিনা তদন্তে কারো সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ ও অপপ্রচার

Published on 04 May 2016 | 3: 51 am

মুসনাদে আহমদের বরাত দিয়ে ইবনে কাছীর বর্ণনা করেন যে, বনুল মোস্তালিক গোত্রের সরদার, উম্মুল মুমিনীন হযরত জুয়াইরিয়ার পিতা হারেছ ইবনে যেরার রাসূল(সা) এর দরবারে হাজির হলে তিনি তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং যাকাত প্রদানের আদেশ দিলেন।

হারেস ইসলামের দাওয়াত কবুল এবং যাকাত প্রদানের ওয়াদা করে বললেনঃ এখন আমি নিজ গোত্রে ফিরে গিয়ে তাদেরকেও ইসলাম ও যাকাত প্রদানের দাওয়াত দেব।

যারা আমার কথা মানবে ও যাকাত দিবে, আমি তাদের যাকাত একত্রিত করে আমার কাছে জমা রাখবো। আপনি অমুক মাসের অমুক তারিখ পর্যন্ত কোন দূত আমার কাছে পাঠাবেন।

আমি তার কাছে যাকাতের জমাকৃত অর্থ দিয়ে দেব। এরপর হারেস ওয়াদা অনুযায়ী যাকাতের অর্থ জমা করলেন এবং দূত আগমনের নির্ধারিত মাস ও তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোন দূত না আসায় হারেসের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হলো।

তিনি ভাবলেন, হয়তো রাসূল(সা) কোন কারণে আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। নতুবা ওয়াদা অনুযায়ী দূত না পাঠানোর কোন কারণ থাকতে পারে না। হারেস তার এই আশংকার কথা ইসলাম গ্রহণকারী নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছেও ব্যক্ত করলেন।

অতঃপর সবাই মিলে একদিন রাসূল(সা) এর কাছে যাবেন বলে স্থির করলেন।

এদিকে নির্ধারিত তারিখে রাসূল(সা) ওলীদ বিন ওকবাকে যাকাত গ্রহণের জন্য পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ওলীদের মনে এই ধারণা জন্মে যে, যেহেতু এই গোত্রের সাথে তার পুরনো শত্রু রয়েছে, তাই তারা হয়তো তাকে একা পেয়ে হত্যা করে ফেলবে।

এই আশংকার ভিত্তিতে তিনি আর একা অগ্রসর না হয়ে সেখান থেকেই ফিরে আসেন এবং রাসূল(সা) কে গিয়ে বলেন যে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আমাকেও হত্যা করার হুমকি দিয়েছে। তখন রাসূল(সা) রাগান্বিত হয়ে হযরত খালীদ বিন ওলীদের নেতৃত্বে একদল মুজাহিদ প্রেরণ করেন। ঠিক এই সময়ে হারেস মদীনার উপকন্ঠে উপস্থিত হয়ে এই মুজাহিদ বাহিনীকে দেখতে পান।

তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা কোন গোত্রের দিকে রওনা হয়েছেন। তারা বললেন, আমরা তোমাদের গোত্রের দিকেই যাচ্ছি। হারেস কারণ জিজ্ঞেস করলে তাকে ওলীদ বিন উকবার কথিত পুরো কাহিনী শুনানো হলো। তাকে বলা হলো যে, বনুল মুস্তালিক গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করে ওলীদকে হত্যা করার ফন্দী আঁটছে।

এ কথা শুনে হারেস বললেন, আল্লাহর কসম আমি ওলীদ বিন উকবাকে দেখিনি। সে আমার কাছে যায়নি। অতঃপর হারেস রাসূল(সা) এর কাছে উপস্থিত হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি যাকাত দিতে অস্বীকার করেছ এবং আমার দূতকে হত্যা করতে চেয়েছ? হারিস বললেন, কখনো নয়। আল্লাহর কসম, সে আমার কাছে যায়নি এবং আমি তাকে দেখিওনি। নির্ধারিত সময়ে আপনার দূত যায়নি বলে আমার আশংকা হয় যে, আপনি হয়তো কোন ত্রুটির কারণে আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন।

কোন কোন রেওয়ায়াতে আছে যে, ওলীদ বিন উকবা রাসূল(সা) এর নির্দেশ মোতাবেক বনুল মোস্তালিক গোত্রে পোঁছেন। গোত্রের লোকেরা আগেই জানতো যে, রাসূল(সা) এর দূত অমুক তারিখে আসবে। তাই তারা অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে বস্তি থেকে বেরিয়ে আসে। ওলীদ সন্দেহ করলেন যে, তারা বোধ হয় পুরনো শত্রুতার কারণে তাকে হত্যা করতে এগিয়ে আসছে।

তাই তিনি সেখান থেকেই ফিরে আসেন এবং রাসূল(সা) এর কাছে নিজ ধারণা অনুযায়ী অভিযোগ পেশ করলেন যে, তারা যাকাত দেয়ার পরিবর্তে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে। তখন রাসূল(সা) খালিদ বিন ওলীদকে প্রেরণ করলেন এবং বলে দিলেন যে পূর্ণ তদন্ত ও অনুসন্ধানের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

খালিদ বিন ওলীদ রাতের বেলায় বস্তির নিকট পৌঁছে গোপনে কয়েকজন গুপ্তচর পাঠিয়ে দিলেন। তারা ফিরে এসে সংবাদ দিল যে তারা সবাই ঈমান ও ইসলামের উপর অটল আছে এবং যাকাত দিতে প্রস্তুত আছে। তাদের মধ্যে ইসলামের বিপরীত কিছুই নেই। খালেদ ফিরে এসে রাসূল(সা) এর নিকট সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনের সূরা আল হুজরাত নাযিল হয়। বিশেষত এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত আয়াতটি হলোঃ

“হে মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোন খবর নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতি সাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।”

শিক্ষাঃ  এই ঘটনা এবং এই ঘটনা উপলক্ষে অবতীর্ণ সূরার সংশ্লিষ্ট আয়াতের প্রধান শিক্ষা এই যে, কোন প্রচারণা চাই তা মৌখিক হোক বা লিখিত হোক-বক্তা বা লেখকের চারিত্রিক মান ও খবরের গুরুত্ব বিবেচনা করে গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে। খবর যদি এমন গুরুতর হয় যে, তার ভিত্তিতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সংঘটিত হতে পারে তবে তা তদন্ত ছাড়া গ্রহণ করা যাবে না।

সংবাদদাতা অসৎ হলে তো নয়ই, এমনকি সৎ হলেও না। কেননা খবরটি তার ইচ্ছাকৃত অপপ্রচার না হয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণেও হতে পারে। আর ফাসেক বা অসৎ লোক হলেতো তা গ্রহণ করাই যাবে না তদন্ত ছাড়া।

কেননা তা একটা নিরেট মিথ্যাচারও হতে পারে।

রাসূল(সা) বলেছেন, একজন লোকের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন